সরকারি গুদামে গম ও অন্য মালপত্র সরবরাহের নামে জালিয়াতি করে রাষ্ট্রায়ত্ত জনতাসহ পাঁচ ব্যাংক থেকে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনা ঘটেছে। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তদন্তে ঢাকা ট্রেডিং হাউসের মালিক টিপু সুলতান ওই পরিমাণ টাকা আত্মসাৎ করেছেন বলে প্রমাণ মিলেছে।

দুদক সূত্র জানায়, জালিয়াতি করে জনতা ব্যাংক থেকে প্রায় ২০০ কোটি, রূপালী ব্যাংক থেকে ১০০ কোটি, রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংক বিডিবিএল থেকে ২৫ কোটি ৫০ লাখ, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক ও সাউথইস্ট ব্যাংক থেকে প্রায় ১৫০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়। এই ১৫০ কোটি টাকা আত্মসাতে আরও কয়েকটি ব্যাংক সম্পৃক্ত বলে তথ্য মিলেছে।

দুদকের তদন্ত থেকে জানা যায়, টিপু সুলতান তার মালিকানাধীন ঢাকা ট্রেডিং হাউসের নামে বিডিবিএলের প্রিন্সিপাল শাখায় ২০১১ সালের ১৬ মে একটি হিসাব খোলেন। পরে এলসি লিমিট ও এলটিআর ঋণ মঞ্জুরের জন্য আবেদন করা হয়। সরকারের সঙ্গে একটি সমঝোতা চুক্তির (এমওইউ) কপি বিডিবিএলের ওই শাখায় নিয়ে জমা দেওয়া হয়। তাতে বলা আছে, স্থানীয় বাজার থেকে ১৫ হাজার টন গম সংগ্রহ করে তা খাদ্য অধিদপ্তর, খাদ্য ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়কে সরবরাহ করা হবে। প্রকৃতপক্ষে ওই চুক্তিটি ছিল জাল। অডিট ফার্ম জি. কিবরিয়া অ্যান্ড কোম্পানির নিরীক্ষায় তা প্রমাণিত হয়।

টিপু সুলতান জাল কাগজ বিডিবিএলের প্রিন্সিপাল শাখায় জমা দিয়ে ১৫ হাজার টন গম স্থানীয় বাজার থেকে কেনার জন্য নতুন এলসি লিমিট এবং এলটিআরের জন্য আবেদন করলে ওইসব কাগজপত্র যাচাই না করে শাখা থেকে ৩০ কোটি টাকার লোকাল এলসি লিমিট অনুমোদন ও ২৫ কোটি ৫০ লাখ টাকার এলটিআর ঋণ মঞ্জুর করা হয়।

ঢাকা ট্রেডিংয়ের অনুকূলে ২০১২ সালের ৪ জুন ঋণ মঞ্জুরিপত্র ইস্যু করা হলে তার পরদিনই ৫ জুন শাখায় এলসি স্থাপন করা হয়।

পরে চিঠির মাধ্যমে এলসিতে উল্লেখ করা মালপত্র বুঝে পাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে ডকুমেন্ট ছাড় করার অনুরোধ করা হয়। এলসির পরের দিনই ১৫ হাজার টন গম বুঝে পাওয়ার বিষয়টি সত্য নয় মর্মে বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে আসে।
দুদক জি. কিবরিয়া অ্যান্ড কোম্পানির নিরীক্ষা প্রতিবেদন বিশ্নেষণ করে দেখেছে, ২৫ কোটি ৫০ লাখ টাকার ঋণটি খুব দ্রুতই অনুমোদন দেওয়া হয়। গ্রাহকের পরিশোধ প্রক্রিয়া, দক্ষতা ও ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা যাচাই করা হয়নি। যে এমওইউর ভিত্তিতে ঋণটি দেওয়া হয়, তা পরে জাল প্রমাণিত হয়, অর্থাৎ জাল রেকর্ডপত্র আসল দেখিয়ে ঋণটি সুকৌশলে অনুমোদন নেওয়া হয়েছে। ১৫ হাজার টন পণ্য একদিনে একটি ট্রাকে পরিবহন দেখানো হয়েছে- যা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

ঢাকা ট্রেডিং হাউসের লোকাল এলসির বেনিফিসিয়ারি এসপিএস করপোরেশন ওই গম সরবরাহের যে ট্রাকের ডেলিভারি চালান দিয়েছে, সেখানে মেসার্স ঢাকা ট্রেডিং হাউসের মালিকের মালপত্র গ্রহণের কোনো প্রমাণ নেই।

দুদকের হিসাব থেকে জানা যায়, পাঁচ টনের ট্রাক হলে একদিনে ১৫ হাজার টন গম সরবরাহে কমপক্ষে তিন হাজার ট্রাক লাগবে, যা একদিনে খালাস করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। অন্যদিকে যে পরিবহন থেকে ট্রাক ভাড়া নেওয়া হয়েছে মর্মে ট্রাক রিসিপ্ট কাগজে দেখানো হয়েছে, সেটার বাস্তবে কোনো অস্তিত্ব নেই। হিলি ট্রান্সপোর্ট এজেন্সি নামে সিপি রোড, বাংলাহিলি, হাকিমপুর, দিনাজপুরে কোনো ট্রান্সপোর্ট এজেন্সি নেই। ট্রাক চালানের রেকর্ডপত্র সবই জাল।

এসপিএস করপোরেশন পরোক্ষভাবে টিপু সুলতানেরই কাগুজে প্রতিষ্ঠান এবং মালপত্র পরিবহন দেখিয়ে জাল কাগজকে সংশ্নিষ্ট ব্যাংকারদের সহায়তায় সঠিক হিসেবে উপস্থাপন করে একোমোডেশনের মাধ্যমে ওই টাকা আত্মসাৎ ও লেয়ারিংয়ের মাধ্যমে হস্তান্তর, রূপান্তর করে মানি লন্ডারিংয়ের সম্পৃক্ত ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছেন।