বাংলাদেশি নাগরিকদের সুইস ব্যাংকসহ বিদেশি অন্যান্য ব্যাংকে থাকা টাকা ও লেনদেনের যাবতীয় তথ্য জানতে চেয়েছেন হাইকোর্ট। 

অর্থ পাচার ও সন্ত্রাসী অর্থায়ন প্রতিরোধকারী কেন্দ্রীয় সংস্থা বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটকে (বিএফআইইউ) এই তথ্য জানাতে বলা হয়েছে।

এছাড়া কর ফাঁকি ও অর্থ পাচারের সঙ্গে জড়িত যাদের নাম পানামা ও প্যারাডাইস পেপারসে এসেছে, তাদের বিষয়ে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং পুলিশের অপরাধ ও তদন্ত বিভাগকে ( সিআইডি) অগ্রগতি জানাতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। 

আগামী ৬ মার্চের মধ্যে হলফনামা করে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে এসব প্রতিবেদন হাইকোর্টে দাখিল করতে হবে।

বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদার ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমান সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ রোববার অর্থপাচার সংক্রান্ত দুদক, বাংলাদেশ ব্যাংক, বিএফআইউয়ের প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে এই আদেশ দেন। 

আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল একেএম আমিন উদ্দিন মানিক। দুদকের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী মোহাম্মদ খুরশীদ আলম খান। অন্যদিকে রিট আবেদনকারী পক্ষে ছিলেন আইনজীবী আব্দুল কাইয়ুম খান ও সুবীর নন্দী দাস।

আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী গত ২৬ জানুয়ারি কর ফাঁকি ও অর্থ পাচারের সঙ্গে জড়িত ৬৯ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের তালিকা আদালতে দাখিল করে বিএফআইইউ ও বাংলাদেশ ব্যাংক। পানামা ও প্যারাডাইস পেপারসে এসব ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানের নাম এসেছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়। এরপর বৃহস্পতিবার এ বিষয়টি শুনানির জন্য কার্যতালিকায় আসে।

শুনানিতে দুদকের আইনজীবী খুরশীদ আলম খান বলেন, পানামা ও প্যারাডাইস পেপার্সে যাদের নাম এসেছে, তাদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ চলছে। এখনও মামলা হয়নি। এরপর পানামা ও প্যারাডাইস পেপার্স কেলেঙ্কারিতে নাম আসা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের তালিকাসংবলিত প্রতিবেদন তুলে ধরেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল আমিন উদ্দিন মানিক। 

পরে রিটের পক্ষে আইনজীবী আবদুল কাইয়ুম খান বলেন, ‘২০১৬ ও ২০১৭ সালে পানামা ও প্যারাডাইস পেপার্স প্রকাশের পর যে তালিকা দেওয়া হচ্ছে, তা সংযুক্ত করে রিট আবেদনের সঙ্কেই দিয়ে দেওয়া হয়েছে।’ 

এ পর্যায়ে রাষ্ট্রপক্ষের উদ্দেশে হাইকোর্ট বলেন, ‘মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্সের মাধ্যমে তথ্য আনার ক্ষেত্রে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে? দুদকের আইনজীবী কোথায়? এমএলএআরের (মিউচুয়্যাল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স রিকোয়েস্ট) মাধ্যমে বিদেশ থেকে কী কী তথ্য নিয়ে এসেছেন? যে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নাম দিয়েছেন এগুলো পানামা ও প্যারাডাইস পেপার্স লিকে ২০১৬ ও ২০১৭ সালে প্রকাশিত হয়েছে।’ 

তখন রাষ্ট্রপক্ষে আমিন উদ্দিন মানিক বলেন, ‘বিভিন্ন পত্রিকায় আসা তথ্যগুলো সংগ্রহ করে এমএলএআরের মাধ্যমে ফরেন ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (এফআইইউ) কাছে রিকোয়েস্ট পাঠানো হয়েছে। গত পাঁচ বছরে যতগুলো রিকোয়েস্ট পাঠানো হয়েছে, তার তথ্য দেওয়া হয়েছে। পাঁচ বছরের পাঠানো ৮০১টি রিকোয়েস্টের মধ্যে ১১৯টি তারা গ্রহণ করেছে। অর্থপাচারের বিষয়ে যখনই তথ্য পত্র-পত্রিকায় প্রকাশ হচ্ছে, তখনই রিকোয়েস্ট পাঠানো হচ্ছে। এদের তথ্য ও তালিকা ধরেই বিএফআইইউর কাজ করছে।’ রাষ্ট্রপক্ষের উদ্দেশে হাইকোর্ট বলেন, ‘সুইচ ব্যাংকসহ দেশের বাইরে যারা টাকা রাখেছে, তাদের ব্যাপারে কিছু বললেন না।’ 

তখন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘এমএলএআর পাঠানো হয়েছে। সুইচ ব্যাংক থেকে নাম উদ্ধার করা অনেক কঠিন বিষয়। এ নিয়ে বিএফআইইউ চেষ্টা করছে।’ এমন জবাবে তাকে উদ্দেশ্য করে হাইকোর্ট বলেন, ‘আপনি মরে যাওয়ার আগেই মরে যাচ্ছেন কেন?’ 

জবাবে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘আমরা মরে যাচ্ছি না। বিদেশ থেকে ইতিমধ্যে অনেক টাকা উদ্ধার করে আনা হয়েছে। এমএলএআরের মাধ্যমে টাকা আসছে।' আদালত বলেন, 'আমরা দেশ ও জনগণের জন্য কাজ করছি। এখানে কারও কোনো ব্যক্তিগত স্বার্থ নেই।’ 

এরপর আদেশ দেন হাইকোর্ট।

২০২০ সালের ১৮ নভেম্বর ডিআরইউর মিট দ্য প্রেস অনুষ্ঠানে এসে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন বাংলাদেশ থেকে কানাডায় টাকা পাচারের সত্যতা পাওয়ার কথা বলেন। তার বক্তব্যের সুত্র ধরে বিভিন্ন গণমাধ্যমের বাঙালি অধ্যুষিত কানাডার কথিত ‘বেগম পাড়ার’ খবর গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। 

এ পর্যায়ে ওই বছরের ২২ নভেম্বর অর্থপাচারকারী দুর্বৃত্তদের নাম-ঠিকানা চাওয়ার পাশাপাশি তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কিনা, তা স্বতঃপ্রণোদিত জানতে চান হাইকোর্ট। 

এর মধ্যেই গত বছরের ১ ফেব্রুয়ারি বিদেশি ব্যাংক, বিশেষ করে সুইস ব্যাংকে পাচার করা ‘বিপুল পরিমাণ’ অর্থ উদ্ধারের যথাযথ পদক্ষেপের নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে রিট করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী আব্দুল কাইয়ুম খান ও সুবীর নন্দী দাস। 

এরপর ওই রিট এবং হাইকোর্টের স্বঃপ্রণোদিত আদেশ বাস্তবায়ন সংক্রান্ত বিষয় একত্রে শুনানি গ্রহণ করা হয়। ওই বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্ট রুলসহ আদেশ দেন। ওই আদেশের ধারাবাহিকতায় গত ২৬ জানুয়ারি অর্থ পাচারের সঙ্গে জড়িত ৬৯ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের তালিকা আদালতে দাখিল করে বিএফআইইউ ও বাংলাদেশ ব্যাংক।