লেনদেন স্থগিত হওয়া সর্বশেষ ব্রোকারেজ হাউস তামহা সিকিউরিটিজের কয়েকশ গ্রাহকের শেয়ার ও নগদ জমা করা অর্থে ঘাটতি ৬৭ কোটি টাকা- এমন দাবি খোদ ব্রোকারেজ হাউসটির মূল মালিক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. হারুনুর রশীদের। তিনি রাজধানীর ডেল্টা হাসপাতালের মনোরোগ বিশেষজ্ঞ। যদিও শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি এবং ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) পরিদর্শক দল প্রতিষ্ঠানটিতে যথাক্রমে ১৪০ কোটি ও ৮৭ কোটি টাকার ঘাটতি পেয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত ব্রোকারেজ হাউসটির গ্রাহকদের (শেয়ারবাজারের বিনিয়োগকারী) থেকে শেয়ার ও নগদ মিলে সাড়ে সাত কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ পেয়েছে স্টক এক্সচেঞ্জ। বিএসইসি এখন এ বিষয়ে বিশেষ নিরীক্ষা করবে।

ডিএসইর কর্মকর্তারা জানান, গ্রাহকের প্রকৃতই কত টাকা লোপাট হয়েছে, সে বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য মিলছে। তবে এর মালিক যে ৬৭ কোটি টাকা ঘাটতি থাকার কথা বলেছেন, প্রকৃতপক্ষে তার ঘাটতি এর কম হবে না। এর অর্থ, এখনও কয়েকশ গ্রাহক তাদের অন্তত ৬০ কোটি টাকা লোপাটের দাবি করেননি। এর কারণ কী- এমন প্রশ্নের উত্তরে কর্মকর্তারা জানান, তারা হয়তো জানেন না। তবে গত নভেম্বরে ব্রোকারেজ হাউসটির শেয়ার লেনদেন স্থগিত করার পরই বিজ্ঞপ্তি দিয়ে গ্রাহকদের দাবি জানাতে বলেছিলেন। এখন পর্যন্ত ২৪২ গ্রাহক সাত কোটি ৪৯ লাখ টাকা লোপাটের অভিযোগ করেছেন। অথচ ব্রোকারেজ হাউসটিতে বিও হিসাব ছিল প্রায় দুই হাজার।

অভিযোগ কম আসার কারণ অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রভাবশালী ও বড় গ্রাহকরা ব্রোকারেজ হাউসটির মালিকের সঙ্গে ব্যক্তিগত সমঝোতার মাধ্যমে অর্থ আদায়ের চেষ্টা করছেন। এদের বড় অংশই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাক্তার, কয়েকজন রাজনীতিবিদ এবং সরকারি কর্মকর্তা। ব্যক্তিগত সমঝোতার অংশ হিসেবে কয়েক কোটি টাকার চেকও নিয়েছেন। কিন্তু এ ঘটনায় ডা. হারুনসহ সবার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ হওয়ায় তারাও এ পথে টাকা ফিরে পাওয়া নিয়ে শঙ্কায়। জানা গেছে, বড় ও প্রভাবশালী গ্রাহকরা ভিন্ন প্রক্রিয়ায় টাকা আদায়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির চেয়ারম্যান শিবলী রুবাইয়াত-উল ইসলামের সঙ্গে দেখা করেছেন।

এদিকে কবে এবং কীভাবে টাকা বা শেয়ার ফেরত পাবেন- সে বিষয়ে জানতে ব্রোকারেজ হাউস, বিএসইসি ও ডিএসইর দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন সাধারণ গ্রাহকরা। কারও কাছ থেকে সুনির্দিষ্ট আশ্বাস না পাওয়ায় আজ বুধবার ঢাকার পুরানা পল্টনে সংবাদ সম্মেলন ডেকেছেন তারা।

বিএসইসি ও ডিএসইর কর্মকর্তারা জানান, ব্রোকারেজ হাউসটির মালিকের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের চেষ্টায় অগ্রাধিকার দিচ্ছেন তারা। ডা. হারুন বলেছেন, তার সমুদয় সম্পদ বিক্রি করে হলেও আগামী জুনের মধ্যে সব দায় শোধ করবেন। এ মর্মে লিখিত প্রতিশ্রুতি এবং পরিকল্পনাও জমা দিয়েছেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী ব্রোকারেজ হাউসটি ২৫ কোটি এবং গুলশানে ছয় কাঠার জমিসহ ভবন ৩০ কোটি টাকায় বিক্রি করে ৫৫ কোটি টাকার দায় শোধ করবে। বাকি টাকা লালমাটিয়ায় ছয়তলা ভবন বিক্রি করে শোধ করবে বলে জানিয়েছেন।

ডিএসই সূত্র জানিয়েছে, এক ব্যবসায়ী ব্রোকারেজ হাউসটি ২৫ কোটি টাকায় কেনার জন্য অগ্রিম পাঁচ কোটি টাকা দিয়ে চুক্তি করেন। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটির দায়ের কথা শুনে ওই ব্যবসায়ী এখন কিনতে চাচ্ছেন না। অগ্রিম দিয়ে তিনিও এখন বেকায়দায়। তাছাড়া গুলশান ও লালমাটিয়ার ভবন দুটির মালিকানায় ডা. হারুন ছাড়া তার দুই বোন আছেন। এর মধ্যে লালমাটিয়ার বাড়িটি পূবালী ব্যাংকে মর্টগেজ রেখে ঋণ নেওয়া। দুই বোন ব্রোকারেজ হাউসটির মালিকানায় থাকলেও তাদের দাবি, গ্রাহকদের অর্থ লোপাটে জড়িত নন। গ্রাহকদের টাকা পরিশোধের জন্য তাদের সম্পদ বিক্রির চেষ্টা হলে মামলার হুমকি দিয়েছেন।
বিএসইসির কর্মকর্তারা জানান, সংস্থাটির পরিদর্শক দল যে ১৪০ কোটি টাকার ঘাটতি পেয়েছে, তার মধ্যে ব্রোকারেজ হাউসটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. হারুনের ব্যক্তিগত গাড়ির ড্রাইভার মামুন হোসেনের নামে খোলা বিওতে প্রায় ৭০ কোটি টাকার ঘাটতি আছে। ধারণা করা হচ্ছে, এটি ডা. হারুনেরই বেনামি অ্যাকাউন্ট। তিনিই হয়তো অর্থ লোপাট করেছেন।

গত বছর শেয়ারের দর বেড়ে গেলে গ্রাহকদের শেয়ার ফেরত দিতে না পেরে ডিএসইর সাবেক এক সিনিয়র সহসভাপতির পরামর্শে ডা. হারুন নিজেই ডিএসইতে গিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ করেন এবং সাধ্যমতো অর্থ পরিশোধের প্রতিশ্রুতি দেন। এভাবে নিজের দায় এড়াতে চেয়েছিলেন তিনি। গত ৯ নভেম্বর থেকে তামহা সিকিউরিটিজের লেনদেন স্থগিত আছে। প্রতিষ্ঠানটি গ্রাহকদের শেয়ার ও অর্থ লোটার ঘটনা লুকাতে দুটি ব্যাক অফিস সফটওয়্যার ব্যবহার করত। ফলে কেউই এ জালিয়াতির কথা বুঝতে পারেনি। এসব বিষয়ে ডা. হারুনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে তাকে পাওয়া যায়নি।