দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগের তিলক এঁকে আগামী সোমবার বিদায় নিচ্ছে কে এম নূরুল হুদার নেতৃত্বাধীন বর্তমান নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এবারই প্রথম কোনো নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। এর আগের ১১টি কমিশনের প্রত্যেকেই কমবেশি রাজনৈতিক বিতর্কের মুখে পড়লেও কারও বিরুদ্ধে আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ প্রকাশ্যে আসেনি।
বিশ্নেষকরা মনে করছেন, দেশের নির্বাচন ব্যবস্থা পুরোপুরি ধ্বংস করে দিয়েছে বর্তমান কমিশন। এই অপরাধে তাদের বিচারের মুখোমুখি করা উচিত। গত পাঁচ বছরে তাদের মেয়াদে অনুষ্ঠিত প্রায় সব নির্বাচন এবং এতে কমিশনের ভূমিকা নিয়ে বিভিন্ন মহলে নানা প্রশ্ন ছিল। কমিশনের ভেতর থেকেও নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন ওঠে একাধিকবার। কমিশনার মাহবুব তালুকদার এ নিয়ে পুরো মেয়াদ সোচ্চার থাকলেও অন্য সদস্যরা ছিলেন সিইসির সঙ্গেই। তবে গতকাল বুধবার নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে কমিশনার রফিকুল ইসলাম বলেছেন, দলীয় সরকারের অধীনের ভোটে কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। ভোট ইসি একা করে না।
ইসি সংশ্নিষ্টরা বলছেন, নির্বাচনী অনিয়ম নিয়ে কমিশন সদস্যদের মধ্যে প্রকাশ্য মতভেদ ছিল। প্রশিক্ষণ ভাতার নামে আর্থিক অনিয়মে জড়িতদের তালিকায় জড়িয়েছেন মাহবুব তালুকদারও। সাংবিধানিক পদধারী এসব ব্যক্তি বিরুদ্ধে জাতীয় নির্বাচনে গুরুতর অসদাচরণ এবং আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ তদন্তে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠনের দাবিতে রাষ্ট্রপতিকে দুই দফা চিঠি দেন দেশের বিশিষ্টজন।
ইসি সূত্র জানায়, ইসি সচিবালয়ে সব ধরনের বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের জন্য আলোচিত চার কর্মকর্তা প্রশিক্ষণ ব্যয়ের কেলেঙ্কারিতেও মুখ্য ভূমিকা পালন করেছেন। এই সময়ে নির্বাচন প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ছিলেন সাবেক সিইসি বিচারপতি এম এ আজিজের ব্যক্তিগত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তা মোস্তফা ফারুক। এই কেলেঙ্কারি ফাঁস হওয়ার পর তাকে ফরিদপুরের আঞ্চলিক কর্মকর্তা হিসেবে বদলি করা হয়।
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও পঞ্চম উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের আগে বিভিন্ন পর্যায়ের সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ দেয় ইসি। এতে প্রশিক্ষক হিসেবে বিশেষ বক্তা, কোর্স উপদেষ্টাসহ কয়েকটি পদ তৈরি করে সারাদেশে তিন কোটি টাকার বেশি সম্মানী ভাতা দেওয়া হয়। বিশিষ্টজনের আপত্তি দেওয়ার কিছুদিন পরই স্থানীয় ও রাজস্ব অডিট অধিদপ্তরের প্রতিবেদন প্রকাশ হয়। এতে বলা হয়, এসব পদ অনুমোদিত নয়। ওই ভাতা দেওয়ায় রাষ্ট্রের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। সব মিলে ২০১৮-১৯ অর্থবছরের নিরীক্ষায় প্রশিক্ষকদের পেছনে তিন কোটি ৩৫ লাখ টাকা ব্যয় নিয়ে আপত্তি ওঠে। ঢাকার বাইরে বিভিন্ন প্রশিক্ষণে এক কোটি দুই লাখ টাকা এবং প্রশিক্ষণের টাকা অন্য খাতে ব্যয় করায় দুই কোটি ৭৯ লাখ ৭০ হাজার ৪৭৫ টাকা নিয়েও আপত্তি তোলা হয়েছে। অডিট আপত্তিতে বলা হয়, অনুমোদিত পদের বাইরে ওই পদ সৃষ্টি করে ভাতা পরিশোধ করায় ১৯ লাখ ৭৬ হাজার টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।
আরেকটি আপত্তিতে বলা হয়, কোর্স পরিচালক পদে অতিরিক্ত সম্মানী নেওয়ায় ১৪ লাখ ৯৩ হাজার ৮০০ টাকার ক্ষতি হয়েছে। যদিও নির্বাচন কমিশন বলছে, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে আর্থিক ব্যবস্থাপনা কমিশনের নিজস্ব এখতিয়ার।
বিশিষ্ট আইনজীবী ড. শাহ্‌দীন মালিক বলেছেন, সংবিধানের ১৪৭ (৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সাংবিধানিক পদে আসীন যে কোনো ব্যক্তি তার পদের জন্য বেতন-ভাতা, সুযোগ-সুবিধার বাইরে সরকারি কোনো উৎস থেকে অতিরিক্ত টাকা নিতে করতে পারবেন না। ফলে নিয়মিত প্রশিক্ষণের জন্য, বক্তব্যের জন্য বহুবার অর্থ গ্রহণ নিঃসন্দেহে সংবিধান লঙ্ঘন।
বর্তমান কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর কুমিল্লা ও রংপুর সিটি করপোরেশনের নির্বাচন করে। এরপর ২০১৭ সালের ১৬ জুলাই একাদশ সংসদ নির্বাচনের কাজের তালিকা প্রকাশ করে। ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ক্ষমতাসীন দলকে সুবিধা দিতে আইন পরিবর্তন, সীমানা পরিবর্তন, আবার প্রভাবশালী মন্ত্রীদের কারণে সীমানা পুনর্নির্ধারণ থেকে পিছু হটার অভিযোগ ওঠে।
আদালতের আদেশে একের পর এক সিটি নির্বাচন স্থগিত হলেও তখন অজানা কারণে আপিল করেনি নির্বাচন কমিশন। ঢাকার দুই সিটির পর গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচন স্থগিত হওয়ায় ক্ষুব্ধ হয় রাজনৈতিক দলগুলো। কাগজপত্র না পেয়েই কয়েক মিনিটের মধ্যে দ্রুত নির্বাচনী প্রচার স্থগিতের জন্য নির্দেশনা দেয় ইসি। অভিযোগ রয়েছে, সরকার ওই সময়ে নির্বাচনে আগ্রহী ছিল না।
একাদশ সংসদ নির্বাচনে বিপুল বিজয় পায় আওয়ামী লীগ। ফল প্রত্যাখ্যান করে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও বিএনপি। ভোটের আগের রাতেই ক্ষমতাসীনরা ব্যালট বাক্স ভর্তি করে বলে অভিযোগ তোলে বিএনপিসহ সরকারবিরোধী দলগুলো। পরে ভোটের কেন্দ্রভিত্তিক ফলাফলেও অনেক অসংগতি দেখা যায়। ওই নির্বাচনের প্রায় ছয় মাস পরে নির্বাচনের কেন্দ্রভিত্তিক ফল প্রকাশ করে ইসি। এতে দেখা যায়, ১০৩টি আসনের ২১৩টি ভোটকেন্দ্রে শতভাগ ভোট পড়েছে। যা নির্বাচনী কর্মকর্তাদের কাছেও অস্বাভাবিক ঠেকে। ২০১৯ সালের উপজেলা নির্বাচনে রেকর্ডসংখ্যক প্রার্থী বিনা ভোটে নির্বাচিত হন। এরপর অন্য নির্বাচনগুলোতেও বিনা ভোটে জয়ের নতুন সংস্কৃতি তৈরি হয় দেশের নির্বাচন ব্যবস্থায়।
বর্তমান কমিশনের সদস্য কমিশনার রফিকুল ইসলাম বলেন, একাদশ সংসদ নির্বাচনে কোনো ভোটার যদি বলে থাকেন তারা ভোট দিতে পারেননি, তাহলে তিনি ভুল বলেছেন। ভোট রাতে হয়নি। রাতের ভোট নিয়ে তিনি ওপেন চ্যালেঞ্জ ছুড়ে বলেন, ভোটের দিন এমন অভিযোগ পেলে অবশ্যই ভোট বন্ধ করে দিতেন। রফিকুল ইসলাম বলেন, ২১৩ কেন্দ্রে শতভাগ ভোটে অস্বস্তি আছে ইসির। তারা কোনো দলের হয়ে কাজ করেননি। গণতন্ত্রের স্বার্থে কাজ করেছেন। দলীয় সরকারের অধীনের ভোটে কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে সেটা স্বীকার বলে তিনি বলেন, ভোট ইসি একা করে না। সব পক্ষের সহযোগিতা প্রয়োজন। তপশিল ঘোষণার পরে ১০ থেকে ১৫ দিন সময় ইসির হাতে দায়িত্ব থাকে। এই সময়ের মধ্যে সবার ওপর নিয়ন্ত্রণ নেওয়া যায় না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
কমিশনের পুরো পাঁচ বছর আলোচিত কমিশনার মাহবুব তালুকদারের এক তরফা সংবাদ সম্মেলনে কমিশনের কাজের প্রকাশ্য সমালোচনায় মুখর ছিলেন। সাংবাদিকদের নিজ কক্ষে ডেকে তিনি নিজের বক্তব্য প্রকাশ করলেও কখনোই কোনো প্রশ্নের জবাব দিতেন না। একাদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার প্রার্থিতা বাতিলের বিষয়েও তিনি প্রকাশ্যেই ভিন্নমত পোষণ করেন। ইসি ভবনে সব কমিশনারের উপস্থিতিতে এই শুনানি হয়। এক পর্যায়ে তিনি খালেদা জিয়ার প্রার্থিতা বৈধ বলে ঘোষণা দেন। পরে অবশ্য সিইসিসহ অন্য তিন কমিশনার আলাদাভাবে অবৈধ ঘোষণা করেন।
এই কমিশনের অধীনে অনুষ্ঠিত কুমিল্লা ও নারায়ণগঞ্জ সিটি নির্বাচন ছাড়া অন্য সব নির্বাচনে কমিশন স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেনি বলে তার অভিযোগ। চট্টগ্রাম, গাজীপুর ও বরিশাল সিটি নির্বাচনের অনিয়মের বিষয়ে তিনি অনেক বেশি প্রকাশ্যে কথা বলেছেন। বরিশাল সিটির ভোট বন্ধের সিদ্ধান্ত হওয়ার পরও অদৃশ্য কারণে কমিশন পিছটান দেয় বলে সাংবাদিকদের কাছে তিনি তাৎক্ষণিক অভিযোগ তোলেন। এ ছাড়া নানা ইস্যুতে তিনি বর্তমান কমিশনের কার্যক্রমে প্রকাশ্যে সমালোচনামুখর ছিলেন।
ইভিএম নিয়েও বিতর্কে জড়িয়েছে বর্তমান কমিশন। ভোটের সময় ইভিএম অচল হয়ে যাওয়া, ভোটার শনাক্তে ব্যর্থতাসহ বিভিন্ন বিষয়ে ভোটারের তিক্ত অভিজ্ঞতা রয়েছে। এমনকি সিটি নির্বাচনে সিইসি কে এম নূরুল হুদা, কমিশনার মাহবুব তালুকদারসহ দেশের বেশ কয়েকজন বিশিষ্টজন ভোটারের হাতের ছাপ না মেলায় ভোট দিতে সমস্যায় পড়লে ইভিএম নিয়ে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে ইসি।
সাবেক নির্বাচন কমিশনার মো. শাহনেওয়াজ সমকালকে বলেন, বিদায়ী কমিশনের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা নিজেদের মধ্যে সমন্বয়হীনতা এবং তা বাইরে প্রকাশ হয়ে যাওয়া। এর ফলে জনমনে তাদের ব্যাপারে আস্থাহীনতা প্রকট হয়ে ওঠে। বর্তমান কমিশনের অধীনে অনুষ্ঠিত কিছু নির্বাচন ভালো হলেও বেশিরভাগই খারাপ হয়েছে। তবে ভালো নির্বাচন না হওয়ার সব ব্যর্থতা কমিশনের ঘাড়ে চাপানো ঠিক নয়। সরকারি দলের পক্ষ থেকে অনেক চাপ ছিল, যা তারা কাটিয়ে উঠতে পারেনি। বিদায়ী ইসির বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ সম্পর্কে তিনি বলেন, এসব অভিযোগ নিয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য ছাড়া মন্তব্য করা উচিত নয়। তবে অডিট আপত্তি নিষ্পত্তি করতে না পারা অবশ্যই কমিশনের অদক্ষতার পরিচয়।