পানি ছাড়া জীবন চলে না। গ্যাস, বিদ্যুৎ, জ্বালানিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু খাল-বিল-নদীর দেশে দাম চড়ছে পানির। দফায় দফায় বাড়ছে অন্য তিনটি পণ্যের দামও। ধীরে ধীরে এসব যেন চলে যাচ্ছে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। অতি প্রয়োজনীয় পণ্যগুলোর দাম গত ১২ বছরে বেড়েছে দুই থেকে আড়াই গুণ। দুর্বিষহ জীবনে পড়েছেন শ্রমিক, কৃষক, চাকরিজীবী ও নিম্ন আয়ের মানুষ। বিনোদন, চিকিৎসা, লেখাপড়া এমনকি খাওয়ার খরচ কমিয়ে তারা চাপ সামলাচ্ছেন। সব দিকে কাটছাঁট করে শুধু প্রাণটুকু বাঁচিয়ে কাটিয়ে দিচ্ছেন দিন। নতুন করে দাম বাড়ানোর চেষ্টা যেন তাদের গলার ফাঁস হয়ে দাঁড়িয়েছে

গত ১২ বছরে ১৩ বার পানির দাম বাড়িয়েছে ঢাকা ওয়াসা। ২০০৮ সালের জুলাই মাসে বাসাবাড়ির জন্য প্রতি ইউনিট পানির দাম ছিল পৌনে ছয় টাকা। প্রায় পৌনে তিন গুণ বেড়ে ২০২১ সালের জুলাইয়ে তা হয়েছে প্রায় সোয়া ১৫ টাকা। বাণিজ্যিক খাতে দাম বেড়েছে প্রায় সমহারে- ১৯ টাকা ১৫ পয়সা থেকে হয়েছে ৪২ টাকা। শুধু পানির দাম নয়, প্রতিবারই সমহারে বেড়েছে স্যুয়ারেজ বিলও। ৩০ শতাংশেরও কম এলাকায় সেবা দিলেও পানির দামের সমান দরে প্রায় শতভাগ গ্রাহকের কাছে স্যুয়ারেজ বিল নিয়ে আসছে ওয়াসা।
এরপরও গত বছর থেকেই আবার পানির দাম ও স্যুয়ারেজ বিল বাড়ানোর চেষ্টা করে আসছে প্রতিষ্ঠানটি। সর্বশেষ গত ৭ ফেব্রুয়ারি ঢাকা ওয়াসার বোর্ড সভায় সংস্থাটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) তাকসিম এ খান এবার ৩৮ শতাংশ পানির দাম বৃদ্ধির প্রস্তাব তোলেন। বোর্ডের ১৩ সদস্যের মধ্যে তিনি ও চেয়ারম্যান গোলাম মোস্তফা ছাড়া বাকি সবাই এর বিরোধিতা করেন। শেষ পর্যন্ত তার প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর কথা বলেন। গত ৮ ফেব্রুয়ারি এ খবর সমকালে প্রকাশিত হলে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা তুঙ্গে ওঠে।
নগরবাসী ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকা ওয়াসা কখনোই বিশুদ্ধ পানযোগ্য পানি নগরবাসীকে সরবরাহ করতে পারেনি। এ জন্য বাধ্য হয়ে নগরবাসীর মধ্যে গভীর নলকূপ স্থাপনের প্রবণতা বাড়ছে। পাশাপাশি ঢাকা ওয়াসায় দুর্নীতি বেড়েছে অসহনীয় মাত্রায়। এ ছাড়া দুই বছর ধরে চলছে করোনাভাইরাসের মহামারি। এ সময়ে মানুষের আয়-রোজগার অনেক কমেছে। সাধারণ মানুষের পক্ষে জীবন-জীবিকা টিকিয়ে রাখাই একটা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই সময়ে পানি-বিদ্যুৎ-গ্যাসের দাম বৃদ্ধির উদ্যোগ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। এতে করে নিম্ন ও সাধারণ আয়ের মানুষ ফুঁসে উঠতে পারে।
কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) চেয়ারম্যান অধ্যাপক গোলাম রহমান সমকালকে বলেন, এমন উদ্যোগ জনপ্রত্যাশার বাইরে। এটা মোটেই সমীচীন হচ্ছে না। করোনার সময়ে মানুষ দুরবস্থার মধ্যে আছে। কিছু লোক ভালো ব্যবসা করলেও সাধারণ মানুষ তো জীবন-জীবিকাই নির্বাহ করতে পারছে না। ওয়াসা যেখানে সেবার মান উন্নত করতে পারছে না, সুপেয় পানিও তারা দিতে পারছে না। যে পানি দিচ্ছে, সেটা ফুটিয়ে বা ফিল্টার করে খেতে হয়। তারা বরং সংস্থার ব্যবস্থাপনা ব্যয় কমাক।
২০১৯ সালের ২৩ এপ্রিল জুরাইনের বাসিন্দা মিজানুর রহমান ঢাকা ওয়াসা ভবনে সপরিবারে হাজির হয়েছিলেন। সঙ্গে নিয়ে যান তার বাসার ট্যাপ থেকে সংগ্রহ করা এক জগ পানি, লেবু ও চিনি। উদ্দেশ্য, ওই পানি দিয়ে শরবত বানিয়ে এমডি তাকসিম এ খানকে পান করাবেন। গতকাল তিনি সমকালকে বলেন, প্রতিবাদ করার পরও আগের মতোই ঘোলা পানি আসছে। এ নিয়ে ওয়াসার মাথাব্যথা নেই। আর করোনার কারণে মানুষ যে কী কষ্টে আছে, যারা ভুক্তভোগী তারাই বুঝতে পারছেন। এর ওপর পানির দাম আবার বাড়ালে মানুষ বাঁচবে কীভাবে? ওয়াসায় দুর্নীতির শেষ নেই। সেই দুর্নীতির কারণে তারা পানির দাম বাড়াতে চাইছে। মূল্য সন্ত্রাস চালাচ্ছে। একের পর এক ঘটনা ঘটেই যাচ্ছে। আর আমরা সহ্য করেই যাচ্ছি।
ঢাকা ওয়াসার বিভিন্ন প্রকল্প ও কার্যক্রম নিয়ে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ দীর্ঘদিন থেকেই। এমনকি সবচেয়ে বড় পানি শোধনাগার পদ্মা-জশলদিয়া প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক রফিকুল ইসলামসহ অনেককে মাঝেমধ্যেই দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ডেকে পাঠাচ্ছে। অতীতে ঢাকা ওয়াসার এমডি তাকসিম এ খানকেও দুর্নীতির অভিযোগে হাজিরা দিতে হয়েছে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) চেয়ারম্যান ড. ইফতেখারুজ্জামান সমকালকে বলেন, ওয়াসা বলছে, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধির কারণে দাম বাড়াতে বাধ্য হচ্ছে। কিন্তু দুর্নীতি বন্ধ করা গেলে দাম আরও কমানো যেত। তারা সেটা করছে না। অথচ ঢাকা ওয়াসায় দুর্নীতি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করেছে। প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে তাদের অদক্ষতা আছে। অনেকটা ব্যর্থ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে ওয়াসা। এসব অদক্ষতা ও দুর্নীতি বন্ধ ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে পানির দাম বাড়ানোর প্রয়োজন পড়ত না। এর আগে ১২ বছরে ১৩ বার পানির দাম বাড়ানো হয়েছিল। আবারও তারা বাড়াতে চাইছে। এটা সম্পূর্ণ স্বৈরতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত।
তিনি আরও বলেন, ঢাকা ওয়াসা বোর্ডের উচিত সংস্থার দুর্বলতা নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা; পানির মান বাড়ানোর পদক্ষেপ নেওয়া।
ঢাকা ওয়াসা বোর্ডের সদস্য ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ১২ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মামুন রশিদ শুভ্র সমকালকে বলেন, সেদিনের বোর্ড সভায় পানির মূল্যবৃদ্ধির বিষয়ে প্রায় সবাই প্রতিবাদ করে বলেছেন, করোনার এই সময়ে পানির দাম বাড়ানো ঠিক হবে না। কিন্তু এক পর্যায়ে এমডি বলেন, তাহলে প্রস্তাবটি মন্ত্রণালয়ে যাক। দেখা যাক, মন্ত্রণালয় কী মতামত দেয়। তারপর দেখা যাবে।
ঢাকা ওয়াসার প্রস্তাব ছিল ৩৮ শতাংশ পানির দাম বাড়ানোর। এটা হলে বর্তমানে আবাসিকে প্রতি হাজার লিটার পানির (প্রতি ইউনিট) দাম ১৫ টাকা ২৮ পয়সা থেকে বেড়ে হবে ২০ টাকা ৯৪ পয়সা। সমপরিমাণ স্যুয়ারেজ বিল যুক্ত হলে প্রতি ইউনিটের পানির প্রকৃত মূল্য দাঁড়াবে ৪১ টাকা ৮৮ পয়সা।
একইভাবে বাণিজ্যিকে বর্তমানে ৪২ টাকা থেকে বেড়ে হবে ৫৭ টাকা ৯৭ পয়সা। সমপরিমাণ স্যুয়ারেজ বিল যুক্ত হলে প্রতি ইউনিটের দাম পড়বে ১১৫ টাকা ৯৪ পয়সা।
তবু বাড়াতেই চান ওয়াসার এমডি :পানির মূল্যবৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়ার খবর সমকালে প্রকাশিত হওয়ার পর গণমাধ্যমকর্মীরা ওয়াসার এমডি তাকসিম এ খানের মতামত জানতে যোগাযোগ শুরু করেন। গতকাল বুধবার ওয়াসা ভবনে গণমাধ্যম কর্মীদের সঙ্গে একটি মতবিনিময়ের আয়োজন করেন তিনি। এ সময় তিনি বলেন, বর্তমানে প্রতি হাজার লিটার পানিতে সরকারকে ভর্তুকি দিতে হচ্ছে ১০ টাকা। সরকারের উচ্চ মহল থেকে পানিতে ভর্তুকির পরিমাণ ধীরে ধীরে কমানোর নির্দেশনা রয়েছে।
তিনি বলেন, পানির দাম সহনীয় রাখতে সব চেষ্টাই করা হচ্ছে। একটা প্রতিষ্ঠান তো ভিক্ষা করে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে না। তাই ভর্তুকির পরিমাণ কমাতে পানির দাম সমন্বয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এ সময় পানির দাম বাড়ানোর পক্ষে কিছু যুক্তি তিনি তুলে ধরেন। এক পর্যায়ে বলেন, এখন যেহেতু পানির দাম বাড়ানোর বিষয়ে এত সমালোচনা হচ্ছে, তাহলে ২০ শতাংশ হারে দাম বাড়ানোর প্রস্তাব তিনি মন্ত্রণালয়ে পাঠাবেন।

বিষয় : পানির দামে কাহিল জীবন

মন্তব্য করুন