পানি ছাড়া জীবন চলে না। গ্যাস, বিদ্যুৎ, জ্বালানিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু খাল-বিল-নদীর দেশে দাম চড়ছে পানির। দফায় দফায় বাড়ছে অন্য তিনটি পণ্যের দামও। ধীরে ধীরে এসব যেন চলে যাচ্ছে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। অতি প্রয়োজনীয় পণ্যগুলোর দাম গত ১২ বছরে বেড়েছে দুই থেকে আড়াই গুণ। দুর্বিষহ জীবনে পড়েছেন শ্রমিক, কৃষক, চাকরিজীবী ও নিম্ন আয়ের মানুষ। বিনোদন, চিকিৎসা, লেখাপড়া এমনকি খাওয়ার খরচ কমিয়ে তারা চাপ সামলাচ্ছেন। সব দিকে কাটছাঁট করে শুধু প্রাণটুকু বাঁচিয়ে কাটিয়ে দিচ্ছেন দিন। নতুন করে দাম বাড়ানোর চেষ্টা যেন তাদের গলার ফাঁস হয়ে দাঁড়িয়েছে

নাহিদুর রহমান নারায়ণগঞ্জের কাঁচপুর এলাকার একটি পোশাক কারখানার কর্মকর্তা। পরিবারের কারণে থাকেন রাজধানীর হাজারীবাগের জিগাতলায়। সাপ্তাহিক ছুটির দিন বাদে তাকে মাসে ২৫ দিন কাঁচপুর যেতে হয়। আগে দৈনিক আসা-যাওয়ায় বাস ভাড়া লাগত ৮০ টাকা। এখন লাগছে ১২০ টাকা। শুধু বাস ভাড়া বাবদই মাসে তার খরচ বেড়েছে এক হাজার টাকা। বেড়েছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবার খরচও। কিন্তু বেতন এখনও ৩০ হাজার টাকাই।
গত বছর নভেম্বরে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় সরকার। এরপর ৮ নভেম্বর থেকে বাড়ে বাসের ভাড়া। তাতে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে আগে থেকেই চাপে থাকা নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তের আরও বাড়তি খরচের বোঝা চাপে। গত ১২ বছরে ছয়বার জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে সরকার। ফলে ২০০৯ সালের শেষেও যে ডিজেলের মূল্য ছিল ৪৪ টাকা লিটার, এখন তা হয়েছে ৮০ টাকা। দাম বেড়েছে প্রায় ৮২ শতাংশ। ঢাকার কামরাঙ্গীরচরের ঝাউচরের বাসিন্দা আবু রায়হানের অফিস খিলক্ষেতে। তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে তিনি ২০ হাজার টাকা বেতনে চাকরি করেন। ঝাউচর থেকে আগে ১০ টাকা বাস ভাড়ায় মোহাম্মদপুর গিয়ে, সেখান থেকে আরেক বাসে ২৫ টাকায় খিলক্ষেত যেতেন। ১০ টাকার বাস ভাড়া বেড়ে হয়েছে ১৫ টাকা, আর ২৫ টাকার ভাড়া ৩৫। মাসে এ বাবদই তার খরচ বেড়েছে ৭৫০ টাকা।
নাহিদুর রহমান ও আবু রায়হানের মতো কোটি মানুষ জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন। দু'জনেই বললেন, অন্য খরচ কমিয়ে বাড়তি ভাড়ার জোগান দিচ্ছেন। আগে মাসে একদিন বেড়াতে যেতেন, বাইরে খেতেন। এখন আর তা সম্ভব হচ্ছে না।
গণপরিবহন বিশেষজ্ঞ বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. হাদিউজ্জামান সমকালকে বলেন, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী একটি নাগরিকবান্ধব শহরে একজন ব্যক্তির যাতায়াত ব্যয় তার আয়ের ১০ শতাংশের কম হতে হবে। ১০ শতাংশ ব্যয়কে 'কাট অব পয়েন্ট' বলা হয়। বিশ্বব্যাংকের গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঢাকায় যাতায়াত ব্যয় একজন মানুষের আয়ের প্রায় ২০ শতাংশ। এতেই বোঝা যায় মানুষ কতটা চাপে রয়েছে।
শুধু শহরের বাসিন্দা নয়, গ্রামের কৃষকও ভুগছে জ্বালানির দাম বৃদ্ধিতে। সরকারি হিসাবেই বছরে কৃষকের খরচ বেড়েছে ৭৫৪ কোটি টাকা। সেচের খরচ বাড়ায় বেড়েছে উৎপাদন খরচ। তাতে বেড়েছে দ্রব্যমূল্য।
শুধু বাস নয়, বেড়েছে লেগুনার ভাড়াও। মধ্যবিত্তের যান সিএনজিচালিত অটোরিকশাও ভাড়া বাড়িয়েছে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণ দেখিয়ে। রাজধানীর জিগাতলা ও মোহাম্মদপুর থেকে ফার্মগেটের লেগুনার ভাড়া ছিল ১৫ টাকা। করোনা সংক্রমণ রোধে আসন অর্ধেক খালি রাখার শর্তের কারণে বেড়ে হয় ২৫ টাকা। এখন সব আসনে যাত্রী তোলা হলেও ২৫ টাকাই নেওয়া হচ্ছে।
বুধবার রাজধানীর বাংলামটর মোড়ে দেখা গেল, সেখান থেকে বনশ্রী যেতে ৩০০ টাকা ভাড়া দাবি করছেন অটোরিকশা চালক। যাত্রী জানালেন, মাস কয়েক আগেও ২০০-২২০ টাকা যেতেন। উবার, পাঠাওর মতো অ্যাপভিত্তিক গাড়িগুলোতে ভাড়া বাড়ায় সিএনজি অটোরিকশাও বাড়তি ভাড়া হাঁকাচ্ছে।
অটোরিকশাচালক দেলোয়ার হোসেন বললেন, সড়ক পরিবহন আইনের মামলায় পড়লেই হাজার টাকা জরিমানা গুনতে হচ্ছে। আগে পুলিশকে ৫০-১০০ টাকা ধরিয়ে দিয়ে পার পাওয়া গেলেও জরিমানা বাড়ায় ৫০০ টাকার কমে ঘুষ নেই! সে কারণেই ভাড়া বাড়তি।
মালিক শ্রমিক নেতারা নাম প্রকাশ করে ঘুষ ও চাঁদা নিয়ে কথা বলতে রাজি নন। তবে সবাই এক সুরে বলেছেন, দিনে হাজার থেকে দেড় হাজার টাকা যায় ঘুষ চাঁদায়। অটোরিকশাচালক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মো. হানিফ খোকন বললেন, খুব কষ্টে আছেন তারা। মালিক সমিতির সভাপতি বরকত উল্লাহ বুলুও একই কথা বললেন।
লিটারে ১৫ টাকা দাম বাড়ায় বাসের কিলোমিটার ৪৫ পয়সা বেড়ে দুই টাকা ১৫ পয়সা হয়েছে। কিন্তু অধিকাংশ বাসেই তা না মানার কারণ হিসেবে মালিক-শ্রমিকরা ঘুষ-চাঁদার কথাই বলছেন। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, বাস চালাতে দিনে ১৪০০ টাকা পর্যন্ত ঘুষ-চাঁদা দিতে হয়। এই খরচ ভাড়ার হিসাবে দেখানো যায় না- তাই যাত্রীর পকেট কেটে তুলতে হয়।
রাজধানীর দিশারী পরিবহনের মালিক মহারাজ হোসেন বললেন, সবাই তো সবই জানে। এর বেশি বলতে রাজি নন তিনি।

বিষয় : জ্বালানি তেলে দুর্ভোগ

মন্তব্য করুন