বাংলাদেশে গুম-খুনের ঘটনা বন্ধ করতে হলে রাজনীতির স্বাভাবিক গতিধারা ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি অতীতে ঘটে যাওয়া প্রতিটি গুমের ঘটনার স্বচ্ছ তদন্ত ও দোষীদের বিচারের দাবি জানিয়েছেন বিশিষ্টজনরা। 

বৃহস্পতিবার সেন্টার ফর গভর্নেন্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত 'জোরপূর্বক নিখোঁজ এবং রাষ্ট্রের দায়' শিরোনামে ওয়েবিনারে বিশিষ্টজন এ মত দেন।

সিজিএস চেয়ারম্যান ড.মনজুর আহমেদের সভাপতিত্বে আলোচনায় অংশ নেন বিশিষ্ট আইনজীবী ড.শাহদীন মালিক, আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য অসীম কুমার উকিল, বিএনপির সংসদ সদস্য হারুনুর রশীদ, বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতির নির্বাহী পরিচালক সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান এবং আইন ও সালিশ কেন্দ্রের মহাসচিব নূর খান লিটন। ওয়েবিনারটি সঞ্চালনা করেন সিজিএস নির্বাহী পরিচালক সাংবাদিক জিল্লুর রহমান। 

আলোচনায় অংশ নিয়ে ড.শাহদিন মালিক বলেন, ‘বিচারবহির্ভূত হত্যার পেছনে জড়িত যারা বেঁচে আছে আজ না হোক ৩০ বছর পর তাদের বিচার হবে। লাতিন আমেরিকার ৭০ দশকের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলোর বিচার হচ্ছে। বাংলাদেশেও এগুলোর বিচার হবে। কতগুলো জিনিসের বিচার না হলে সমাজ টিকে থাকতে পারে না। আজ হোক দশ বছর পরে হোক যারা এসব ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছেন তাদেরকেও হুকুমের আসামি হিসেবে কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে।’

আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য অসীম কুমার উকিল বলেন, ‘গুম-খুনের ঘটনাগুলো অস্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় চলে এসেছে। কোনো ক্ষেত্রেই এসব ঘটনা কাঙ্ক্ষিত হতে পারে না।’

তিনি বলেন, ‘রাজনীতির স্বাভাবিক গতিধারা ব্যাহত হলে অস্বাভাবিক প্রক্রিয়া চালু হয়। যার ধারাবাহিকতায় এগুলো হচ্ছে। গণতন্ত্রের ধারাগুলো যত বেশি শক্তিশালী হবে রাজনীতির স্বাভাবিক প্রক্রিয়া তত সহজ হবে। একই সঙ্গে অস্বাভাবিক প্রক্রিয়া তথা গুম, খুন কমে আসবে।’ 

বিএনপির সংসদ সদস্য হারুনুর রশীদ বলেন, ‘যারা গুমের শিকার হচ্ছে তারা আইনের আশ্রয় নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে না। দায়িত্বশীলদের জবাবদিহিতার ঘাটতি রাজনীতিতে ছন্দপতন ঘটাচ্ছে। রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে যারা তারা দায় নিচ্ছে না। রাষ্ট্রের যে দয়িত্ব সেখানে দায় এড়ানোর বক্তব্য অত্যন্ত দুঃখজনক। বর্তমানে গণতান্ত্রিক পরিমন্ডলে সঙ্কট দেখা যাচ্ছে সেগুলো দূর করতে হবে। এ জন্য রাষ্ট্রকেই দায়িত্ব নিতে হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘সত্যিকার অর্থে গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী হতো তাহলে এসব ঘটনা বন্ধ হয়ে যেত।’

বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতির নির্বাহী পরিচালক সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান গুম-খুনের পেছনে নাগরিক সমাজের যথাযথ ভূমিকা না রাখার কারণকে দায়ী করেন। তিনি বলেন, ‘নাগরিকরা আওয়ামী লীগ এবং বিএনপিতে বিভক্ত হয়ে গেছে। দমনমূলক আইন দিয়ে তাদের থামিয়ে দেওয়া হচ্ছে।’

এর প্রতিকার হিসেবে রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিবর্তন আনার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের দল বা ব্যক্তির ক্ষেত্রে না দাঁড়িয়ে সিস্টেম চেঞ্জের কথা বলতে হবে। আমরা সবসময় সেনা শাসনের বিরুদ্ধে কথা বলি। কিন্তু সত্যিকার অর্থে এই বাইরে আমরা যেতে পারিনি। অর্থ ও রাজনীতি ভিন্ন জিনিস। দুটোকে ভিন্ন করতে যে সিস্টেম দরকার সেটি করতে হবে।’

আইন সালিশ কেন্দ্রের (আসক) মহাসচিব নূর খান লিটন বলেন, ‘সংক্ষিপ্ত পথে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ, সস্তা জনপ্রিয়তা অর্জন, বিরোধী মত দমন- এই তিন উদ্দেশ্যে গুম-খুনসহ বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ঘটে থাকে। রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব হচ্ছে দায় না এড়িয়ে ঘটনাগুলো স্পষ্ট করা। এই ধরনের অপরাধ কারা করেছে সেটাও স্পষ্ট করা দরকার।’ 

তিনি আরও বলেন, ‘দেশে জবাবদিহিতার সংস্কৃতি নেই কারণ ক্ষমতায় আসতে কারও সমর্থন দরকার হয় না। এক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীকে ব্যবহার করা হয়। এসব ঘটনার জন্য পুরো বাহিনীকে দোষারোপ করা যায় না। কিন্তু অনেকের নাম চলে আসবে। যারা গুমের শিকার হয়ে ফিরে এসেছেন তাদের বর্ণনা আমরা শুনেছি। তারা যে বর্ণনা দিয়েছেন সেটা ভয়ঙ্কর উদ্বেগের। এভাবে রাষ্ট্র চলতে পারে না। একমুহূর্তও চলার সুযোগ নেই।’

সিজিএস সভাপতি ড. মনজুর আহমেদ চৌধুরী বলেন, ‘গুম-খুন সবই রাজনৈতিক না। টাকার জন্য অনেক ঘটনা ঘটছে। রাজনীতিবিদরা এগুলো স্বীকার করছেন না। ২০১৪ সালে ও ২০১৮ সালে নির্বাচনের আগে গুম-খুন বেশি হয়েছে। এর কারণ ছিল যেন লোকজন নির্বাচনে না দাঁড়ায়। রাষ্ট্রের দায়িত্ব এগুলো প্রতিহত করা।’ 

তিনি আরও বলেন, ‘নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে না। আমাদের নিজেদের এগিয়ে আসতে হবে। স্বচ্ছ ও শক্তিশালী মানবাধিকার কমিশন গঠন করে দোষীদের বিচারের আওতায় আনতে হবে।’


বিষয় : গুম-খুন সেন্টার ফর গভর্নেন্স স্টাডিজ শাহদীন মালিক

মন্তব্য করুন