যেসব দল নির্বাচন কমিশন গঠন প্রক্রিয়া বর্জন করেছে, তাদের সম্পৃক্ত করতে নাগরিক সমাজের পরামর্শে সার্চ কমিটি নামের তালিকা জমা দেওয়ার সময় এক দিন বাড়ালেও বিএনপিসহ ১৮টি দলের কেউ তা দেবে না।

প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এবং অপর চার কমিশনার পদে যোগ্য ব্যক্তিদের নিয়োগে নিবন্ধিত ৩৯টি রাজনৈতিক দলের কাছে শুক্রবার বিকেলের মধ্যে প্রস্তাবিত নামের তালিকা চেয়েছিল রাষ্ট্রপতির গঠিত সার্চ কমিটি। নাগরিক সমাজের সঙ্গে বৈঠকের পর গতকাল রোববার কমিটি জানায়, আজ সোমবার পর্যন্ত নাম প্রস্তাব করা যাবে।

এর প্রতিক্রিয়ায় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সমকালকে বলেছেন, সময় বাড়ালেও নাম দেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। বিএনপি নির্বাচন কমিশন গঠনের এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে একমত নয়। এ ধরনের কমিশন দিয়ে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন কোনোমতেই সম্ভব নয়। নাম না দেওয়া দলগুলোকে সমর্থন করে তিনি বলেন, বিএনপিসহ দেশপ্রেমিক গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলগুলো নির্দলীয় সরকারের অধীনে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলনে রয়েছে।

বাকি ১৭ দলের ১২টিই বিএনপির মতো নির্বাচনকালীন সরকারের দাবি জানিয়ে বলেছে, নিরপেক্ষ ভোট না হলে ইসি গঠনে নাম দিয়ে লাভ নেই। বিএনপি জোটের নিবন্ধিত তিন দল এলডিপি, কল্যাণ পার্টি এবং বাংলাদেশ মুসলিম লীগ নেতারা একই সুরে অভিযোগ করে বলেছেন, সরকারের আজ্ঞাবহদের নিয়ে ইসি গঠিত হতে যাচ্ছে। তাই সময় বাড়ালেও নামের তালিকা দেবে না।

বিএনপির আরেক জোট জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের দুই নিবন্ধিত দল গণফোরাম ও জেএসডির কাছ থেকে একই বক্তব্য এসেছে। বাম গণতান্ত্রিক জোটে তিন নিবন্ধিত কমিউনিস্ট পার্টি, বাসদ ও বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি জানিয়েছে, তারা নাম না দেওয়ার সিদ্ধাতেই অটল রয়েছে।

ব্যারিস্টার আন্দালিভ রহমানের নেতৃত্বাধীন বিজেপি এবং চরমোনাই পীরের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলনও নির্বাচনকালীন সরকারের দাবি পূরণ না হওয়ায় সার্চ কমিটিতে নাম দেয়নি। ইসলামী আন্দোলনের মহাসচিব অধ্যক্ষ ইউনুস আহমাদ বলেছেন, আগের মতো প্রহসনের ইসি হতে যাচ্ছে। তারা কি সুষ্ঠু নির্বাচন করতে পারবে? নাম দেব কেন?

বাংলাদেশ ন্যাপ ও মুসলিম লীগ আগেই চিঠি দিয়ে জানিয়েছিল, নির্বাচন প্রক্রিয়া ধ্বংস হয়েছে। আগের দুবার সার্চ কমিটির মাধ্যমে গঠিত ইসি সুষ্ঠু ভোট করেনি। সে কারণে এবার তারা নাম দেবে না। ন্যাপের মহাসচিব এম গোলাম মোস্তফা ভূঁইয়া এবং মুসলিম লীগের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব কাজী আবুল খায়ের ভূঁইয়া বলেছেন, যা বলার চিঠিতেই বলেছেন। সময় বাড়লেও নাম দেওয়ার প্রশ্নই আসে না।

চিঠি না পাওয়া, পর্যাপ্ত সময় না দেওয়া এবং প্রক্রিয়া জটিল হওয়ার কারণ দেখিয়ে পাঁচটি দল গত শুক্রবারের মধ্যে নাম দেয়নি। দলগুলো হলো- খেলাফত আন্দোলন, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস ও ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশ। বিএনপি জোটের সাবেক শরিক জমিয়ত ও খেলাফত মজলিসসহ বাকি দলগুলো সরকারের প্রতি সহানুভূতিশীল হিসেবে পরিচিত হলেও সময় বৃদ্ধির পরও তারা নাম দিচ্ছে না।

জমিয়তের সহসভাপতি মাওলানা আবদুর রব ইউসুফী, বাংলাদেশ খেলাফতের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মাওলানা জালালউদ্দিন আহমেদ, খেলাফত মজলিসের মহাসচিব ড. আহমদ আবদুল কাদের, ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশের চেয়ারম্যান সৈয়দ বাহাদুর শাহ মুজাদ্দেদী বলেছেন, সময় বাড়ানোর বিষয়টি তাদের চিঠিতে বা অন্য কোনো উপায়ে আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়নি সার্চ কমিটি। তাই তারা নামের তালিকা দেবে না। আর মাত্র এক দিনের মধ্যে ১০ জন বিশিষ্ট ব্যক্তির পূর্ণাঙ্গ জীবন বৃত্তান্তসহ তালিকা দেওয়া অসম্ভব।

কল্যাণ পার্টির সভাপতি মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম সমকালকে বলেছেন, নাম দেওয়ার অনুরোধ পাননি। পেলেও দেবেন না।

জেএসডির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শহীদ উদ্দিন মাহমুদ স্বপন সমকালকে বলেছেন, তারাসহ ঐক্যফ্রন্টের কেউ এই সার্চ কমিটির কাছে নাম দেবে না; সময় যতই বাড়ানো হোক।

গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী বলেছেন, নির্বাচন কমিশন নয়; নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থার জন্য আন্দোলন করছি।

বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেছেন, গণতান্ত্রিক জোট লোক দেখানো সার্চ কমিটিতে নাম দেবে না।

৩৯টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে আওয়ামী লীগসহ ১৯টি দল সার্চ কমিটিতে নামের তালিকা দিয়েছে। গতকাল জানা যায়, এনডিএম নামে একটি দল নাম দিয়েছে। যদিও মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ জানিয়েছিল, ২৪টি দল নাম দিয়েছে। কিন্তু সমকাল সবার সঙ্গে কথা বলে নিশ্চিত হয়েছে, ২০ দলটি নাম দিয়েছে; ১৮টি দেয়নি। সাংস্কৃতিক মুক্তিজোট নামের দলটির খোঁজ পাওয়া যায়নি। নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে দেওয়া নম্বরে তাদের সাড়া পাওয়া যায়নি।

সার্চ কমিটি সিইসি ও কমিশনার পদে নিয়োগের জন্য প্রতিটি দলের কাছে ১০ জনের নামের তালিকা চেয়েছিল। নেতাকর্মী ও কার্যালয় রয়েছে, এমন কয়েকটি দল ১০ জনের জীবনবৃত্তান্ত জোগাড় করতে না পরলেও সাইনবোর্ডসর্বস্ব কয়েকটি ছোট দল তা পেরেছে। তাদের তালিকায় ঘুরেফিরে নির্দিষ্ট কয়েকজনের নাম রয়েছে।

এই দলগুলোর সূত্রে জানা গেছে, বড় দলের সরবরাহ করা জীবনবৃত্তান্ত জমা দিয়েছে তারা। তাদের অধিকাংশের তালিকায় বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী, সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোশাররাফ হোসেন ভূঁইয়া, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব মোস্তফা কামাল উদ্দীনের নাম রয়েছে। গতবার সিইসি পদে কে এম নূরুল হুদার নাম এসেছিল তরীকত ফেডারেশনের তালিকায়। আওয়ামী লীগ ১০ জনের নাম দিলেও তা প্রকাশ করেনি।

ইসিতে নিয়োগের জন্য যোগ্য বক্তিদের খুঁজতে গত ৫ ফেব্রুয়ারি বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বে সার্চ কমিটি গঠিত হয়। গত শনিবার নাগরিক সমাজ কমিটির সঙ্গে বৈঠকে এ প্রক্রিয়াকে অংশগ্রহণমূলক করতে বড় দল বিএনপিসহ বাকিদের সঙ্গে আলোচনার পরামর্শ আসে। কিন্তু দলগুলো বর্জনের নীতিতে অটল থাকায় নির্বাচন কমিশন বিরোধীদের মতামত ছাড়াই হতে যাচ্ছে।

নাগরিক পরামর্শে সার্চ কমিটি বিএনপির মতামত পেতে পদক্ষেপ নিলেও দলটির মহাসচিব সমকালকে বলেছেন, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলে সুষ্ঠু নির্বাচন হওয়ার কোনো সুযোগ থাকবে না। তারা নির্বাচন কমিশন গঠনের নামে জনগণকে বোকা বানিয়ে প্রতারণা করছে। ২০১৮ সালের মতো দলীয় লোকদের কমিশনে বসানোর নতুন কৌশল নিয়েছে।