যশোরের অভয়নগর উপজেলায় এক তরুণকে নির্যাতনের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে। মঙ্গলবার সারাদিন নওয়াপাড়ায় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল নির্যাতনের ভিডিওটি। ঘটনাটি ২০২০ সালের ১ মার্চ সন্ধ্যার। তবে সেটি প্রকাশ্যে আসে মঙ্গলবার। 

নির্যাতনের শিকার ওই তরুণ ওবায়দুল ইসলাম (২২) অভয়নগর উপজেলার কোটা গ্রামের আব্বাস মোল্যার ছেলে। তিনি স্থানীয় সার, গম, কয়লা আমদানিকারী প্রতিষ্ঠান নওয়াপাড়া গ্রুপের স্কেলম্যান হিসেবে কর্মরত। গম চুরির অপবাদ দিয়ে তাকে নির্যাতন করা হয় বলে অভিযোগ ওই তরুণের। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, তাদের কেউ ওই নির্যাতনের ঘটনার সঙ্গে জড়িত নয়। অন্যদিকে পুলিশ বলছে, তারা বিষয়টি খতিয়ে দেখছে।

ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া ২৪ সেকেন্ডের ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, একটি ঘরের ভেতরে টেবিল-চেয়ারের পাশে মেঝেতে ফেলে এক তরুণকে চ্যাংদোলা করে ধরে রাখা হয়েছে। ওই তরুণের দুই পাশে দুই তরুণ তার একহাত ও এক পা উঁচু করে ধরে রেখেছে, আর পেছনে দাঁড়িয়ে দু'জন। তাদের একজনের পরনে হাফহাতা লাল শার্ট, আরেকজনের পরনে ফুলহাতা সাদা গেঞ্জি। মাথায় খয়েরি রঙের ক্যাপ। লাল শার্ট পরিহিত ব্যক্তি বলছেন, 'ধরো ধরো ধরো, ভালো করে ধরো। হাতে লাগবে না।' এরপর সাদা গেঞ্জি পরিহিত ব্যক্তি দুই হাতে মোটা লাঠি দিয়ে ওই তরুণের পশ্চাদদেশে বেদম প্রহার করছেন।

লাল শার্ট পরিহিত ব্যক্তি হলেন শোয়েব খান। তিনি নওয়াপাড়া গ্রুপের কর্মকর্তা। তিনি নওয়াপাড়া গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাইদুর রহমান লিটুর আত্মীয়। আর সাদা শার্ট পরিহিত ব্যক্তি হলেন সোহাগ।

নির্যাতনের শিকার তরুণ জানান, নওয়াপাড়া গ্রুপের একজন অংশীদারের দূরসম্পর্কের শ্যালক শোয়েব খান কারণে-অকারণে তাদের ওপর নির্যাতন চালান। শারীরিক, মানসিক নির্যাতনের সঙ্গে অর্থনৈতিকভাবেও শোষণ করা হয়। যেসব কর্মচারী প্রতিবাদ করেন, তাদের চাকরিচ্যুতির পাশাপাশি পাওনা না মিটিয়ে বের করে দেওয়া হয়।

ওবায়দুল ইসলাম জানান, ঘটনাটি ২০২০ সালের ১ মার্চ সন্ধ্যার। তিনি ফরিদপুরে দায়িত্ব পালন করছিলেন। কথিত একটি চুরির ঘটনাকে পুঁজি করে আমাদের নওয়াপাড়ায় অফিসে ডেকে আনা হয়। সেখানে রাকিবুল ইসলাম রকি (২৬) ও বায়েজিদ শেখ (২২) নামে আরও দুই কর্মচারী ছিলেন। সন্ধ্যার পর অফিসের ভেতরে স্টাফদের খাওয়ার কক্ষে নিয়ে রকি ও বায়েজিদকে দিয়ে আমার দুই হাত ও দুই পা ধরতে নির্দেশ দেন শোয়েব খান। সোহাগ নামে আরেকজন পেছনে মোটা লাঠি দিয়ে বেদম প্রহার করেন। পরে রকি ও বায়েজিদকেও একইভাবে পেটানো হয়। আমাকেও তাদের হাত-পা ধরতে বাধ্য করা হয়। নির্যাতনের পর আমাদের ওই কক্ষের মধ্যে ফেলে রাখা হয়। পরদিন ২ মার্চ সকালে পুলিশ ডেকে এনে আমাদের পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়। এরপর পুলিশ ফরিদপুরের কোতোয়ালি থানায় আমাদের নিয়ে যায়। সেখানে আমাদের বিরুদ্ধে গম চুরির অভিযোগে মামলা দেওয়া হয়। আড়াই মাস হাজতবাস করার পর জামিনে মুক্তি পেয়ে বাড়ি আসি।

মারধরের শিকার রাকিবুল ইসলাম রকি বলেন, শোয়েব খান একই অফিসের কর্মী ও তার অনুগত সোহাগ, ইমরান, অনুপ ও ইমদাদের সহায়তায় আমাদের অমানবিকভাবে পেটান। কথিত একটি চুরির অপবাদ দিয়ে আমাদের মারধর করা হয়। ফরিদপুরে গম চুরির কথিত একটি মামলায় আমাদের দায়ী করে বিনা কারণে এভাবে অমানবিকভাবে পেটানো হয়। ঘটনার পরপরই আমাদের চাকরিচ্যুতিও ঘটে। নওয়াপাড়া বাজারের প্রধান সড়কে নওয়াপাড়া গ্রুপের অফিস। অনেক বড় জায়গা নিয়ে অফিসটি। এই অফিসের ডাইনিংয়ে রয়েছে কর্মচারীদের মারধরের জন্য টর্চার সেল। সেখানে শতাধিক লাঠি (বেলচার জন্য নির্মিত কাঠের বাঁট) রাখা ছিল, যেগুলো দিয়ে মারধর করা হয় কর্মীদের।

নির্যাতনের শিকার অভয়নগর উপজেলার আমডাঙ্গা গ্রামের আলাউদ্দিনের ছেলে নছিমন চালক আমিন উদ্দিন জানান, তিনি নওয়াপাড়া গ্রুপের মালপত্র নছিমনে টানেন। চলতি বছর ৯ ফেব্রুয়ারি নছিমনে করে ইট নিয়ে যান। তাকে ওখানকার লোকজন ১০ থেকে ১৫টি ইট দেয়। এ ঘটনায় চুরির অভিযোগ এনে তাকে বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে নওয়াপাড়া গ্রুপের টর্চার সেলে আটক রাখে। রাতের বেলায় নওয়াপাড়া গ্রুপের কর্মকর্তা শোয়েব খান কোদালের হাতল দিয়ে মারেন।

এদিকে, নির্যাতনের ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার পর অভিযুক্ত শোয়েব খানকে প্রকাশ্যে দেখা যায়নি। তার ব্যবহূত মোবাইল ফোন দুটিও রয়েছে বন্ধ।

তবে নওয়াপাড়া গ্রুপের কর্মকর্তা মিজানুর রহমান জনি বলেন, নির্যাতনের শিকার যুবক তাদের প্রতিষ্ঠানে কর্মরত থাকাকালে গম চুরির ঘটনায় জড়িয়ে পড়লে জনরোষের শিকার হন। কিন্তু ভিডিওতে মারধর যারা করেছে, তাদের কেউ নওয়াপাড়া গ্রুপের নয়।

যশোর জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) অফিসার ইনচার্জ ওসি রূপন কুমার সরকার বলেন, ভাইরাল হওয়া ভিডিওটি তাদের নজরে আসার পর ডিবির দক্ষ একটি টিমকে বিষয়টি অনুসন্ধানের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তদন্তের পর এ ব্যাপারে যথাযথ আইনানুগ পদক্ষেপ নেওয়া হবে।