শেষ পর্যন্ত রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হলো। বৃহস্পতিবার পার্শ্ববর্তী দেশ ইউক্রেনে আক্রমণ শুরু করে মস্কো, যা কভিডে পর্যুদস্ত বিশ্বে নতুন সংকট হিসেবে মনে করা হচ্ছে। পর্যবেক্ষকরা বলছেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের কোনো দেশে এটাই সবচেয়ে বড় হামলা। বাংলাদেশও এর নেতিবাচক প্রভাব থেকে মুক্ত থাকতে পারবে না। এই যুদ্ধের কারণে খাদ্য ও পেট্রোলিয়াম পণ্যের বাজার অস্থিতিশীল হয়ে উঠছে। জ্বালানি তেলের ব্যারেল বৃহস্পতিবারই ১০০ ডলার ছাড়িয়েছে। ঊর্ধ্বমুখী খাদ্যপণ্যের দামও। বিভিন্ন দেশে শেয়ারবাজারে ভয়াবহ দর পতন হয়। বৃহস্পতিবার ধস নামে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারেও।

বিশ্নেষকরা বলছেন, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে বিশ্ব নতুন করে মন্দার মুখোমুখি হতে পারে। এই মন্দার আশঙ্কা থেকে বাংলাদেশও মুক্ত নয়। কারণ, রাশিয়া ও ইউক্রেনের সঙ্গে বাংলাদেশের সরাসরি বাণিজ্য রয়েছে। দেশ দুটিতে তৈরি পোশাক, পাটসহ বিভিন্ন পণ্য রপ্তানি করে বাংলাদেশ। আবার গমসহ আরও বিভিন্ন পণ্য আমদানি হয়ে থাকে।

করোনা পরিস্থিতির মধ্যে গত ২০২০-২১ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে রাশিয়ায় ৬৬ কোটি ৫৩ লাখ মার্কিন ডলার মূল্যের বিভিন্ন পণ্য রপ্তানি হয়েছে। একই সময়ে আমদানি হয়েছে ৪৬ কোটি ৬৭ কোটি ডলার মূল্যের পণ্য। ২০১৯-২০ অর্থবছরে রাশিয়ায় বাংলাদেশের রপ্তানি ছিল ৪৮ কোটি ৭০ লাখ ডলারের পণ্য। একই সময়ে রাশিয়া থেকে আমদানির পরিমাণ ছিল ৭৮ কোটি ২০ লাখ ডলারের পণ্য। একইভাবে ইউক্রেনে বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি রয়েছে।

বিজিএমইএর সহসভাপতি শহীদুল্লাহ আজিম সমকালকে বলেন, তৈরি পোশাকের নতুন বড় বাজার রাশিয়া। ইউক্রেনেও কিছু পোশাক রপ্তানি হয়ে থাকে। সরাসরি এই দেশগুলো বাংলাদেশ থেকে পোশাক নেয়। আবার ইউরোপের বিভিন্ন দেশের মাধ্যমেও দেশ দুটিতে বাংলাদেশের পোশাক যায়। বর্তমান পরিস্থিতিতে ওই সব দেশে পণ্য পাঠানোর জন্য জাহাজ পাওয়া নিয়ে চ্যালেঞ্জ তৈরি হবে। ঝুঁকির কারণে কোনো জাহাজ এই অঞ্চলে ভিড়তে চাইবে না। ক্রেতারাও রপ্তানি আদেশের বিষয়ে সতর্ক থাকবেন। ফলে এই দুটি দেশে পোশাক রপ্তানি বিঘ্নিত হতে পারে।

সিটি গ্রুপ দেশের গম আমদানিকারকদের অন্যতম প্রতিষ্ঠান। এই গ্রুপের পরিচালক বিশ্বজিৎ সাহা সমকালকে বলেন, বাংলাদেশে গম আমদানি করা হয় রাশিয়া, ইউক্রেন, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, আমেরিকা ও ভারত থেকে। এরমধ্যে মোট আমদানির এক-তৃতীয়াংশ আসে রাশিয়া ও ইউক্রেন থেকে। প্রতি বছর বাংলাদেশ প্রায় ৫০ লাখ টন গম আমদানি করে থাকে। এখন এই দুই দেশ থেকে লোড করার জন্য জাহাজ পাওয়া যাচ্ছে না। এছাড়া এই দুই দেশের কারণে অন্যান্য দেশও সতর্ক। উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, জ্বালানি তেল সংকটের আশঙ্কা থেকে ইন্দোনেশিয়া পামঅয়েল রপ্তানি বন্ধ রেখেছে। কারণ, পামঅয়েল থেকে ইথানল তৈরি করে জ্বালানি চাহিদা মেটানো যায়। এক কথায় রাশিয়া ও ইউক্রেনের পরিস্থিতি বৈশ্বিক বাণিজ্যকে বড়ভাবে প্রভাবিত করছে।

ইফাদ মাল্টি প্রডাক্টসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তাসকিন আহমেদ সমকালকে বলেন, এ বিষয়ে এখনই কিছু বলা সম্ভব হচ্ছে না। কারণ খাদ্যদ্রব্যের ওপর কোনো নিষেধাজ্ঞা হবে কিনা তা বলা মুশকিল। তবে রাশিয়া ও ইউক্রেনে যে ধরনের গম পাওয়া যায়, সে ধরনের গম অন্যান্য দেশে পাওয়া যায় না। ফলে এ দুটো দেশের পণ্য সরবরাহ ব্যাহত হলে অন্যান্য দেশে সমস্যা হবে। তিনি বলেন, ইতোমধ্যে জাহাজ ভাড়া বেড়েছে। জ্বালানি তেল ও খাদ্যদ্রব্যের দামও বেড়েছে।

রাশিয়া ও ইউক্রেনের পরিস্থিতির প্রভাব নিয়ে ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে যেসব খবর প্রচারিত হয়েছে সেগুলো পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, এই দুটি দেশ খাদ্যশস্য ও পেট্রোলিয়াম পণ্য উৎপাদন এবং রপ্তানিতে বিশ্বে শীর্ষস্থানীয় দেশ। দেশ দুটির মধ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়াতে আমদানিকারকরা বিকল্প দেশ থেকে পণ্য নিতে চেষ্টা করছেন। গম, ভুট্টা ও সূর্যমুখী তেলের সরবরাহে এক ধরনের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। সারা বিশ্ব যত গম রপ্তানি করে তার প্রায় ৩০ শতাংশ করে রাশিয়া ও ইউক্রেন। এছাড়া ভুট্টার প্রায় ২০ শতাংশ রপ্তানি হয় এই দুই দেশ থেকে। গম, ভুট্টা দিয়ে শিশুখাদ্য থেকে শুরু করে প্রাণিজ খাদ্য উৎপাদন হয়। সূর্যমুখী তেল রপ্তানির ৮০ শতাংশই করে এ দুই দেশ। ফলে ব্যবসায়ীরা আশঙ্কা করছেন, রাশিয়া ও ইউক্রেনের উত্তেজনা দীর্ঘস্থায়ী হলে চলতি মৌসুমে গম ও ভুট্টার সরবরাহে ঘাটতি দেখা দেবে। ফলে এসব পণ্য থেকে উৎপাদিত দ্রব্যের দাম বাড়বে। ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে গমের দাম বাড়তে শুরু করেছে। ভুট্টার দামও বেশ চড়া।

বাংলাদেশের অর্থনীতিবিদ ও পিআরআইয়ের নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর সমকালকে বলেন, বিশ্বের যেকোনো দেশে যুদ্ধ হলে তার প্রভাব আশপাশের দেশে অবশ্যই পড়ে। বিশ্বব্যাপীও ঘটনার প্রভাব পড়বে। প্রত্যক্ষ প্রভাবের চেয়ে পরোক্ষ প্রভাব বেশি হবে। এ ধরনের ঘটনায় মিত্র দেশগুলো প্রতিপক্ষ দেশের পণ্যের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিতে পারে। তাতে পুরো বিশ্ব মন্দায় পড়ার আশঙ্কা থাকে।

সামগ্রিকভাবে খাদ্যশস্য, গ্যাস, জ্বালানি তেল, রাসায়নিক সারসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের সরবরাহ ব্যাপকভাবে ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে জ্বালানি তেল, গ্যাস ও রাসায়নিক সারের দাম গত কয়েক বছরের মধ্যে রেকর্ড পরিমাণ বেড়েছে। এসব পণ্যের দাম বেড়ে গেলে দেশে কৃষি ও শিল্পপণ্যের উৎপাদন খরচ বাড়বে। বাড়বে পরিবহন খরচও। অনেক দেশের জাহাজ কৃষ্ণ সাগরে যেতে চাচ্ছে না, যা সরাসরি দাম বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) জানায়, এরই মধ্যে খাদ্যপণ্যের বৈশ্বিক মূল্য এক দশকের সর্বোচ্চ অবস্থানে আছে। এরই মধ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি খাদ্যপণ্যের বাজারকে স্মরণকালের ভয়াবহ অবস্থার মধ্যে ফেলতে পারে।

অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম আরেক দফা বেড়েছে :গতকাল বৃহস্পতিবার প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত (ব্রেন্ট ক্রুড) জ্বালানি তেলের (৪২ মার্কিন গ্যালন বা ১৫৯ ব্রিটিশ লিটার) দাম ১০৫ দশমিক ৫৯ ডলারে ঠেকেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেপাস ইন্টারিমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) ক্রুড অয়েল গতকাল প্রতি ব্যারেল ১০০ দশমিক ৩৫ ডলার দরে বিক্রি হয়েছে। বিশ্নেষকরা বলছেন, রুশ-ইউক্রেন পরিস্থিতিতে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেল সরবরাহে বিঘ্নিত হবে। যুক্তরাষ্ট্রের বহুজাতিক বিনিয়োগ ব্যাংক জেপি মরগ্যানের পূর্বাভাস হচ্ছে, চলতি বছরের দ্বিতীয়ার্ধে প্রতি ব্যারেল জ্বালানি তেলের দাম ১২৫ ডলারে এবং আগামী ২০২৩ সালে ১৫০ ডলারে উঠতে পারে। এর আগে ২০০৮ সালে জ্বালানি তেলের ব্যারেলপ্রতি দাম ১৪৭ ডলারে উঠেছিল, যা এযাবৎ কালের সর্বোচ্চ।

বাজার বিশ্নেষকরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ তাদের পশ্চিমা মিত্রদের নিষেধাজ্ঞার প্রতিক্রিয়ায় রাশিয়াও পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে বিশ্ববাজারে তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস রপ্তানি কমিয়ে দিতে পারে। আন্তর্জাতিক বাজারের দ্বিতীয় বৃহত্তম বা ১০ শতাংশ জ্বালানি তেল সরবরাহ করে রাশিয়া। সবচেয়ে বেশি পরিমাণ তেল রপ্তানি করে সৌদি আরব।

শুধু তেলই নয় বিশ্বের শীর্ষ প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহকারী দেশও রাশিয়া। যেকোনো সময় ইউরোপে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করে দিতে পারে দেশটি- এমন আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের। এর বড় প্রভাব পড়বে বিশ্ব অর্থনীতিতে। ইউরোপ প্রায় ৩৫ শতাংশ প্রাকৃতিক গ্যাসের জন্য রাশিয়ার ওপর নির্ভরশীল। ২০২০ সালে রাশিয়া থেকে ইউরোপে গ্যাস রপ্তানির পরিমাণ কমে গিয়েছিল। তখন স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি আমদানি বেড়ে যায়। ফলে অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায় গ্যাসের দাম। রাশিয়া-ইউক্রেনের যুদ্ধ পরিস্থিতি গ্যাসের দামকে আরও ঊর্ধ্বমুখী করতে পারে। সম্প্র্রতি যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, দেশটি রাশিয়ার পরিবর্তে বিশ্বের অন্যান্য দেশ থেকে এলএনজি আমদানির কথা ভাবছে। এক্ষেত্রে মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার দেশগুলোকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। এতে স্পট মার্কেটে পণ্যটির দাম আরও বাড়বে। ফলে বিপাকে পড়বে বাংলাদেশের মতো এলএনজি আমদানিকারক দেশ।

জানতে চাইলে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের শিক্ষক অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, বিশ্বের কোথাও যুদ্ধ পরিস্থিতি দেখা দিলেই জ্বালানি পণ্যের বাজার অস্থিতিশীল হয়। কারণ, সরবরাহ, উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হয়। আশা করা যায় ইউক্রেন সংকট সাময়িক। ফলে জ্বালানির বাজার বেশিদিন ঊর্ধ্বমুখী থাকবে না। যদি সংকট দীর্ঘস্থায়ী হয় তাহলে পরিস্থিতি খারাপের দিকে যাবে। পেট্রোলিয়াম পণ্য তেল-গ্যাসের দাম বাড়বে। বাংলাদেশের মতো জ্বালানি আমদানিকারক দেশের জন্য এটা খারাপ খবর। সরকার ভর্তুকি সামাল দিতে তেল-গ্যাসের দাম বৃদ্ধি করতে চাইবে। এমনটি করলে জনগণের ক্রয় ক্ষমতা কমে যাবে। অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।