বাস্তবায়নযোগ্য নয় জেনেও প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষার নামে শত শত কোটি টাকা অপচয় চলছে। নিজস্ব অর্থায়নে অসম্ভব, পাশাপাশি বিদেশি ঋণ কিংবা বিনিয়োগেরও নিশ্চয়তা নেই, তবু লাখ লাখ কোটি টাকার প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করা হয়েছে। পরে টাকার অভাবে সেইসব প্রকল্পের পরিকল্পনা বাতিল করা হয়েছে। কিংবা স্থগিত হওয়ায় সমীক্ষার পুরো টাকাই জলে গেছে।

নিয়ম অনুযায়ী, ৫০ কোটি টাকার বেশি ব্যয়ের প্রকল্প হলে সমীক্ষা চালানো বাধ্যতামূলক। অভিযোগ রয়েছে, সরকারের এ নিয়মের সুযোগ নিচ্ছে সরকারেরই সংস্থাগুলো। যদিও সংশ্নিষ্টদের ভাষ্য, সমীক্ষা না করলে কীভাবে জানা যেত যে প্রকল্প বাস্তবায়নযোগ্য নয়? যদিও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাধারণ জ্ঞানেই বোঝা যায়, কোন প্রকল্প বাস্তবায়নযোগ্য আর কোনটি নয়। অবাস্তব ও অপ্রয়োজনীয় জেনেও সমীক্ষা করা দুর্নীতি।

পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান সমকালকে বলেন, 'কিছু প্রকল্প এমনভাবে আসে, এমন গতিতে আসে, এমন শক্তি নিয়ে আসে- তার সামনে দাঁড়ানোর শক্তি খুব কম লোকেরই থাকে। অনুমোদন দিতেই হয়। এটা বাস্তব কথা।' এর মানে চাপ কিনা? এমন প্রশ্নে মন্ত্রী বলেন, 'মানে কিছু প্রকল্পের জন্য জনদাবি থাকে, এমন জনমত ও রোমান্টিজম (ভাববিলাস) তৈরি হয়, তখন আর না করা যায় না।'

সমীক্ষার নামে অপচয় :রেলওয়েতে বগি ইঞ্জিনের সংকট। বলা হয়, নতুন কেনার টাকা নেই। কিন্তু রেলপথ মন্ত্রণালয় ৯৬ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম পথে দ্রুতগতির বা 'বুলেট ট্রেন' লাইন নির্মাণ করতে চেয়েছিল। এর সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় ১১০ কোটি ১৬ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। পরে অর্থায়ন না পেয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের তালিকা থেকে বাদ যায়।

শুধু রেলে নয়, সড়কেও ভাববিলাসী সমীক্ষা করে প্রকল্প বাতিল হয়েছে। ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত উড়াল পথ নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয় ২০১১ সালে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) কাছ থেকে ঋণ নিয়ে ৯৭ কোটি ৮৭ লাখ টাকায় সমীক্ষা করা হয়। এতে বলা হয়, পুরোটা উড়াল হলে ৬৭ হাজার কোটি টাকা লাগবে। বিদেশি অর্থায়ন না পাওয়া প্রকল্পটি বাতিল হলেও ঋণের টাকা শোধ করতে হবে।

ঢাকার যানজট নিরসনে ২০১৫ সালে মন্ত্রিসভা সংশোধিত কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনা (আরএসটিপি) নামে মহাপরিকল্পনা অনুমোদন করেছে, তাতে বৃত্তাকার সড়ক নির্মাণের সুপারিশ রয়েছে। কিন্তু সেখানে বৃত্তাকার রেলপথ বলে কিছু নেই।

তার পরও ঢাকা ঘিরে বৃত্তাকার রেলপথ নির্মাণের 'কল্পনা' তৈরি করে রেলপথ মন্ত্রণালয়। ৭১ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে প্রায় ৮১ কিলোমিটার উড়াল রেলপথ নির্মাণের পরিকল্পনা করতে ২৪ কোটি ৫৬ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার কয়েকটি প্রতিষ্ঠান যৌথ উদ্যোগে বিনিয়োগের প্রাথমিক আগ্রহ দেখিয়ে গত নভেম্বরে বৈঠক করলেও এরপর আর অগ্রগতি নেই। প্রকল্পটি দেখভালের দায়িত্বে থাকা রেলের পরিচালক আবিদুর রহমান জানান, দক্ষিণ কোরিয়ার বিনিয়োগকারীরা বলেছে, তারা অর্থায়ন করলে আবার নতুন সমীক্ষা করবে।

ঢাকার পাতালে ২৬০ কিলোমিটার রেলপথ (সাবওয়ে) নির্মাণে প্রায় ৩২২ কোটি টাকায় সমীক্ষা করেছে সেতু কর্তৃপক্ষ (বিবিএ)। ২০১৮ সালে স্পেনের প্রতিষ্ঠান টেকনিকা ওয়াই প্রয়েক্টস এসএর (টিপসা) নেতৃত্বে জাপানের পাডেকো, বিসিএল অ্যাসোসিয়েটস, কেএসসি এবং বেটস যৌথভাবে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ পায়। সম্ভাব্যতা যাচাই ও প্রাথমিক নকশা প্রণয়নে প্রথমে ২১৯ কোটি টাকার চুক্তি হয়। পরে ব্যয় বেড়ে হয় ৩২২ কোটি টাকা।

সমীক্ষা অনুযায়ী, আট লাখ ৭১ হাজার কোটি টাকা লাগবে সাবওয়ে নির্মাণে! শিগগির সমীক্ষাটি চূড়ান্ত হবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত বিদেশি ঋণ বা বিনিয়োগ প্রস্তাব পায়নি বিবিএ। সংশ্নিষ্টরা বলছেন, এই ৩২২ কোটি টাকাও অপচয়ের খাতাতেই যাচ্ছে। সাবওয়ে নির্মাণের সুপারিশও আরএসটিপিতে ছিল না। আরটিপি অনুযায়ী প্রায় দুই লাখ কোটি টাকা ব্যয়ে ৬১ কিলোমিটার পাতালসহ ১৩০ কিলোমিটার মেট্রোরেলপথ নির্মাণের কাজ চলছে। তার পরেও পাতাল রেল করতে চায় বিবিএ।

বাংলাদেশের এক বছরের বাজেটের চেয়েও বেশি টাকা ব্যয়ের সাবওয়ে নির্মাণে এখন পর্যন্ত বিদেশি ঋণদাতাদের সাড়া পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন সমীক্ষা প্রকল্পের পরিচালক কাজী মো. ফেরদৌস। বিদেশি ঋণ ছাড়া এত বিশাল প্রকল্প বাস্তব সম্ভব কিনা- এ প্রশ্নে তিনি বলেন, অর্থায়নের সন্ধান চলছে।
তবে সমীক্ষার টাকা অপচয় নয় বলে দাবি করেন পরিকল্পনামন্ত্রী। তিনি বলেন, সব সমীক্ষা সফল নাও হতে পারে। সমীক্ষার পর দেখা গেল, প্রকল্প বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না- তখন আর কী করা যাবে? এ ঝুঁকি তো সব সময়ই থাকে। বড় প্রকল্পের জন্য সমীক্ষায় বড় টাকা খরচ হবে।

যেভাবে সমীক্ষা :ঢাকা-চট্টগ্রাম চার লেন মহাসড়কের পাশে উড়াল সড়ক নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয় ২০১১ সালে। অস্ট্রেলিয়ার প্রতিষ্ঠান স্ম্যাক ইন্টারন্যাশনালকে দিয়ে প্রায় ৯৮ কোটি টাকায় সমীক্ষা করায় সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তর। সেতু কর্তৃপক্ষও সমীক্ষা করতে চেয়েছিল। সমীক্ষা অনুযায়ী, শুধু বাজার এলাকায় উড়াল সড়ক হলে সাড়ে ২৬ হাজার কোটি টাকা লাগবে। আর পুরো ২২৫ কিলোমিটার পথ সড়ক হলে লাগবে ৬৭ হাজার ২৫২ কোটি টাকা।

পাঁচ বছরেও বিনিয়োগকারী না পেয়ে অর্থনৈতিক বিষয়ক মন্ত্রিসভা কমিটি প্রকল্পটি বাতিল করে। সওজের সদ্য সাবেক প্রধান প্রকৌশলী আবদুস সবুর সমকালকে বলেন, সমীক্ষার টাকা মোটেও অপচয় নয়; বরং সমীক্ষা না করে প্রকল্প শুরু করলে আরও বড় ক্ষতি হতে পারত।
ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত ২২৭ কিলোমিটার দ্রুতগতির রেললাইন নির্মাণে সমীক্ষা শুরু হয় ২০১৭ সালে। ১০০ কোটি টাকা ৫৯ লাখ টাকায় ২০১৯ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এক বছর পর ১১০ কোটি ১৬ লাখ টাকায় সমীক্ষা করে চীনের রেলওয়ে ডিজাইন করপোরেশন এবং বাংলাদেশের মজুমদার এন্টারপ্রাইজ। সরকারি টাকায় করা সমীক্ষায় বলা হয়, ৯৬ হাজার কোটি টাকার দ্রুতগতির রেললাইনে ৩০০ কিলোমিটার গতিতে চলবে ট্রেন। ৫৫ মিনিটে ঢাকা থেকে যাওয়া যাবে চট্টগ্রাম।

যদিও রেলের ৩০ বছর মেয়াদি মহাপরিকল্পনায় বুলেট ট্রেন নেই। রেলমন্ত্রী নূরুল ইসলাম সুজন বলেছেন, হাইস্পিড রেললাইন নির্মাণের পরিকল্পনা বাতিল করা হয়নি। প্রকল্পটি ব্যয়বহুল। তাই আপাতত বাস্তবায়ন করা হবে না।

রেল সূত্র জানিয়েছে, আগের মন্ত্রীর আমলে সমীক্ষার প্রকল্পটি 'চাপিয়ে' দেওয়া হয়। গত মার্চে চীনের দুই প্রতিষ্ঠান বুলেট ট্রেনে বিনিয়োগের প্রাথমিক আগ্রহ দেখালেও গত এক বছর আর কোনো অগ্রগতি নেই।

গণপরিবহন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. শামছুল হক বলেন, বুলেট ট্রেন বিশাল আয়তনের দেশের জন্য। চীন, জার্মানির মতো বড় আয়তনের দেশগুলোতে বুলেট ট্রেন চলে। যুক্তরাজ্যেও বুলেট ট্রেন নেই। বাংলাদেশের মতো আয়তনে ছোট দেশে এর প্রয়োজন নেই। বুলেট ট্রেন দরকার নেই জেনেও সমীক্ষা করা হয়েছিল। এসব প্রকল্প পেছনের দরজা দিয়ে আসে।

২০১৮ সালে বৃত্তাকার রেলপথ নির্মাণের সমীক্ষা সরকারি অর্থায়নে হয়েছে। চায়না রেলওয়ে সিয়ুয়ান সার্ভে অ্যান্ড ডিজাইন গ্রুপ কোম্পানি লিমিটেড এবং বাংলাদেশের বেটস কনসাল্টিং সার্ভিসেস লিমিটেড ও ইঞ্জিনিয়ার্স অ্যান্ড অ্যাডভাইজারস লিমিটেড যৌথভাবে সমীক্ষা করে।

সমীক্ষা অনুযায়ী, ৭১ হাজার কোটি টাকা লাগবে বৃত্তাকার রেলপথ নির্মাণে। এতে বলা হয়, ২০৩৫ সালে দৈনিক ১০ লাখ ৬৫ হাজার এবং ২০৫৫ সালে ১৫ লাখ ৭৫ হাজার যাত্রী হবে বৃত্তাকার রেলে। বছরে ৩৯ কোটি যাত্রী হবে। রেলের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেছেন, সারাদেশে বছরে সাড়ে ৯ কোটি যাত্রী হয় রেলে। বর্তমান প্রবৃদ্ধি অনুযায়ী বাড়লেও ২০৩৫ সাল নাগাদ ৪০ কোটি যাত্রী হবে না। আর ৮০ কিলোমিটার বৃত্তাকার রেলপথে বছরে ৩৯ কোটি যাত্রীর পরিকল্পনা বেশি ভাববিলাসী। বুলেট ট্রেনের সমীক্ষায় বলা হয়েছে, প্রতিদিন গড়ে ৫০ হাজার যাত্রী চলবে এই পথে।

২৩ ফেব্রুয়ারি সড়ক পরিবহন সচিব নজরুল ইসলামের সভাপতিত্বে সভায় বলা হয়, সমীক্ষা করার সময় আরও বেশি পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। অনেক সময় দেখা যায়, বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো সমীক্ষায় ভবিষ্যৎ যানবাহন পরিবহনের হার বাস্তবতার চেয়ে অনেক বেশি দেখায়। প্রকল্প বাস্তবায়নের পর কম যানবাহন চলাচল করে। এতে সরকারের আর্থিক ক্ষতি হয়।

কমিশনে সমীক্ষা :উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সরকারি সংস্থার সূত্রগুলো সমকালকে বলেছে, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা 'কমিশন' নিয়ে বাস্তবায়নযোগ্য নয় জেনেও সমীক্ষা প্রকল্প নেন। তারা অবসরের পর সমীক্ষাকারী প্রতিষ্ঠানে চাকরি নেন।

রেলওয়ের একজন কর্মকর্তা, যিনি একটি সমীক্ষার কাজ কাছ থেকে দেখেছেন, তিনি সমকাল বলেন, সমীক্ষা প্রতিবেদনের নামে বস্তায় বস্তায় কাগজ ও নকশা দেওয়া হয়, সেটা কতটা সঠিক- তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ড্রোনের সাহায্যে প্রকল্প এলাকার ছবি ও নানা জায়গায় পাওয়া তথ্যে এসব অবাস্তব প্রকল্পের সমীক্ষা করা হয়। প্রকল্পের বিনিয়োগের বিপরীতে যে আর্থিক ও সামাজিক লাভের অনুপাত নির্ধারণ করা হয়, তাও কাগুজে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. মুস্তাফিজুর রহমান সমকালকে বলেন, প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে সমীক্ষায় যে ইকোনমিক রেট অব রিটার্ন (ইআরআর) এগুলো অধিকাংশ কাগুজে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, দুর্নীতির জন্যই বর্তমান বাস্তবতায় বাস্তবায়নযোগ্য নয় বা অপ্রয়োজনীয়- এমন প্রকল্পের সমীক্ষা করা হচ্ছে।

পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন ছোট আছে। ভবিষ্যতে বড় হবে। তখন বাস্তবায়ন হবে। তবে তিনি চান না, সমীক্ষার নামে টাকা নষ্ট হোক।