চারটি গুরুত্বপূর্ণ সেবা খাতে দুর্নীতির ৫৪টি উৎস চিহ্নিত করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এসব দুর্নীতি বন্ধে ৯৩টি সুপারিশও করেছে সংস্থাটি। কমিশনের বার্ষিক প্রতিবেদনে এসব উৎস ও সুপারিশ তুলে ধরা হয়েছে। রোববার বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের কাছে এ প্রতিবেদন হস্তান্তর করা হয়।

দুদক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মঈনউদ্দীন আবদুল্লার নেতৃত্বে কমিশনের সদস্যরা দুদকের ২০২০ ও ২০২১ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন পেশ করেন। প্রতিবেদন গ্রহণ করে দুর্নীতি করে কেউ যাতে পার না পায়, তা নিশ্চিত করতে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য দুদকের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি। দুদকের কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করতে তথ্য-প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর পরামর্শও দিয়েছেন তিনি।
সূত্র জানায়, প্রতিবেদনে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরে দুর্নীতির ১০টি উৎস, ওইসব দুর্নীতি প্রতিকারে পাঁচটি সুপারিশ এবং বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) দুর্নীতির ছয়টি উৎস, প্রতিকারে সাতটি সুপারিশ তুলে ধরা হয়। এতে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দুর্নীতির ১০টি উৎস ও প্রতিকারে ১০টি সুপারিশ তুলে ধরা হয়েছে। এ ছাড়া মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের দুর্নীতির ২৮টি উৎস ও তা বন্ধে ৭১টি সুপারিশ তুলে ধরা হয়েছে।
ঔষধ প্রশাসনের দুর্নীতির বিষয়ে বলা হয়, ওষুধ ব্যবসায়ীরা ফার্মেসিগুলো লাইসেন্স ও এবং ফার্মাসিস্ট ছাড়াই চালাতে চান। অনেক ব্যবসায়ী যথাসময়ে লাইসেন্স নবায়ন করেন না, মেয়াদোত্তীর্ণ বা নিম্নমানের ওষুধ বিক্রয় করে ব্যবসা করতে চান।

বিআরটিএর দুর্নীতির বিষয়ে বলা হয়, যানবাহন যথাযথ পরীক্ষা করে রেজিস্ট্রেশন করার বিধান থাকলেও অনেক সময় যানবাহন না দেখে অবৈধ অর্থের বিনিময়ে রেজিস্ট্রেশন করে দেওয়া হয়। ড্রাইভিং লাইসেন্সের আবেদনকারীদের পরীক্ষার তারিখ উদ্দেশ্যমূলকভাবে বিলম্বিত করা হয়।
সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের দুর্নীতির বিষয়ে বলা হয়, সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে বিপুলসংখ্যক নকলনবিশ নিয়োজিত আছে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, ২০১৪ সালের দলিলও বালাম বইতে কপি করা হয়নি। দলিল রেজিস্ট্রেশনের সময় সরকারি রাজস্ব হিসাবে জমাকৃত পে-অর্ডার, ব্যাংক ড্রাফট, চেক ইত্যাদি সংশ্নিষ্ট ব্যাংকের হিসাবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জমা হয় না। বিতর্কিত জমি রেজিস্ট্রেশন করে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারী অবৈধ সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করছেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়, দুর্নীতি দমনে সমন্বিত উদ্যোগের কোনো বিকল্প নেই। এই সমন্বিত উদ্যোগ দৃঢ়করণে সরকারের প্রতিটি দপ্তর বা সংস্থার দায়িত্ব রয়েছে। কারণ সরকারি সংস্থাগুলোই জনগণকে সর্বাধিক রাষ্ট্রীয় সেবা দিয়ে থাকে। দুদক সরকারি পরিষেবা প্রাপ্তিতে হয়রানি, অনিয়ম, দুর্নীতি, দীর্ঘসূত্রতার অবসান চায়। জানা গেছে, দুদক আইন-২০০৪ অনুযায়ী কমিশন প্রতিবছর রাষ্ট্রপতির কাছে বার্ষিক প্রতিবেদন জমা দেয়। করোনা মহামারির কারণে ২০২০ সালের প্রতিবেদন জমা দেওয়া সম্ভব হয়নি। তাই এবার দু'বছরের প্রতিবেদন একসঙ্গে জমা দেওয়া হয়েছে।
এদিকে বাসস জানায়, রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধান ও তদন্ত প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার নির্দেশ দেন। দুর্নীতি উন্নয়ন ও অগ্রগতির প্রধান অন্তরায় উল্লেখ করে রাষ্ট্র্রপতি দুর্নীতি দমনে প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। সাক্ষাৎকালে দুদক চেয়ারম্যান প্রতিবেদনের বিভিন্ন দিক এবং কমিশনের সার্বিক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে রাষ্ট্রপতিকে অবহিত করেন।
বঙ্গভবনে আরও উপস্থিত ছিলেন দুদক কমিশনার (অনুসন্ধান) ড. মোজাম্মেল হক খান, কমিশনার (তদন্ত) জহুরুল হক, দুদক সচিব মাহবুব হোসেন, রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের সচিব সম্পদ বড়ূয়া ও সামরিক সচিব মেজর জেনারেল এসএম সালাহ উদ্দিন ইসলাম।