দেশ ছেড়ে পালানো আলোচিত পি কে হালদারকে একাধিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাতে অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর এস কে সুর ও সাবেক নির্বাহী পরিচালক শাহ আলম। প্রভাব খাটিয়ে অর্থ লোপাটে সংশ্নিষ্টতায় এবার ফেঁসে যাচ্ছেন তারা।
ইন্টারন্যাশনাল লিজিং থেকে অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের নামে আড়াই হাজার কোটি টাকা লোপাটের অভিযোগে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক শীর্ষ এ দুই কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করবে দুদক। গতকাল বৃহস্পতিবার তাদের কাছে পাঠানো দুদক উপপরিচালক গুলশান আনোয়ার প্রধানের সই করা নোটিশে তাদেরকে আগামী মঙ্গলবার রাজধানীর সেগুনবাগিচায় কমিশনের প্রধান কার্যালয়ে সশরীরে হাজির হতে বলা হয়েছে। আলাদাভাবে নোটিশ দুটি পাঠানো হয়েছে দু'জনের ঢাকায় বাসার ঠিকানায়।

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলার আলোচিত আসামি পি কে হালদার সব ধরনের মুশকিল থেকে আছান পেতে তাদের দু'জনের কাছেই ছুটতেন। এর বিনিময়মূল্যও ছিল অনেক। এস কে সুর ও শাহ আলম যা চাইতেন, তাই-ই পেতেন। একাধিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে টাকা আত্মসাতের ঘটনার সময় ওই দুই কর্মকর্তা বাংলাদেশ ব্যাংকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন।

রিলায়েন্স ফাইন্যান্স লিমিটেড ও এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) পি কে হালদার দুদকের ২০ থেকে ২৫টি মামলার আসামি। তিনি ওই দুটি প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালনের সময় অদৃশ্য শক্তির ওপর ভর করে প্রতারণা ও জালিয়াতির মাধ্যমে অন্যান্য অর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকেও অবাধে টাকা লুটে নিয়েছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুদকের এক পদস্থ কর্মকর্তা বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ওই দুই কর্মকর্তাকে আর্থিক সুবিধা দিয়ে অবাধে অনিয়ম-দুর্নীতি চালিয়ে যেতেন পি কে হালদার।


গ্রেপ্তার হওয়া ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের সাবেক এমডি রাশেদুল হক সম্প্রতি আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বেচ্ছায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে পি কে হালদারের সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক ওই দুই কর্মকর্তার সখ্য ও দুর্নীতিতে যোগসাজশ বিষয়ে তথ্য দেন।
দুদক সূত্র জানায়, একাধিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে পি কে হালদারের অর্থ লোপাটের ঘটনার সময় শাহ আলম বাংলাদেশ ব্যাংকের ডিএফআইএম (ডিপার্টমেন্ট অব ফাইন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউশন অ্যান্ড মার্কেটিং) বিভাগের জিএমের দায়িত্বে ছিলেন। পরে তিনি নির্বাহী পরিচালক হিসেবে পদোন্নতি পান। ইন্টারন্যাশনাল লিজিং থেকে শাহ আলমকে মাসে দুই লাখ টাকা দেওয়া হতো। বাংলাদেশ ব্যাংকের ইন্সপেকশন বিভাগ থেকে ইন্টারন্যাশাল লিজিংয়ের কার্যক্রম বছরে দু'বার অডিট হতো। পি কে হালদার বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর এস কে সুরকে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে মূল্যবান উপহার দেবেন বলে ইন্টারন্যাশনাল লিজিং থেকে মোটা অংকের টাকা তুলে নিতেন। পরে ওই টাকা এস কে সুর ও শাহ আলমকে ভাগ করে দিতেন।

২০১৫ থেকে ১৮ সাল পর্যন্ত দুই সদস্যের বাংলাদেশ ব্যাংকের অডিট টিমকে প্রতিবারই ১০ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে। এর বিনিময়ে অডিট টিম ইতিবাচক প্রতিবেদন দিয়েছিল।

২০১১ সালে পি কে হালদার রিলায়েন্সের এমডি ছিলেন। মূলত ওই সময়ে তার অপকর্মের শুরু। তার ইচ্ছামতো গ্রাহকদের ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে কোনো যাচাই-বাছাই ছাড়াই একদিনের মধ্যে ঋণ অনুমোদন ও বিতরণ করতেন। অনেক সময় গ্রাহক জানতও না, তার নামে ঋণ নেওয়া হয়েছে। এভাবে তিনি প্রতিষ্ঠান থেকে শত শত কোটি টাকা ঋণের নামে আত্মসাৎ করেন।
জানা যায়, পিপলস লিজিংয়ের আর্থিক ভিত ধ্বংস করে দেওয়ার পেছনে একাধিক ব্যাংকার ও ব্যবসায়ী জড়িত রয়েছেন। এ প্রতিষ্ঠানের অর্থ লোপাটে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ওই দুই কর্মকর্তা ও দেশের শীর্ষ পর্যায়ের একজন ব্যবসায়ীর নাম উঠে এসেছে। দুদকের মামলায় গ্রেপ্তার পিপলস লিজিংয়ের সাবেক চেয়ারম্যান উজ্জ্বল কুমার নন্দী সম্প্রতি আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বেচ্ছায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে এ তথ্য দিয়েছেন।

দুদক জানায়, ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের টাকা আত্মসাতের অভিযোগে এ পর্যন্ত ২২টি মামলা হয়েছে। ফাস ফাইন্যান্সের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে ১৩টি মামলা করা হয়। এ ছাড়া এক হাজার কোটি টাকা মূল্যের সম্পদ জব্দ করা হয়েছে। গ্রেপ্তার করা হয়েছে প্রতিষ্ঠান দুটির এমডি মো. রাশেদুল হক এবং রাসেল শাহরিয়ারসহ ১২ কর্মকর্তা ও ঋণ গ্রাহককে। নিজেদের দোষ স্বীকার করে ১০ জন আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন। ৭৬ জন কর্মকর্তার বিদেশ গমনে ইমিগ্রেশনে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। ৩৩ জন কর্মকর্তা এবং বোর্ড সদস্যদের সম্পদ বিবরণীর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে আরও মামলার প্রস্তুতি চলছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের উপপরিচালক, জয়েন্ট ডিরেক্টর লেভেলের পাঁচজন কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে।

এবার সাবেক ডেপুটি গভর্নর ও সাবেক নির্বাহী পরিচালককে জিজ্ঞাসাবাদের প্রক্রিয়া শুরু হলো। অনুসন্ধানে দুর্নীতির প্রমাণ মিললে তাদেরকেও আইনের আওতায় আনা হবে।

জানা যায়, ২০১০ সালে পি কে হালদার যখন রিলায়েন্স ফাইন্যান্সের এমডি ছিলেন তখন রাশেদুল হক রিলায়েন্স ফাইন্যান্সের ডিএমডি। ২০১৫ সালে পি কে হালদার যখন এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকের এমডি হন, রাশেদুল হক তখন ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের এমডি হিসেবে যোগ দেন। পি কে হালদার এমডি হয়েই আর্থিক খাতের সব প্রতিষ্ঠানের কর্তৃত্ব নিজের হাতে নিয়ে নেন। যাচাই-বাছাই ছাড়াই ঋণ প্রস্তাবের পরদিনই ঋণ দিয়ে দেন। এভাবে প্রায় ৪০টি প্রতিষ্ঠানকে আড়াই হাজার কোটি টাকা ঋণ দিয়েছেন, যার বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কোনো জামানত ছিল না। কাগুজে প্রতিষ্ঠানকে জামানত ছাড়াই শত শত কোটি টাকা ঋণ দিয়ে ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের অর্থনৈতিক ভিত ভেঙে দেওয়া হয়েছিল।