জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সারাজীবন এ দেশের মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম করেছেন। তিনি নির্যাতিত, নিপীড়িত, শোষিত; পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অধিকার থেকে বঞ্চিত নারীদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু উপলব্ধি করেছিলেন, দেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেক নারী। তাদের বাদ দিয়ে দেশের সার্বিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাই তিনি নারীদের রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে ১৯৬৯ সালে পূর্ব পাকিস্তান মহিলা আওয়ামী লীগ গঠন করেন। স্বাধীনতা অর্জনের পরপরই ১৯৭২ সালে সংবিধানে নারীর সমঅধিকার নিশ্চিত করেন। আইন প্রণয়নের সর্বোচ্চ জাতীয় প্রতিষ্ঠান মহান জাতীয় সংসদে নারীদের পক্ষে কথা বলার জন্য নারী আসন সংরক্ষণ করেন। মহান মুক্তিযুদ্ধে নির্যাতিত নারীদের পুনর্বাসনের লক্ষ্যে ১৯৭২ সালে নারী পুনর্বাসন বোর্ড গঠন করেন। নির্যাতিত নারী বীর মুক্তিযোদ্ধাদের 'বীরাঙ্গনা' উপাধি দিয়ে মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করেন। মুক্তিযুদ্ধে নির্যাতিত নারীদের গোপনীয়তা রক্ষার জন্য ভারত, জাপান, জার্মানি, ব্রিটেন ও রাশিয়া থেকে ডাক্তার এনে চিকিৎসা করান। পরিবার তাদের গ্রহণ করতে চাইত না। নির্যাতিতদের বিয়ের ব্যবস্থা করে পরিবার ও সমাজে আলোকিত জীবন দান করেন। এসব কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিব। বিয়েতে বাবার নাম জিজ্ঞেস করা হলে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, বলে দাও বাবার নাম শেখ মুজিবুর রহমান, ঠিকানা ৩২ নম্বর ধানমন্ডি। নির্যাতিত নারীদের দক্ষতা ও সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ প্রদান করেন। শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের স্ত্রী ও কন্যাদের চাকরি, ভাতা ও বাসস্থানের ব্যবস্থা করেছিলেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্যাতিত বীরাঙ্গনা নারীদের মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে গেজেটে অন্তর্ভুক্ত করেন। ১৯৭৩ সালে প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় নারীশিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবার পরিকল্পনা, সমবায়, কৃষি, কুটিরশিল্পসহ বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে অর্থনৈতিকভাবে নারীদের ক্ষমতায়নের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করেন।
বঙ্গবন্ধু চাইতেন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে মেয়েরা ছাত্র রাজনীতির চর্চা করুক। ১৯৭২ সালে ছাত্র রাজনীতির সংকটময় মুহূর্তে ইডেন কলেজ ছাত্রলীগের দু-একজন বাদে ছাত্রলীগের সব নেতাকর্মী জাসদ সমর্থিত ছাত্রলীগে যোগদান করে। অনেক বাধা অতিক্রম করে কামাল ভাইয়ের (বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠ পুত্র বীর মুক্তিযোদ্ধা ক্যাপ্টেন শেখ কামাল) সহযোগিতায় আমি ছাত্রলীগ পুনর্গঠন করি। একদিন আমি বঙ্গবন্ধুকে বললাম, লিডার, আমি এখন আর ইডেন কলেজে নাই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছি। রোকেয়া হলে থাকি। বঙ্গবন্ধু কয়েক সেকেন্ড নীরব থেকে বললেন, ইডেন কলেজে সংসদ নির্বাচন কবে? আমি বললাম, খুব শিগগিরই হবে। বঙ্গবন্ধু বললেন, তুমি যদি ইডেন কলেজ ছাত্রী সংসদে নির্বাচন করো, তাহলে ফুল প্যানেলে জয়লাভ করা সম্ভব। আমি তখন ইডেন কলেজ ছাত্রলীগের সভাপতি। পরদিন বঙ্গবন্ধুর নির্দেশেই আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে ইডেন কলেজে অনার্সে (অর্থনীতিতে) ভর্তি হই। ইডেন কলেজ ছাত্রী সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করি এবং আমি জিএস নির্বাচিত হই। আমার নেতৃত্বে ইডেন কলেজে ছাত্রলীগ প্রথম ফুল প্যানেলে জয়লাভ করে। বঙ্গবন্ধুর স্নেহ, আদর্শ ও নির্দেশনায় ইডেন কলেজে সংসদ নির্বাচনে ছাত্র রাজনীতিতে আমার উত্থান এবং বর্তমান অবস্থান। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ও মুজিববর্ষে জাতির পিতার অম্লান স্মৃতির প্রতি রইল বিনম্র শ্রদ্ধা।
জাতির পিতার পথ ধরে তার কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা নারীর উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, ক্ষমতায়ন ও তার সমঅধিকার প্রতিষ্ঠায় বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। নারীর দক্ষতা ও সক্ষমতা বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান, নারী উদ্যোক্তা সৃষ্টি এবং উৎপাদিত পণ্যের ব্র্যান্ডিংয়ে জয়িতা ফাউন্ডেশন গঠন করেছেন। সামাজিক ও আইনগত প্রেক্ষাপটে নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নকে বিবেচনা করেই ২০১১ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জয়িতা কার্যক্রমের শুভ উদ্বোধন করে তার নামফলক উন্মোচন করেন। পরে জয়িতাকেন্দ্রিক নারীমুক্তির স্বপ্নকে দেশব্যাপী ছড়িয়ে দিতে মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তর 'জয়িতা অন্বেষণ বাংলাদেশ' নামে একটি অভিনব কার্যক্রমের সূচনা করে। ফলে জয়িতার পরিচিতি
যেমন দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে, তেমনি জয়িতাকে কেন্দ্র করে দেশের নারী সমাজের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা এবং আশার সৃষ্টি হয়।
২০২০ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতিসংঘের ৭৫তম সাধারণ অধিবেশনে ২০৪১ সালের মধ্যে কর্মস্থলে নারীদের হার ৫০ :৫০-এ উন্নীত করার অঙ্গীকার করেছেন। এ অঙ্গীকার বাস্তবায়নে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় কাজ করে যাচ্ছে। প্রায় এক কোটি নারীকে দক্ষতা ও সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ও মুজিববর্ষে দেশের সব নারী বীর মুক্তিযোদ্ধাকে একই দিনে, একই সময়ে এবং একই সঙ্গে সম্মাননা প্রদান করেছে। এটাই প্রথম সরকারিভাবে নারী বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মাননা প্রদান। নারীদের কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে দক্ষতা ও সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য সারাদেশে ৩৫টি বিভিন্ন ট্রেডে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হচ্ছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্যভাবে রয়েছে ৬৪টি জেলায় কম্পিউটার প্রশিক্ষণ, তৃণমূল পর্যায়ের প্রান্তিক নারীদের প্রশিক্ষণ এবং আইজিএ প্রকল্পের মাধ্যমে দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত নারীদের আত্মনির্ভরশীল জনশক্তিতে রূপান্তর করে উন্নয়নের মূল স্রোতধারায় সম্পৃক্ত করা। তথ্য আপা প্রকল্প তথ্যপ্রযুক্তির প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সুবিধাবঞ্চিত নারীকে ক্ষমতায়ন করছে।
ই-জয়িতা ও লালসবুজ ডটকম প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে নারী উদ্যোক্তাদের উৎপাদিত পোশাক ও পণ্যসামগ্রী অনলাইনে বিক্রি
করা হচ্ছে। বর্তমানে দেশে নারীর কর্মসংস্থানের হার ৩৮ শতাংশ। আর পাকিস্তানে ২৩ শতাংশ।
নারী উন্নয়ন, ক্ষমতায়ন, নারীর সমঅধিকার এবং সমমর্যাদা প্রতিষ্ঠায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিভিন্ন পদক্ষেপ যেমন- পরিকল্পনা, নীতি, আইন প্রণয়ন, অগ্রগতিশীল কৌশল গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করছেন, যা সারাবিশ্বে প্রশংসিত হচ্ছে। ফলে নারীর ক্ষমতায়ন, নারী উন্নয়নের বৈশ্বিক সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী। সমতাভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশের অবস্থান দক্ষিণ এশিয়ায় একেবারে শীর্ষে।
নারীর উন্নয়ন, ক্ষমতায়ন, তার সমঅধিকার ও সমমর্যাদা প্রতিষ্ঠায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এবং সেসব দেশের নামি-দামি প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন অ্যাওয়ার্ডে ভূষিত করেছে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ, সুরক্ষা ও সেবা প্রদানের জন্য মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে অনেক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। যেমন ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেন্টার (১৩টি), ক্রাইসিস সেল (৪৭টি জেলা সদর হাসপাতাল, ২০টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেল)। এ ছাড়া ট্রমা কাউন্সেলিং সেন্টার ও রিজিওনাল ট্রমা কাউন্সেলিং সেন্টারের মাধ্যমে মনোসামাজিক সেবা প্রদান করা হচ্ছে। টোল ফ্রি ন্যাশনাল হটলাইন ১০৯ চালু আছে ২৪ ঘণ্টা। আট হাজার কিশোর-কিশোরীকে ক্লাবের মাধ্যমে বাল্যবিয়ে এবং নারী নির্যাতন প্রতিরোধে সচেতন করা হচ্ছে। এ ছাড়া নারী ও শিশু সুরক্ষা এবং আইনি সহায়তা প্রদানের জন্য পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন, ২০১০; ডিএনএ (ডিঅক্সিরাইবো নিউক্লিক অ্যাসিড) আইন, ২০১৪; বাল্যবিয়ে নিরোধ আইন, ২০১৭ প্রণয়ন, যৌতুক নিরোধ আইন, ২০১৮, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) আইন, ২০২০ এবং শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র আইন, ২০২১ প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন হচ্ছে। বর্তমানে সময়ের প্রয়োজনে যুগোপযোগী করে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) আইন, ২০২০ প্রণয়ন করা হয়েছে। নারী ও শিশু নির্যাতন ট্রাইব্যুনাল ২০০৭ সালে ছিল ৪৫টি। বর্তমানে তা ১০৩টি। যার সুফল জনগণ পেতে শুরু করেছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তিন থেকে সাত কর্মদিবসের মধ্যে রায় দেওয়া হচ্ছে।
মা ও শিশু স্বাস্থ্যসেবায় বাংলাদেশ বিশ্বকে চমকে দিয়েছে। মা ও শিশুমৃত্যু রোধকল্পে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য এমডিজি অর্জিত হয়েছে। মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধি পেয়েছে।
বর্তমানে প্রায় ৭২ দশমিক ৮; যা ভারত ও পাকিস্তানকে চার বা পাঁচ বছরের জন্য পেছনে ফেলে দিয়েছে।
২০১৪ সালে লন্ডনে গার্লস সামিটে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০৪১ সালের মধ্যে বাল্যবিয়ের হার শূন্যে নামিয়ে আনার অঙ্গীকার করেছেন। সে অনুসারে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। বাল্যবিয়ে নিরোধ আইন, ২০১৭ প্রণয়ন, কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ, এক কোটি ৪০ লাখ মেয়েকে উপবৃত্তি প্রদান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মিড ডে মিল সরবরাহ, তৃণমূল পর্যায়ে মোবাইল কোর্ট পরিচালিত হচ্ছে। গত ৫০ বছরে আওয়ামী লীগ সরকার ব্যতীত বাংলাদেশে অন্য কোনো দলীয় সরকারের সময়ে নারীর উন্নয়ন ও ক্ষমতায়নে তেমন কোনো অগ্রগতি হয়নি।
ফজিলাতুন নেসা ইন্দিরা এমপি : প্রতিমন্ত্রী, মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়, রাজনীতিবিদ ও গবেষক