প্রজনন স্বাস্থ্য নারীর মৌলিক অধিকার হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। তার বৈবাহিক অবস্থা যাই-ই থাকুক না কেন, যে মুহূর্তে তিনি প্রজনন ক্ষমতা অর্জন করবেন, তখনই তা বিবেচনা করতে হবে। অথচ সংবিধানে প্রজনন অধিকারের কথা নেই। তবে ১৫ নম্বর অনুচ্ছেদে স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার কথা বলা হয়েছে। এ ছাড়া নারীর স্বাস্থ্যগত অধিকার রক্ষা করা ও সেবা প্রদান করার বিষয়েও রাষ্ট্রের অঙ্গীকার রয়েছে। তা সত্ত্বেও প্রজনন স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে নারীর প্রতি বৈষম্য বিদ্যমান। একদিকে পরিবার পরিকল্পনার বোঝা যেমন নারীর ঘাড়ে, অন্যদিকে অনেক ক্ষেত্রে এ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতাও নারীর নেই।

গর্ভে ছয় মাসের সন্তান ছিল মেয়েটির। কিন্তু সঙ্গীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে যেতে পারেনি। সম্প্রতি (২৪ মার্চ) অবৈধ গর্ভপাত করাতে গিয়ে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে মৃত্যুবরণ করেছে সে। গত বছরের ৭ জানুয়ারি রাজধানী ঢাকার কলাবাগানে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল মাস্টারমাইন্ডের 'ও' লেভেল শিক্ষার্থীর (১৭) যন্ত্রণাদায়ক মৃত্যুর কারণ বর্বরোচিত ও পৈশাচিক কায়দায় ফরেন বডি (বিকৃত যৌনাচারের উপকরণ) ব্যবহার। এতে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হলে কিশোরী মারা যায়। কিশোর-কিশোরী ও তরুণদের প্রজনন স্বাস্থ্য চাহিদা সম্পর্কিত বিভিন্ন অজ্ঞতা, গর্ভপাত ও সেবা না পাওয়ায় বিভিন্ন ধরনের দুর্ঘটনার শিকার মেয়ে কিংবা নারীরাই হন। কারোর ক্ষেত্রে 'মৃত্যু'ই চূড়ান্ত রূপ নেয়। এ ছাড়া দীর্ঘস্থায়ী শারীরিক জটিলতাকেও বরণ করতে হয় কোনো কোনো কিশোরীকে। এ অবস্থায় প্রজনন স্বাস্থ্য সম্পর্কিত তথ্য ও সেবা পাওয়ার অধিকার নিশ্চিতকরণ এবং বাল্যবিয়ে, অপ্রত্যাশিত গর্ভধারণ, নারীর প্রতি সহিংসতা নির্মূলকরণসহ তরুণদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি বলে মন্তব্য করেছেন বিশিষ্টজন। সরকারও নীরবতা ভাঙার জন্য সেবা বিভাগ এবং স্বাস্থ্য (ডিজিএইচএস), এমআইএস (ডিজিএফপি) দুটি পক্ষই কৈশোরবান্ধব স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে।

মূলত প্রজনন স্বাস্থ্য বলতে গর্ভধারণ, মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যুর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে সম্পৃক্ততার কথা বোঝায়। এ ক্ষেত্রে প্রজনন স্বাস্থ্য নারীর মৌলিক অধিকার হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। তার বৈবাহিক অবস্থা যাই-ই থাকুক না কেন, যে মুহূর্তে তিনি প্রজনন ক্ষমতা অর্জন করবেন, তখনই তা বিবেচনা করতে হবে। অথচ সংবিধানে প্রজনন অধিকারের কথা নেই। তবে ১৫ নম্বর অনুচ্ছেদে স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার কথা বলা হয়েছে। এ ছাড়া নারীর স্বাস্থ্যগত অধিকার রক্ষা করা ও সেবা প্রদান করার বিষয়েও রাষ্ট্রের অঙ্গীকার রয়েছে। তা সত্ত্বেও প্রজনন স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে নারীর প্রতি বৈষম্য বিদ্যমান।

একদিকে পরিবার পরিকল্পনার বোঝা যেমন নারীর ঘাড়ে, অন্যদিকে অনেক ক্ষেত্রে এ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতাও নারীর নেই। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, ঘরে-বাইরে নারীরা যে শুধু শারীরিক ও যৌন সহিংসতার শিকার হচ্ছেন তা নয়; পাশাপাশি মানসিক, আবেগিক সহিংসতারও শিকার হচ্ছেন নিয়মিতভাবে।

এক গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্বে প্রতি তিন নারীর একজনকে শারীরিক অথবা যৌন সহিংসতার শিকার হতে হয়েছে এবং মোট ৩৫ শতাংশ নারী জীবনের কোনো না কোনো সময় তার নিকটতম সঙ্গীর দ্বারা সহিংসতার শিকার হয়েছেন। এই সহিংসতা কোনো না কোনোভাবে প্রজনন স্বাস্থ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। ২০১৯ সালে ইউএনএফপির তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী ২১৪ মিলিয়ন নারী জন্মবিরতি নিতে চান; কিন্তু জন্মবিরতিকরণ পদ্ধতির অভাবে তা তারা পারেন না। বিশ্বে প্রতিদিন ৮৩০ জন নারীর মৃত্যু হয় মাতৃস্বাস্থ্য সম্পর্কিত প্রতিরোধযোগ্য কারণে। প্রতিদিন ৩৩ হাজার কিশোরী বাল্যবিয়েতে বাধ্য হচ্ছে।

জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা বিশ্বের সবচেয়ে প্রচলিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের উদাহরণ। এ ছাড়া প্রজনন স্বাস্থ্য নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের অভাবেও স্বাস্থ্যঝুঁঁকিতে থাকেন অনেক নারী। দেশের ৫০ শতাংশের অধিক নারী যাদের বয়স এখন ২০-এর মাঝামাঝি, তাদের ১৮ বছর বয়স পূর্ণ হওয়ার আগেই বিয়ে হয়েছে। প্রায় ১৮ শতাংশের বিয়ে হয়েছে ১৫ বছরের নিচে। পরিবারের সিদ্ধান্তে বাল্যবিয়ের কারণে মেয়েরা স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ে। অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ করে অনেকেই- এমন তথ্যও জানা যায় জরিপে।

এদিকে, অপরিণত বয়সে গর্ভধারণ করায় গর্ভাবস্থার ২০ সপ্তাহ পর অনেক মেয়ের রক্তচাপ ১৪০/৯০ বা তার বেশি হয় এবং প্রস্রাবের সঙ্গে আমিষ নির্গত হয়; এ রোগের নাম প্রি-এক্লাম্পসিয়া। পরে সমস্যাটি গর্ভাবস্থার খিঁচুনি হিসেবেও দেখা দিতে পারে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাল্যবিয়ের শিকার নারীর খিঁচুনি বেড়ে গেছে। এ প্রসঙ্গে আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের গাইনোকোলজি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. সেহেরীন এফ. সিদ্দিকা বলেন, 'আগের তুলনায় করোনা মহামারি শুরুর পর থেকে মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যুর হার বেড়েছে। এ ক্ষেত্রে বাল্যবিয়ে, অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ ও গর্ভনিরোধক সামগ্রী ব্যবহারের অপ্রতুলতাকেই দায়ী করা হচ্ছে। করোনাকালে বাজারে গর্ভনিরোধক সামগ্রী পর্যাপ্ত ছিল না। বাল্যবিয়ের শিকার নারীদের যদি পরিবার পরিকল্পনা সম্পর্কে জানানো যেত বা তাদের মধ্যে গর্ভনিরোধক সামগ্রী সরবরাহ করা যেত, তাহলেও মাতৃমৃত্যুর হার কিছুটা কমানোর সম্ভাবনা থাকত।'

জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা :অনেক পুরুষ নারীর পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি ব্যবহার অপছন্দ করেন। এই অজুহাতে প্রায়ই জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা সংঘটিত হয়। এ ধরনের নির্যাতনের শিকার নারীর বয়স ১৮ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে। এই বয়সী নারীরাই পরিবার পরিকল্পনা ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবার গ্রহীতা। সুতরাং পরিবার পরিকল্পনা ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবাগ্রহীতাদের সঙ্গে জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতার একটি বয়সভিত্তিক সম্পর্ক রয়েছে। এ প্রসঙ্গে মেরি স্টোপসের লিড অ্যাডভোকেসি অ্যান্ড কমিউনিকেশন মনজুন নাহার বলেন, 'আমরা সবাই বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে কথা বললেও আমাদের লক্ষ্যবস্তু এক। তা হলো, বাংলাদেশে জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা নির্মূল করা। পরিবার পরিকল্পনা, প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা ও জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা রোধে সরকারের পাশাপাশি সমাজের সব খাতের সব স্তরের মানুষকে একসঙ্গে এগিয়ে আসতে হবে।' তিনি জানান, বাঙালি সংস্কৃৃতি, সামাজিক ট্যাবু, মিথ, প্রথা যৌন বিষয়ে কোনো আলোচনা বা কথা বলা প্রায় নিষিদ্ধ করে রেখেছে। তাই আমরা সচেতন নই। বর্তমান তরুণ প্রজন্মও চায় বাল্যবিয়ে ও অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ বন্ধ হোক। তাই প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে পরিবার পরিকল্পনাকে মৌলিক অধিকারের আওতাভুক্ত করার দাবি জানান তিনি।

সাধারণত পরিবার পরিকল্পনা বলতে পিল, কনডমসহ জন্মনিয়ন্ত্রণের বিভিন্ন পদ্ধতিকে বোঝানো হয়। কিন্তু এটা একটা সম্পূর্ণ জীবনযাপনের বিষয়। করোনাকালীন ও পরবর্তী সময়েও যেসব কন্যাশিশুকে বাল্যবিয়ের হাত থেকে রক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না বা যারা বাল্যবিয়ের শিকার হয়েছে, অন্তত তাদের কাছে জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী ও তথ্যসেবা পৌঁছানো জরুরি। এ ক্ষেত্রে সরকার মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে তথ্যসেবা প্রদানের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে বলে জানিয়েছেন তরুণদের প্রজনন স্বাস্থ্য অধিকার নিয়ে কাজ করে এমন সংগঠন সিরাক বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক এস এম সৈকত।