পরিবেশ সুরক্ষা মঞ্চের নেতারা বলেছেন, খুলনা নগরীর সামর্থ্যবান লোকজন এখন নিজেরা নিজেদের উদ্যোগে সাব-মার্সিবল পাম্প বসিয়ে পানি সমস্যার সমাধান করছে। এর ফলে ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নামছে। গভীর নলকূপ-এর সঙ্গে সাব-মার্সিবল পাম্প বসানোর প্রক্রিয়া বেড়েই চলেছে। নগরীতে অপরিকল্পিতভাবে বিকাশমান আবাসন প্রকল্প এবং নগরীতে অবকাঠামোগত নির্মাণ কাজের জন্য ও অব্যাহতভাবে সাব-মার্সিবল পাম্পের ব্যবহার বাড়ছে। নিয়ন্ত্রণহীনভাবে ভূ-গর্ভস্থ পানি উত্তোলন করা হচ্ছে। এতে ভূ-গর্ভের পানির স্তর ইতোমধ্যে কোথাও কোথাও ২৫ থেকে ৩০ ফুট নিচে নেমে গেছে।

পরিবেশ সুরক্ষা মঞ্চ এর উদ্যোগে শনিবার খুলনা প্রেসক্লাবে ‘খুলনা মহানগরীর পানি সমস্যা ও ময়ূর নদ ব্যবস্থাপনা: আমাদের প্রস্তাবনা’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এ কথা বলা হয়। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পড়ে শোনান সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক সুতপা বেদজ্ঞ।

সংবাদ সম্মেলনে ভূ-গর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমাতে নগরীর পার্শ্ববর্তী ময়ূর নদীকে ঘিরে মিষ্টি পানির আধার গড়ে তোলা এবং পরিশোধন করে ওই পানি ব্যবহারের ব্যবস্থা করার দাবি জানানো হয়।

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, ১৫ বা ১৬ লাখ নগরবাসীর জন্য প্রয়োজনীয় পানি বিশেষত সুপেয় পানি প্রাপ্তির ক্ষেত্রে ঘাটতি রয়েছে। ফেব্রুয়ারি মাস থেকে মে মাস পর্যন্ত এই সমস্যা ভয়ানক রূপে দেখা দেয়। যদি বৃষ্টি দেরিতে আসে তবে সমস্যাকাল দীর্ঘায়িত হয়। খুলনা ওয়াসা প্রতিষ্ঠিত হলে নগরবাসী স্বাভাবিকভাবে আশা করেছিল, পানি সমস্যা সমাধান হবে। বিশেষ করে মধুমতি নদী থেকে পাইপ লাইনের মাধ্যমে পানি এনে নগরবাসীকে সরবরাহ করার উদ্যোগ নিয়ে অনেক আশাবাদ প্রচার করা হয়েছিল। কিন্তু প্রকল্প বাস্তবায়ন শেষে দেখা গেল, ওই প্রকল্প নগরবাসীর প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি, উপরন্তু নরগরবাসীকে নোনা ও ময়লা-দুর্গন্ধযুক্ত পানি ব্যবহার করতে হচ্ছে। অথচ ওই প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই প্রতিবেদনে (ফিজিবিলিটি স্টাডি রিপোর্ট) বছরের এপ্রিল-মে মাসে পানিতে নোনা উপস্থিতির কথা বলা হয়েছিল। বছর দশেকের ব্যবধানে ওই নোনার মাত্রা অনেক বেড়েছে। ওই প্রকল্পের আর একটি বড় উদ্দেশ্য ছিল ভূ-গর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে আনা, কিন্তু সেই লক্ষ্যও অর্জন করতে পারেনি।

এতে বলা হয়, ভূ-গর্ভস্থ পানির আধার টিকিয়ে রাখা এবং পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়া রোধ করতে প্রয়োজন পানির রি-চার্জিং (পুনর্ভরণ) ব্যবস্থা বজায় রাখা। বৃষ্টি হলেই রি-চার্জিং-এর সুযোগ সৃষ্টি হয়; আর এই ব্যবস্থাটি টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন ভূ-উপরিভাগে যথেষ্ট সংখ্যায় জলাধার সংরক্ষণ করা। খুলনা নগরীতে ব্যক্তিগত এবং সামাজিক মালিকানার পুকুরগুলোর হাতে গোনা দু-একটি মাত্র টিকে আছে।

এ পরিস্থিতিতে নগরীর পার্শ্ববর্তী ময়ূর নদীকে টিকিয়ে রেখে মিষ্টি পানির আধার গড়ে তোলার কথা অনেকদিন ধরে শোনা যাচ্ছে। একাধিকবার দখল উচ্ছেদ করা হয়েছে; কিন্তু আবারও সবকিছু দখলদারদের নিয়ন্ত্রণে যাচ্ছে। সবচেয়ে বড় কথা, নদে প্রবাহ সৃষ্টি করা যাচ্ছে না। প্রবাহ না থাকলে নদ-নদী টিকে থাকে না। এই নদটি আবার খনন করা হবে।

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, মধুমতি নদীর পানি শুষ্ক মৌসুমে নোনা আক্রান্ত হয়, তা পানযোগ্য নয়, এমন অবস্থায় কেন ওই প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা হলো? এই অদূরদর্শী প্রকল্প গ্রহণের মাধ্যমে জনগণের উপর বিদেশি ঋণের বোঝা বাড়ানোর জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। ময়ুর নদীকে ঘিরে মিষ্টি পানির আধার গড়ে তুলতে হবে। ময়ূর নদীর পানির বায়োলজিক্যাল স্ট্যাটাস নিরীক্ষণ করে পর্যায়ক্রমিক ট্রিটমেন্টের মাধ্যমে পানিকে ব্যবহারের উপযোগী করে তুলতে হবে।

বর্তমানে খুলনা নগরীর ৬০ শতাংশ পানি বিভিন্নভাবে ভূ-গর্ভ থেকে তোলা হচ্ছে। এই পানি বিভিন্নভাবে অপচয় করা হচ্ছে। অপচয় এখনই কমিয়ে ভূ-গর্ভস্থ পানি শুধুমাত্র পানের জন্য নির্দিষ্ট করা উচিৎ। পানির চাহিদা মেটাতে বিভিন্ন এলাকায় অনুমোদিতভাবে, ব্যবসায়িক কাজে ও ভবন নির্মানের কাজে ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। সাব-মার্সিবল পাম্প স্থাপনে বিধি-নিষেধ আরোপ করতে হবে।

খুলনা ওয়াসা দুটি পানির লাইন স্থাপনের পরিকল্পনা করতে পারে। একটি খাবার পানির, অন্যটি গৃহস্থালি কাজে ব্যবহারের জন্য। প্রাথমিক পর্যায়ে এটি একটু ব্যয়বহুল হলেও এতে ভূগর্ভস্থ পানির অপচয় কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। অন্যথায় একলাইনে খুলনা ওয়াসাকে খাওয়ার উপযোগী শতভাগ বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন সংগঠনের সভাপতি অ্যাডভোকেট কুদরত-ই-খুদা, বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) খুলনা বিভাগীয় সমন্বয়কারী মাহফুজুর রহমান মুকুল, গণসংহতি আন্দোলন জেলা আহবায়ক মুনীর চৌধুরী সোহেল, অধ্যাপক অজন্তা হালদার, নারীনেত্রী মেরিনা যুথী, সাংস্কৃতিক কর্মী শরীফুল ইসলাম সেলিম, নাগরিক নেতা জাহাঙ্গীর আলম সিদ্দিকী, মামুনুর রশীদ, মাসুদুর রহমান রঞ্জু, আফজাল হোসেন রাজু, কে এইচ শাহীন প্রমুখ।