হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন মারামারির ঘটনায় আহত রোগী ময়মনা বিবিকে প্রশ্ন করা হয়েছিল এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অবস্থা কেমন? জবাবে তীব্র ক্ষোভের সঙ্গে তিনি বলেন, 'কিতা কইতাম, ইতারে ডাক্তারি (স্বাস্থ্যসেবা) কয়নি? তিনদিন ধইরা আছি, প্যারাসিটামল ছাড়া আর কোনো ওষুধ দেয় না। সরকারে কিতা এই হাসপাতালে কোনো ওষুধ দেয় না? তা অইলে (তাহলে) আমরা কেল্লাগী (কী জন্য) সরকার বানাইছি? কুছতা (কিচ্ছু) দেয় না, হকলতাই (সব) বাইর তাইকা কিন্না আনতে হয়। কেনে সরকারে কুছতা দেয় না, এই কথাটা একটু লেইখ্যা দিও।'

নবীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন এই রোগীর বক্তব্য শুনেই হয়ত সেখানকার স্বাস্থ্যসেবা সম্পর্কে একটা ধারণা পাওয়া সম্ভব। এমন আরও হাজারও অভিযোগ রয়েছে। নিত্যনতুন অভিযোগের স্তূপে চাপা পড়ছে পুরনো অভিযোগ। কিন্তু কোনো অভিযোগেরই কোনো সুরাহা হয়নি। বরং নতুন করে যোগ হচ্ছে আরও অনেক সমস্যা আর সংকট।

নবীগঞ্জের প্রায় পাঁচ লাখ মানুষের স্বাস্থ্যসেবা রীতিমতো হুমকির মুখে। সরকারি এ হাসপাতালে রয়েছে সরকারি ওষুধ সামগ্রীসহ নানা যন্ত্রপাতির সংকট। চাহিদা মতো নেই ডাক্তার, নার্সসহ কর্মকর্তা-কর্মচারী। এমনকি যারা আছেন, তারাও ঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করেন না বলে অভিযোগ এখানে চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ও তাদের স্বজনদের।

এখানেই শেষ নয়, ৫১ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালে সংক্রামক রোগীদের চিকিৎসার জন্য নেই নারী-পুরুষের আলাদা ওয়ার্ড। এর ফলে মহিলা ও পুরুষদের একইসঙ্গে চিকিৎসা নিতে হয়। এছাড়া ময়লা ও আবর্জনার দুর্গন্ধ পুরো হাসপাতালজুড়ে। আর টয়লেটে একবার ঢুকলে দ্বিতীয়বার ডুকতে চান না কোনো রোগী।

এদিকে চিকিৎসাধীন রোগীদের অভিযোগ, তাদের খেতে দেওয়া হয় নিম্নমানের খাবার। এছাড়াও ওষুধের সংকটের কথা জানিয়ে প্যারাসিটামল আর স্যালাইন ছাড়া কোনো কিছু সরবরাহ করছে না হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। ফলে সব ওষুধই বাইরে আনতে হয় তাদের।

নবীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি ২০১৮ সালের জুলাই মাসে ৩১ শয্যা থেকে ৫১ শয্যায় উন্নীত হওয়ার পরে চিকিৎসক সংকট নিয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে আবেদন করা হলেও কোনো কাজ হয়নি। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, আট জন ডাক্তারের মধ্যে হাসপাতালে রয়েছেন মাত্র তিনজন। মেডিকেল সহকারী দুইজনের মধ্যে রয়েছেন একজন। ফার্মাসিস্ট দুইজনের মধ্যে রয়েছেন একজন।

এছাড়া ১০ জন নার্স থাকার কথা থাকলেও সেখানে রয়েছেন মাত্র তিনজন। আর ল্যাব টেকনেশিয়ানের দুটি পদের মধ্যে দুটিই শূন্য। অফিস সহকারী তিনজনের মধ্যে আছেন একজন। স্বাস্থ্য পরিদর্শক চারজনের মধ্যে রয়েছেন দুইজন। স্বাস্থ্য সহকারী ৫৫ জনের মধ্যে রয়েছেন ৩২ জন। নিরাপত্তা প্রহরী দুইজনের মধ্যে রয়েছের একজন। ঝাড়ুদার পাঁচজন থাকার কথা থাকলেও রয়েছেন চারজন। এদিকে উপজেলার ৩৪টি কমিউনিটি ক্লিনিকের অবস্থা আরও নাজুক। প্রতিটি ক্লিনিকে দুইজন করে স্বাস্থ্য সহকারী থাকার কথা থাকলেও সেটা রয়েছে শুধু কাগজে কলমে।

নবীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সবমিলে প্রায় ৫০টি পদ শূন্য রয়েছে। এছাড়া উপজেলার পাঁচটি উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রের তিনটিতেই কোনো ডাক্তার নেই। এরমধ্যে আউশকান্দি ও মান্দারকান্দি উপস্বাস্থ্য কেন্দ্র দীর্ঘদিন ধরেই ডাক্তার শূন্য।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রতিবছর তিন থেকে চার লাখ টাকার সরকারি ওষধ সামগ্রী দেওয়া হয়। কিন্তু এটা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম। এজন্যই প্রতিবছর হাসপাতালে ওষুধ সংকট লেগেই থাকে।

চিকিৎসা নিতে আসা মখলিছ মিয়া বলেন, 'দুইদিন ধইরা হাসপাতালে আছি, যেতা খাইবার লাগি দেয়, ইতা খাইবার মতো নায়, খালি উনা (সেদ্ধ) ডিম আর ডাইলের (ডাল) পানি দেয়। ইতা খাইলে অসুখ কমবে তো দূরের কথা আরও বাড়বে।'

হাসপাতালে রয়েছে একটিমাত্র অ্যাম্বুলেন্স, তাও আবার নষ্ট। ফলে জরুরি রোগীদের বিভিন্ন হাসপাতালে পাঠানোর ক্ষেত্রে সমস্যা লেগেই থাকে। এছাড়া উপজেলার ভাটি অঞ্চলের তিনটি ইউনিয়নের কোনো স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ওষুধ নেই। ফলে স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে হাজার হাজার মানুষ।

নবীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আব্দুস সামাদ বলেন, উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রে প্রতি তিন মাস অন্তর অন্তর ১৩ হাজার টাকার সরকারি ওষুধ দেওয়া হয়, যা দিয়ে তিন মাস চালানো কষ্টকর।

তিনি আরও বলেন, আমরা চেষ্টা করছি রোগীদের উন্নত চিকিৎসাসেবা দেওয়ার। এখানে কোনো দুর্নীতি নেই। আমরা শূন্য পদ পূরণের জন্য ওপর মহলে লিখিত চাহিদা পাঠিয়েছি। প্রতিমাসে সিভিল সার্জনের মাধ্যমে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে চাহিদা জানিয়ে শূন্য পদগুলো পূরণের জন্য চিঠি লিখছি। কিন্তু এখনও কোনো পদ পূরণ হয়নি।