জমির প্রকৃত মূল্য গোপন করে তুলনামূলক কম টাকায় রেজিস্ট্রির কারণে সরকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে দলিল সম্পাদনে জমির ক্রেতা ও বিক্রেতাকে সহায়তা করছেন সংশ্নিষ্ট দলিল লেখক ও সাব-রেজিস্ট্রাররা। এতে জমির দলিল মূল্যের বাড়তি টাকা বিক্রেতার পকেটে জমছে কালো টাকা হিসেবে। অন্যদিকে জমি কেনার নামে ক্রেতা পাচ্ছেন কালো টাকা বিনিয়োগের সুযোগ।

জমি রেজিস্ট্রি নিয়ে অনিয়ম ও দুর্নীতি চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) প্রাতিষ্ঠানিক টিমের প্রতিবেদনে জমি কেনাবেচায় ওই দুর্নীতির তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।

প্রাতিষ্ঠানিক টিম রেজিস্ট্রি অফিসে অনিয়ম ও দুর্নীতির ১০টি উৎস চিহ্নিত করেছে। এসব প্রতিরোধে ১০টি সুপারিশও করা হয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক টিমের প্রতিবেদনটি সম্প্রতি আইন মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে গত ২০১৪ সালের দলিলও এখন পর্যন্ত বালাম বইতে (অবিনাশী বহি) লিপিবদ্ধ করা হয়নি। অথচ যত নকলনবিশ আছেন, তাদের পক্ষে প্রতিদিনের দলিল প্রতিদিনই লিপিবদ্ধ করা সম্ভব। সময়মতো দলিল বালামে লিপিবদ্ধ না হওয়ায় মূল দলিল এবং এর সার্টিফায়েড কপি সরবরাহে জটিলতা দেখা দিচ্ছে।

দলিল রেজিস্ট্রেশনের সময় সরকারি রাজস্ব হিসাবে জমাকৃত পে-অর্ডার, ব্যাংক ড্রাফট, চেক ইত্যাদি সংশ্নিষ্ট ব্যাংকের হিসাবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জমা হয় না। অনেক সময় এগুলো ইস্যুকারী ব্যাংকে দাবিদারবিহীন অবস্থায় পড়ে থাকে। এই পরিস্থিতিও দুর্নীতির আরেক উৎস হয়ে উঠেছে। অনেক ব্যাংক ড্রাফট, পে-অর্ডার, চেক খোয়া যাচ্ছে সংশ্নিষ্ট দপ্তর থেকে। জালিয়াতির মাধ্যমে এই অর্থ আত্মসাৎ করা হচ্ছে।

দলিল রেজিস্ট্রেশন হওয়ার পর জমি হস্তান্তর (এলটি) নোটিশ সংশ্নিষ্ট এসিল্যান্ড অফিসে পাঠানোর কথা। কিন্তু সরেজমিন দেখা যায়, গুলশান সাব-রেজিস্ট্রি অফিস কর্তৃক এলটি নোটিশ পাঠানোর অগ্রগামী পত্রের কপি গেলেও তাতে কোন কোন দলিলের তথ্য পাঠানো হয়েছে, তার কোনো বিবরণ নেই। একই স্মারকে বিশেষ কোনো বিবরণ ছাড়াই এক মাসের একাধিক এলটি নোটিশ এসিল্যান্ড অফিসে পাঠানো হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে সর্বশেষ জরিপ অনুসারে রেকর্ড অব রাইটস (আরওআর) থাকলে এবং তা পরীক্ষা করে রেজিস্ট্রেশন করা হলে বিতর্কিত জমি রেজিস্ট্রেশন কমে যেত এবং দুর্নীতিও কমত।

প্রতিবেদনে বলা হয়, কোনো দলিল জাল দলিল হিসেবে রেজিস্ট্রেশন হয়ে গেলে সেটি বাতিল করা কোনো দেওয়ানি আদালত ছাড়া জমির প্রকৃত মালিকের পক্ষেও সম্ভব হয় না, যা একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। এ ক্ষেত্রে আইন সংশোধনের মাধ্যমে আপিল ও রিভিউ ক্ষমতা জেলা রেজিস্ট্রার ও তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা (এআইজিআর) বা কোনো অথরিটিকে দেওয়া গেলে দেওয়ানি আদালতে মামলাজট কমবে।

দুদকের প্রাতিষ্ঠানিক কমিটি নিয়োগ-বদলির ক্ষেত্রেও ব্যাপক অনৈতিক বাণিজ্যের সন্ধান পেয়েছে। আইন অনুযায়ী তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী বদলি, দলিল লেখক, নকলনবিশ নিয়োগের ক্ষমতা সংশ্নিষ্ট জেলা রেজিস্ট্রারের হলেও বাস্তবে এসব নিয়োগ ও বদলি হয়ে থাকে আইজিআরের দপ্তর থেকে।

দুর্নীতি প্রতিরোধে সুপারিশমালা :জমি রেজিস্ট্রির ক্ষেত্রে অনিয়ম-দুর্নীতি প্রতিরোধে এ প্রতিবেদনে ১০টি সুপারিশ করা হয়েছে। সুপারিশে বলা হয়েছে, ঢাকায় রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্সে অবস্থিত সাব-রেজিস্ট্রি অফিসগুলোতে রেজিস্ট্রেশন ম্যানুয়াল-২০১৪ ও রেজিস্ট্রেশন আইন-১৯০৮ যথাযথভাবে অনুসরণ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নিবন্ধন পরিদপ্তরের মহাপরিদর্শককে পরামর্শ দেওয়া যেতে পারে। প্রতিবেদনে বালাম বহিতে রেজিস্ট্রেশন ম্যানুয়ালে বর্ণিত নির্ধারিত পদ্ধতিতে লিপিবদ্ধকরণ নিশ্চিত এবং প্রতিটি দলিল ডাটাবেজে সংরক্ষণ করার কথা বলা হয়েছে।

সুপারিশে বলা হয়েছে, রেজিস্ট্রেশন 'ফি' হিসেবে প্রাপ্ত পে-অর্ডার, ব্যাংক ড্রাফট রেজিস্ট্রারে এন্ট্রিসহ সময়মতো সংশ্নিষ্ট ব্যাংকে জমা দেওয়া, সব সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের সিটিআর রিপোর্ট ব্যাংকের সঙ্গে মিলিয়ে এক মাসের মধ্যে হালনাগাদ করা উচিত। অনলাইন ব্যাংকিং সুবিধা থাকলে সেটিই এ ক্ষেত্রে কাজে লাগাতে হবে।

সুপারিশে আরও বলা হয়েছে, জমির হালনাগাদ খতিয়ানের কপি সংশ্নিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে সংরক্ষণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন এবং সে অনুযায়ী দলিল রেজিস্ট্রি করার আগে জমির মালিকানা-সংক্রান্ত বিষয় নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। মালিকানা বদলের ক্ষেত্রে অটো-জেনারেটেড মোবাইল এসএমএসের মাধ্যমে দাতা ও গ্রহীতাকে জানিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। এতে দলিল জালের আশঙ্কা কমবে। আইন সংশোধনের মাধ্যমে জাল দলিল বাতিল ও সংশোধনের আপিল ও রিভিউ ক্ষমতা জেলা রেজিস্ট্রার ও তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা আইজিআরকে দেওয়া যেতে পারে। সম্পাদিত দলিলের দাতাগ্রহীতা, দলিলমূল্য ও জমির বিবরণের ডাটাবেজ তৈরি করা যেতে পারে।

এ ছাড়া যারা বিনিময় মূল্যের চেয়ে কম মূল্য দেখিয়ে এরই মধ্যে জমি রেজিস্ট্রেশন করেছেন, তাদের জন্য অপ্রদর্শিত টাকা সম্পর্কে ঘোষণা দিয়ে নির্ধারিত সরকারি ফি দিয়ে অর্থ সাদা করার ব্যবস্থা রাখা যেতে পারে। রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্সের সব পর্যায়ে ডিজিটাইজেশন, অটোমেশন পদ্ধতি চালু করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সংশ্নিষ্ট দপ্তরকে পরামর্শ দেওয়া যেতে পারে। কমিটি জানিয়েছে, সাব-রেজিস্ট্রার ও স্টাফ বদলির ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট বদলির নীতিমালা থাকা প্রয়োজন। নিবন্ধন পরিদপ্তরের মহাপরিদর্শককে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র ছাড়া লটারির মাধ্যমে বদলির ব্যবস্থা চালুর পরামর্শও দেওয়া হয়েছে।