উৎসব, পার্বণ আর ঈদ বাঙালি পরিবারের সকলের সঙ্গে মিলে উদযাপন করে। করোনার বিধিনিষেধে নানান ঝক্কি নিয়ে অনেকেই গত দুই বছর ঈদে বাড়িতে গেছেন। তবে একটি বড় অংশই যেতে পারেনি। এ বছর করোনার সংক্রমণ কম, তাই বহু মানুষ ঈদে বাড়ি যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এ জন্য সব রুটে অতিরিক্ত বাস ও ট্রেন দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছে মালিকপক্ষ ও সরকার। দেশের দক্ষিণাঞ্চলের ২২ জেলার মানুষের যাতায়াতের জন্য নৌপথে লঞ্চ মালিকরাও নিচ্ছেন প্রস্তুতি। লঞ্চের ভেতরে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এ বছর জাতীয় পরিচয়পত্র ছাড়া টিকিট বিক্রি না করতে নির্দেশনা দিয়েছে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়। তবে ঈদযাত্রায় অধিক যাত্রী পরিবহনে বিভিন্ন রুটে দীর্ঘদিন চলাচল বন্ধ থাকা পুরোনো লক্কড়ঝক্কড় ফিটনেসবিহীন লঞ্চও প্রস্তুতি নিচ্ছে।

কেরানীগঞ্জের ডকইয়ার্ডে পুরোনো লক্কড়ঝক্কড় ফিটনেসহীন লঞ্চে রং লাগিয়ে নতুন করার কাজ চলেছে। এসব লঞ্চের কারণে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়বে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের শিক্ষক মহিউদ্দিন মাহি বলেন, ঈদযাত্রায় প্রায় প্রতি বছরই নৌপথে দুর্ঘটনা ঘটে। অতিরিক্ত যাত্রী বহন ও ফিটনেসবিহীন লঞ্চ সেই ঝুঁকি আরও বাড়ায়। এ বছর বৈশাখেই শুরু হবে ঈদের ঘরে ফেরা। আমাদের দেশে প্রতি বছর কালবৈশাখী ঝড় হয়। এ বছর ঈদে নৌযাত্রায় আরও বেশি সচেতন থাকতে হবে। বিআইডব্লিউটিএ, লঞ্চ মালিক, চালক, কর্মচারী, যাত্রী সবার সতর্ক হতে হবে, যাতে ফিটনেসবিহীন লঞ্চ চলাচল না করে। যাত্রীও যেন বোঝাই করে নেওয়া না হয়।

রাজধানীর সদরঘাট থেকে প্রতিদিন দেশের ৪২টি রুটে ২২৫টি লঞ্চ চলাচলের অনুমতি আছে। কিন্তু প্রতিদিন সদরঘাট থেকে ৫৫ থেকে ৬৫টি লঞ্চ ছেড়ে যায় এবং ঘাটে ফিরে আসে। রুটের অনুমতি থাকা অর্ধেকেরও বেশি লঞ্চ চলাচল করে না। বেশি লাভের আশায় সিন্ডিকেট করে কম সংখ্যক লঞ্চে বেশি যাত্রী বহন করা হয়। ঈদের আগে পুরোনো লক্কড়ঝক্কড় লঞ্চ রঙের তুলিতে নতুন করা হয়। ঝুঁকি নিয়েই এসব লঞ্চে চলে ঈদযাত্রা।

কেরানীগঞ্জের তেলঘাট থেকে মীরবাগ পর্যন্ত ২৭টি ডকইয়ার্ড আছে। করোনার কারণে গত দুই বছরের একটা বড় সময় লঞ্চ চলাচল বন্ধ ছিল। যাত্রীও ছিল না। অন্যান্যবার যাত্রীর চাপ থাকলেও এ দুই ঈদে তেমন চাপ ছিল না। তাই এ বছর রমজানের আগ থেকেই লঞ্চের মালিকরা লঞ্চ সংস্কার ও রঙের জন্য ডকইয়ার্ডে নিয়ে আসছেন। লঞ্চ মেরামত করতে অনেক আগ থেকেই মালিকরা অগ্রিম টাকা দিয়ে রেখেছেন। প্রতিটি ডকইয়ার্ডে চলছে ফিটনেসবিহীন পুরোনো লঞ্চের মেরামত ও রঙের কাজ।

গত সোমবার দুপুরে লাকী ডক ইয়ার্ড অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ার ওয়ার্কস থেকে চেয়ারম্যান ডকইয়ার্ড পর্যন্ত ঘুরে দেখা যায়, এমভি ফারহান-২, কর্ণফুলী-১, বোগদাদিয়া-৭, বোগদাদিয়া-৯, এমভি লামিয়া, পারাবত-৯,পারাবত-১০, পারাবত-১১, এমভি জামাল-৯,ময়ূর-২, কাজল-৭, গ্লোরি অব শ্রীনগরসহ ৩০ থেকে ৪০টি লঞ্চ ডকইয়ার্ডে সংস্কারের জন্য দাঁড়িয়ে আছে।

ডকইয়ার্ডে দীর্ঘদিন কাজ করেন আনোয়ার। তিনি বলেন, বছরের অন্য সময়ের চেয়ে ঈদের আগে লঞ্চের কাজ বেশি পড়ে। এ সময় মালিকরা ঈদের ট্রিপ মারতে লঞ্চে কাজ করান। লঞ্চে ছোটখাটো সংস্কার ও রং করলে যাত্রী বেশি ওঠেন। তাই মালিকরা শুধু দায়সারা কাজ আর রং করেন।

লাকী ডকইয়ার্ড অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ার ওয়ার্কসে গত ১৫ দিন ধরে ছোটখাটো সংস্কার ও রঙে নতুন করে তোলা হচ্ছে। পাশ দিয়ে যাওয়ার পথে লক্কড়ঝক্কড় পুরোনো লঞ্চটি চেনার উপায় নেই। তবে যে ডকইয়ার্ডে লঞ্চটির কাজ করানো হচ্ছে তার মালিক মোহাম্মদ মিশু নিজেই অভিযোগ করলেন, ডকইয়ার্ডের পাশেই যে রাজহংস লঞ্চটি সংস্কার করা হচ্ছে তা চলাচল উপযোগী নয়। লঞ্চটির প্লেটে জায়গায় জায়গায় গর্ত এবং প্লেট অনেক পাতলা। ইঞ্জিনেরও অনেক কাজ বাকি। কিন্তু মালিক লঞ্চের সব কাজ করাবেন না। এ মালিক ছাড়াও অন্য লঞ্চের মালিকরা লঞ্চের সব কাজ না করে কোনো রকম রঙের কাজ ও ছোটখাটো মেরামতের কাজ করেই লঞ্চ যাত্রার জন্য নামান। এ ক্ষেত্রে সার্ভেয়ার ইঞ্জিনিয়াররা বড় ত্রুটি ছাড়াই লঞ্চ চলাচলের অনুমতি দেন। তাদের সঙ্গে মালিকদের একটা যোগসাজশ আছে। এ ডকইয়ার্ডের মালিক বললেন, মেরামতের জন্য নিয়ে আসা অধিকাংশ লঞ্চের একই অবস্থা।

জানা যায়, এমভি রাজহংস-৭ ঢাকা থেকে বরিশাল চলাচলের রুট পারমিট দেওয়া আছে। লঞ্চটি পুরোনো হওয়ায় এখন এ রুটে একই কোম্পানির রাজহংস-১০ লঞ্চটি চলে। কোনো রুটের লঞ্চের যান্ত্রিক ত্রুটি বা কোনো কারণে লঞ্চ চলাচলের জন্য না থাকলে তখন এই সময়ে এমভি রাজহংস-৭ লঞ্চটি চলাচল করে। লঞ্চের মাস্টার ফারুক জানান, লঞ্চটি নিয়মিত চলাচল করে না। সামনে ঈদের জন্য লঞ্চটি রং ও সংস্কার করা হচ্ছে। লাকী ডকইয়ার্ড অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ার ওয়ার্কসে ঢাকা থেকে বরিশালগামী অ্যাডভেঞ্চার-১, ঢাকা থেকে গৌরনদীগামী এমভি মানসী-৭, এমভি প্রিন্স আওলাদ-৫ লঞ্চে রং ও সংস্কারের জন্য দাঁড়িয়ে আছে। সবক'টি লঞ্চেই শুধু ছোটখাটো কাজই করা হবে, বড় ধরনের কাজ থাকলেও তা করানো হচ্ছে না বলে জানালেন ডকইয়ার্ডের কর্মীরা।

বরিশালগামী এমভি প্রিন্স আওলাদ-৫-এর সুপারভাইজার হিরু বলেন, এ লঞ্চে যাত্রী তেমন হয় না। এক সপ্তাহ আগে লঞ্চটি ডকইয়ার্ডে আনা হয়েছে। লঞ্চের বডি ও প্লেটের কাজ করানোসহ রং করা হবে। ঈদে যাত্রীর চাপ থাকে। যে কোনো রুটে যাওয়া লাগে।

লঞ্চ ডকইয়ার্ডে নেওয়ার আগে শিপ সার্ভেয়ারের অনুমতি নেওয়া হয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি দাবি করেন, শিপইয়ার্ডে নিতে জানানো লাগে না। যদিও কর্মকর্তারা বললেন ভিন্ন কথা।

নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের শিপিং অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, শিপিং সার্ভেয়ারের দু'একজন ইঞ্জিনিয়ার আছেন, যারা লঞ্চের সব কিছু না দেখে বড় ত্রুটি রেখেই লঞ্চ চলাচলে অনুমতি দেন। আবার ডকইয়ার্ডে কাজ করার পর তারা সার্টিফিকেট দেন লঞ্চের আর কোনো ত্রুটি নেই। একটি লঞ্চ সার্বক্ষণিক পরীক্ষা করে দেখা সম্ভব নয়। লঞ্চের কাজ শেষে ডকইয়ার্ডে গিয়ে সব দেখা সম্ভব নয়। আবার পানিতে লঞ্চের তলা পরীক্ষা করে দেখা সম্ভব নয়। লঞ্চ ডকইয়ার্ডে নেওয়ার আগে শিপিং অধিদপ্তরের রেজিস্ট্রারের কাছে জানিয়ে ডকইয়ার্ডে নেওয়ার নিয়ম। অধিকাংশ সময় তারা না জানিয়েই ডকইয়ার্ডে নেন।

বিআইডব্লিউটিএ'র যুগ্ম পরিচালক মো. সেলিম হোসেন, ঈদযাত্রা নিয়ে আমাদের প্রতি বছরের প্রস্তুতি থাকে। নৌ মন্ত্রণালয় থেকে একটা নির্দেশনা দিয়েছে। আগামী ১৮ তারিখ আমরা প্রস্তুতিসভা করব। যাত্রীদের সেবা নিশ্চিতে সব ধরনের সুবিধা থাকবে। ফিটনেসবিহীন কোনো লঞ্চ ঘাটে ভিড়তে দেওয়া হবে না।