হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পার হতেই ভাঙাচোরা সড়কের মুখোমুখি। মনটা বিষিয়ে উঠল। বাস র‌্যাপিড ট্রানজিটের (বিআরটি) নির্মাণকাজের কারণে ১২ লেনের বিশাল প্রশস্ত সড়ক ছয় লেনে এসে ঠেকেছে। জসীম উদ্‌দীন রোডের সামনে ফ্লাইওভারের সরঞ্জাম রাখায় সরু হওয়া সড়কে যানজট ঠেলে টঙ্গী সেতুতে পৌঁছাতে লাগল ঘণ্টাখানেক।

শনিবার সাপ্তাহিক ছুটির বিকেলে যদি এ দশা হয়, তাহলে ঈদে ঘরমুখো যাত্রীদের কপালে কী লেখা আছে- তা সহজে অনুমেয়।

বিআরটির জন্য ঢাকা ও গাজীপুরের সীমান্তে তুরাগ নদে চলছে ১০ লেনের সেতুর নির্মাণকাজ। এ কারণে পাশে অস্থায়ীভাবে নির্মিত স্টিলের সাঁকো পাড়ি দিয়ে গাড়ি ঢাকা ছেড়ে গাজীপুরে ঢোকে। সেতু পার হয়ে চেরাগ আলী পর্যন্ত ফ্লাইওভারের কাজ চলছে। নিচের রাস্তায় শেষ হয়েছে পিচ ঢালাইয়ের কাজ। এতে ভোগান্তি অনেকটাই কমেছে। সড়কের পাশে খানাখন্দ থাকায় বৃষ্টি হলে এই স্বস্তি উবে যাবে। চেরাগ আলীর পর দেখা গেল, সড়কের মাঝখানে বিআরটির স্টেশনগুলো মাথা তুলে দাঁড়াতে শুরু করেছে। তারাগাছ এলাকায় সড়কের দু'পাশে বিশাল গর্ত খোঁড়া হয়েছে বিআরটি স্টেশনের সিঁড়ি ও লিফট নির্মাণে। এসব নির্মাণকাজ এবং সড়কের প্রান্তসীমায় পিচ ঢালাই না হওয়ায় বিমানবন্দর থেকে জয়দেবপুর চৌরাস্তা পর্যন্ত ১৬ কিলোমিটার পথ এখনও ঢাকা-ময়মনসিংহ মানুষের জন্য বিভীষিকা। এই পথ পার হতে দুই থেকে আট ঘণ্টা পর্যন্ত লাগে।

বিআরটির সেতু অংশের পরিচালক মহিরুল ইসলাম জানান, ঈদের আগে ১০ লেনের সেতু চালু হবে না। আর সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তর অংশের পরিচালক এস এম ইলিয়াস শাহ জানান, আগামী ডিসেম্বরে বিআরটি খুলবে।

কর্তৃপক্ষের এই বক্তব্যে স্পষ্ট, পাঁচ বছর ধরে ময়মনসিংহ বিভাগের চার জেলার যাত্রী ভোগান্তি দিয়ে আসা বিআরটির নির্মাণকাজ এবারও ভোগাবে। ঢাকা-হালুয়াঘাট রুটের রনি পরিবহনের মালিক ওসমান আলী বলেন, টঙ্গী-জয়দেবপুর মহাসড়কের বেহাল দশায় ব্যবসা লাটে ওঠার জোগাড়। দিনে যানজটে এক ট্রিপও হয় না। ঈদে তো একবার গেলে আর ওই দিন বাস ফেরত আসতে পারবে না।

উত্তরবঙ্গ ও দক্ষিণবঙ্গের যাত্রীরা ঢাকা ছাড়েন গাবতলী সেতু হয়ে। বিদ্যমান সেতুর পাশে আট লেনের আরেকটি সেতুর নির্মাণকাজ চলছে। ঈদের আগে তা চালুর সম্ভাবনা নেই। ফলে পুরোনো সেতুই এবারের ঈদে ভরসা। শনিবার দুপুরে সেতু পার হতে যানজটে পড়তে হয়নি। গাবতলী থেকে চন্দ্রা পর্যন্ত মহাসড়ক যথাযথ মানে উন্নীত করতে প্রশস্ততা বাড়ানো হয়েছে। বাজার এলাকাগুলোতে মহাসড়কের গাড়ি চলাচলের জন্য দুই দিকে চার লেন রেখে দুই পাশে প্রতিবন্ধক তুলে ধীরগতির ও স্থানীয় গাড়ির জন্য আলাদা লেন করা হয়েছে।

গাবতলী পেরিয়ে আমিনবাজার ও হেমায়েতপুর ঘুরে দেখা যায়, এসব উদ্যোগ কাজে আসছে সামান্যই। স্থানীয় গাড়ির লেনে বসেছে বাজার ও পার্কিং। মহাসড়কের লেনে রিকশা, ইজিবাইক, অটোরিকশা থেকে শুরু করে সব ধরনের গাড়িই চলছে। ঠিক একই অবস্থা দেখা যায় সাভার, বাইপাইল, জিরানীসহ অন্য এলাকাতেও। যে যার মতো সড়ক পার হচ্ছে। অযান্ত্রিক গাড়িগুলো যেখানে ইচ্ছা টার্ন নিচ্ছে। এসব বিশৃঙ্খলায় মহাসড়কের গাড়ি কাঙ্ক্ষিত গতিতে চলতে পারছে না।

শ্যামলী এনআর পরিবহনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রাকেশ ঘোষ বলেন, রাস্তার উন্নতি হয়েছে, ভাঙাচোরা নেই; তারপরও আরিচা, চন্দ্রা যেতে সময় লাগছে, কোনো নিয়ম-শৃঙ্খলা নেই বলে।

ঢাকার আরেক প্রবেশপথ পোস্তগোলা সেতুর (প্রথম চীন মৈত্রী সেতু) পর এক্সপ্রেসওয়েতে যান চলাচল একেবারেই নির্বিঘ্ন। তারপরও ভোগাচ্ছে সেতুতে পুরোনো পদ্ধতিতে গাড়ি থামিয়ে হাতে তোলা টোল। গত বৃহস্পতিবার সেতুতে দেখা যায়, ইজারাদারের নিয়োগকারী টোল আদায়কারীরা রাস্তা আটকে টোল তুলছে। অন্য সেতুতে এই কাজটি নির্দিষ্ট লেন ও কম্পিউটারাইজড পদ্ধতিতে করা হলে ১৯৮৮ সালে নির্মিত পোস্তগোলা সেতুতে হাতে টোল তোলায় বাড়তি সময় লাগে। এতে সেতুর ঢাকার প্রান্তে যানজট তৈরি হয়।

স্থানীয় সংসদ সদস্য সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা বলেন, সরকার ১১ হাজার কোটি টাকা খরচ করে বিশ্বমানের ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ে করেছে। সেতুতে হাতে টোল তোলার কারণে এক্সপ্রেসওয়েতে ঢোকার মুখে ভোগান্তি হচ্ছে। এই সেতু টোলমুক্ত করতে করতে কত আন্দোলন হলো, কতবার অর্থ মন্ত্রণালয়কে বলা হয়েছে, কাজ কিছুই হচ্ছে না।

সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (ঢাকা জোন) সবুজ উদ্দিন খান বলেন, টোলমুক্ত করার সিদ্ধান্ত একমাত্র অর্থ মন্ত্রণালয় নিতে পারে।

টোলের কারণে যানজট হচ্ছে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের প্রবেশপথ কাঞ্চন সেতুতেও।

রূপগঞ্জ (নারায়ণগঞ্জ) প্রতিনিধি জানান, টোলে ধীরগতির কারণে ভোগান্তি হচ্ছে। ঢাকা বাইপাসের নির্মাণকাজের কারণে গোলকান্দাইল থেকে মীরেরবাজার পর্যন্ত ১০-১৫ কিলোমিটার পথে যানজট লেগেই আছে। যারা এই পথ হয়ে ঢাকা ছাড়েন, ঈদে তাদের ভুগতে হবে।

ঢাকার আরেক প্রবেশপথ কাঁচপুরে দ্বিতীয় সেতু নির্মাণের পর শিমরাইলে আগের ভোগান্তি নেই।

নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, তবে এবার শিমরাইল ও কাঁচপুরে যানজটের শঙ্কা তৈরি করেছে সেতুর নিচে থাকা ইউটার্ন এবং কাঁচপুর সেতুর পূর্বপাশে সিলেটমুখী লেনে বাস থামিয়ে যাত্রী ওঠানামার কারণে। শিমরাইল এলাকায় ট্রাফিক সার্জেন্ট কুশল কুমার বলেন, যানজট নেই বললেই চলে।

হাইওয়ে পুলিশের ট্রাফিক পরিদর্শক ওমর ফারুক বলেন, ২০ রোজার পর থেকে সড়কে যানবাহনের চাপ বাড়বে। বাড়তি যানবাহনের চাপ মোকাবিলায় তারা প্রস্তুত রয়েছেন। যানজট হতে পারে ইউটার্নের কারণে। ঈদযাত্রা শুরুর পর সব ইউটার্ন বন্ধ করা হবে। সিলেটমুখী লেন পরিস্কার রাখা হবে।