জয়দেবপুরের ভোগড়া থেকে এলেঙ্গা পর্যন্ত চার লেনের মহাসড়ক নির্মাণকাজ এখন শেষ অধ্যায়ে। এই মহাসড়ক তৈরিতে খরচ হচ্ছে প্রায় ছয় হাজার ১৬৮ কোটি টাকা, সময় লাগছে কমবেশি ১০ বছর। গত শনিবার বিকেলে গাজীপুরের এবড়োখেবড়ো সড়ক মাড়িয়ে মোটরসাইকেল যখন মহাসড়ক ছুঁল, মনে হলো ভিনদেশের রাস্তা! মসৃণ, চকচকে সড়কের মাঝে উঁচু বিভাজক। যানবাহনের অনাহূত প্রবেশ ঠেকাতে দুই পাশে প্রতিবন্ধক। তারপর ধীরগতির গাড়ির লেন।

কিছুদূর না যেতেই চার লেনের সড়ক দাপিয়ে উল্টোপথে আসতে দেখা গেল একটি ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক। না এসে নেই উপায়, তা বোঝা গেল খানিকটা সামনে এগিয়ে। ধীরগতির গাড়ি চলার লেনজুড়ে বাজার ও পণ্যবাহী গাড়ির পার্কিং। এই হযবরল পরিস্থিতি আগাম জানান দিচ্ছে, হাজার হাজার কোটি টাকায় মহাসড়ক হলেও ঈদযাত্রায় দেয়াল হয়ে দাঁড়াবে বিশৃঙ্খলা। ঢাকা-উত্তরবঙ্গ মহাসড়কের এই অংশের কাজ শেষ হলেও যমুনার বঙ্গবন্ধু সেতুর পশ্চিমে চলছে ঢাকা-রংপুর মহাসড়কের হাটিকুমরুল-রংপুর অংশের নির্মাণকাজ। সেখানে উন্নয়ন কাজের জন্য পড়তে হবে ভোগান্তির মুখে। ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের যাত্রীদেরও ভোগাবে উন্নয়ন। জয়দেবপুর চৌরাস্তার পর রাস্তা ভালো। তবে বিমানবন্দর থেকে জয়দেবপুর পর্যন্ত বাস র‌্যাপিট ট্রানজিটের (বিআরটি) নির্মাণকাজের কারণে সেখানে প্রতিদিন লাগছে তীব্র যানজট। যাত্রীদের ভাষায়, 'জাহান্নামের চৌরাস্তা হয়ে উঠেছে জয়দেবপুর চৌরাস্তা।'

পদ্মা সেতু চালু না হলেও ঢাকা থেকে মাওয়া হয়ে ভাঙা পর্যন্ত এক্সপ্রেসওয়ে চালু হওয়ায় দক্ষিণবঙ্গের যাত্রীদের এবারের ঈদে সড়কে খুব একটা ভুগতে হবে না। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত হলেও কুমিল্লা এলাকায় গাড়ির চাপে প্রতি বৃহস্পতি ও শুক্রবার রাতে যানজট হচ্ছে। ঢাকা-সিলেট মহাসড়কও দুই পাশে সার্ভিস লেনসহ চার লেনে উন্নীত করার কাজ শুরু হবে। এই মহাসড়ক এখনও দুই লেনের থেকে যাওয়ায় এবং বিভিন্ন পরিষেবার লাইন স্থানান্তরের কাজ চলমান থাকায় ঈদে ভোগান্তি নিশ্চিত সিলেট বিভাগের যাত্রীদের।

করোনার কারণে গেল চার ঈদে অনেকেই গ্রামমুখো হননি। করোনার তেজ কমে যাওয়ায় সবার ধারণা, এবার ঈদে গ্রামের পথে নামবে জনস্রোত। একে তো রোজা, তার ওপর তীব্র গরম। ঈদ আনন্দযাত্রায় টিকিটের বাড়তি দাম, যানবাহন সংকট, ভাঙাচোরা রাস্তার পাশাপশি সড়ক-মহাসড়কে যানজটের সঙ্গে যুদ্ধ করে এবারও যেতে হবে বাড়ি। ফলে এখনই দুশ্চিন্তা ভর করেছে ঈদযাত্রীদের মনে।

সারাদেশে তিন হাজার পাঁচ কিলোমিটার জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়ক এবং জেলা সড়ক ভাঙাচোরা, যা দেশের সড়ক-মহাসড়কের সোয়া ১৬ শতাংশ। এসব রাস্তা মেরামতে আগামী পাঁচ বছরে ২০ হাজার ১৪৯ কোটি টাকা প্রয়োজন। আগের বছরগুলোর কিছুটা উন্নতি হয়েছে রাস্তার। গত বছর তিন হাজার ৫৯১ কিলোমিটার সড়ক-মহাসড়ক ভাঙাচোরা ছিল।

সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্থাৎ জাতীয় মহাসড়কের ৪৮৭ কিলোমিটার ভাঙাচোরা, যা জাতীয় মহাসড়কের দৈর্ঘ্যের প্রায় সাড়ে ১৩ শতাংশ। এর মধ্যে ১৩২ কিলোমিটার জাতীয় মহাসড়কের অবস্থা খুবই খারাপ বা যান চলাচলের অনুপযুক্ত। বিপরীতে দেশের প্রায় ৬৫ শতাংশ রাস্তা ভালো রয়েছে। সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের মহাসড়ক উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণ (এইচডিএম) বিভাগের গত জুনে প্রকাশিত প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

সারাদেশে সড়ক ও মহাসড়কের দৈর্ঘ্য ২২ হাজার ৪২৮ কিলোমিটার। এর মধ্যে জাতীয় মহাসড়ক তিন হাজার ৯৮৯ কিলোমিটার, আঞ্চলিক মহাসড়ক চার হাজার ৮৯৭ কিলোমিটার এবং জেলা সড়ক ১৩ হাজার ৫৪১ কিলোমিটার। দেশের ৬৯১ কিলোমিটার রাস্তা যান চলাচলের উপযুক্ত নয়। আগের বছরে এ রকম রাস্তা ছিল ৯৪৩ কিলোমিটার।

সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর বলছে, সাউথ এশিয়ান সাব-রিজিওনাল কোঅপারেশন (সাসেক-১) নামে জয়দেবপুর থেকে এলেঙ্গা পর্যন্ত ৭০ কিলোমিটার মহাসড়কের কাজ ৯৯.৫ শতাংশ শেষ হয়েছে। আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের পর বিশৃঙ্খলা থাকবে না। গাড়ি নির্দিষ্ট লেন মেনেই চলবে, যানজটও থাকবে না। তবে সরেজমিনে দেখা যায়, ঈদের আগে ওই মহাসড়কের পুরো কাজ শেষ হওয়ার সম্ভাবনা নেই।

ভোগড়া থেকে কয়েক কিলোমিটার এগিয়ে গেলে নাওজোড় বাজার। সেখানে ওভারপাস নির্মাণকাজ শেষ হলেও তাতে ওঠার র‌্যাম্প এখনও নির্মাণাধীন। ঈদের আগে চালু না হওয়ায় এবারের ঈদেও উত্তরবঙ্গের যাত্রীদের নাওজোড় বাজারের অসহনীয় যানজট ঠেলে গন্তব্যে যেতে হবে।

কোনাবাড়ী ফ্লাইওভারের কাজ শেষ। চন্দ্রার আগে সফিপুরে ওভারপাসের কাজ চলমান। ফলে আনসার একাডেমির সামনে যানজটই নিয়তি। জয়দেবপুর-চন্দ্রা-এলেঙ্গা (সাসেক-১) প্রকল্পের প্রকৌশলী নুরুজ্জামান জানান, নাওজোড় ও সফিপুরের ওভারপাস ঈদের আগে চালু করতে দিনরাত কাজ চলছে।

চন্দ্রার ত্রিমোড়ে ফ্লাইওভারের পর সড়ক পুরোপুরি তৈরি হয়ে গেছে। নতুন সড়ক হলেও পুরোনো বিশৃঙ্খলা পিছু ছাড়েনি। মৌচাক বাজারের পশ্চিম পাশে মৌচাক-লৌহাকৈর সড়কের সামনে এ মহাসড়কের ডিভাইডারের মাঝখানে পথচারী সড়ক অতিক্রমে ফাঁকা রাখা হয়েছে। সেখান দিয়ে পথচারী ও পোশাক কারখানা ছুটির সময় মানুষ হেঁটে পার হয়। ফলে যানজট লেগেই থাকে।

কোনাবাড়ী হাইওয়ে থানার ওসি ফিরোজ আহমেদ জানান, ঈদের কয়েক দিন আগেই ছয়টি ইউটার্ন বন্ধ করে দেওয়া হবে। এবারের ঈদে বিপুলসংখ্যক পোশাক শ্রমিক ঘরমুখো হবেন, এ জন্য হয়তো সড়কে যানবাহনের চাপ এবার বেশি হবে। এতে যানজটের শঙ্কাও রয়েছে।

চন্দ্রার পর এলেঙ্গা পর্যন্ত মহাসড়কে বিশৃঙ্খলার অভিন্ন চিত্র দেখা গেল। এলেঙ্গা থেকে বঙ্গবন্ধু পর্যন্ত সড়ক এখনও দুই লেনের। প্রতি বৃহস্পতি ও শুক্রবার রাতে গাড়ির চাপ বাড়লে যানজট হচ্ছে এই ৩০ কিলোমিটার পথে। সেতু কর্তৃপক্ষের তথ্যানুযায়ী, সাধারণ সময়ে দিনে ১০ থেকে ১২ হাজার এবং ঈদযাত্রায় ৪০ থেকে ৪৫ হাজার যানবাহন পারাপার হয় বঙ্গবন্ধু সেতুতে। সওজ কর্মকর্তারা বলেছেন, জামালপুর ও শেরপুর থেকে উত্তরবঙ্গগামী যানবাহন এলেঙ্গার দুই লেনে যুক্ত হয়। ফলে যানজট আরও বাড়বে।

বঙ্গবন্ধুর সেতুর পশ্চিমে সিরাজগঞ্জের হাটিকুমরুল থেকে রংপুর পর্যন্ত ১৯০ কিলোমিটার মহাসড়ক দুই পাশে সার্ভিস লেনসহ চার লেনে উন্নীত করার কাজ চলছে। সাসেক-২ নামে এই উন্নয়ন প্রকল্পের কারণে সেখানে উত্তরের পথে তীব্র যানজটের শঙ্কা রয়েছে।

সাসেক-১ ও সাসেক-২ মহাসড়কে ঈদযাত্রায় যানজট ঠেকাতে গত বৃহস্পতিবার সড়ক পরিবহন সচিব নজরুল ইসলামের সভাপতিত্বে বৈঠক হয়েছে। সচিব বলেছেন, মহাসড়ক যান চলাচল নির্বিঘ্ন রাখতে ২৫ এপ্রিলের মধ্যে প্রয়োজনীয় কাজ শেষ হবে। ঈদের আগেই চালু হবে নলকা সেতু। উত্তরবঙ্গে নির্মাণকাজের কারণে সড়ক কিছুটা খারাপ। এ ছাড়া দেশের আর কোথাও সড়কে সমস্যা নেই।

তবে সরেজমিনে দেখা গেছে, সাসেক-২ প্রকল্পের কাজের কারণে খোঁড়াখুঁড়ি, সেতু ও ফ্লাইওভার নির্মাণ চলমান থাকায় যানবাহনের ধীরগতি রয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ ও যানজটপ্রবণ এলাকায় কাজ জরুরি ভিত্তিতে শেষ করতে সওজ ও সেতু কর্তৃপক্ষকে তাগিদ দিয়েছে সিরাজগঞ্জ ও বগুড়া হাইওয়ে পুলিশ।

তবে লাভের লাভ যে কিছু হচ্ছে না, তা যাত্রীদের কথাতেই স্পষ্ট। ঢাকায় কর্মরত নাভানা ফার্নিচারের সহকারী ব্যবস্থাপক এস এম তৌহিদুজ্জামান জানান, দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটে তার পরিবার থাকে। গত মাসে বাড়ি যেতে সড়কের সংস্কারকাজের জন্য বঙ্গবন্ধু সেতুর পশ্চিম পাড়ে ২১ কিলোমিটার মহাসড়ক পার হতে লেগেছে ছয় ঘণ্টা। ঈদে কী যে হবে?

সিরাজগঞ্জের ট্রাফিক পুলিশ জানিয়েছে, কড্ডা, কোনাগাতি ও পাঁচিলায় ফ্লাইওভার নির্মাণ ও নলকা সেতুর পাশে নতুন আরেকটি সেতু নির্মাণের কাজ চলমান থাকায় ঢাকা-রংপুর মহাসড়কে তীব্র যানজট হচ্ছে। ঈদের আগে 'নলকা' ও 'চান্দাইকোনা' সেতু চালু না হলে পরিস্থিতি খুবই খারাপ হবে।

সওজ নির্বাহী প্রকৌশলী দিদারুল আলম তরফদার জানান, যানজটপ্রবণ এলাকার সড়ক সাময়িকভাবে চার লেনে উন্নীত করা হয়েছে। কোথাও খানাখন্দ নেই।

সাসেক-২ প্রকল্পের পরিচালক ওয়ালিউর রহমান বলেন, শুধু নির্মাণকাজ নয়, যত্রতত্র বাস-ট্রাক দাঁড়ানো বা যাত্রী ওঠানামার কারণেও যানজট হয়। তা পুলিশকে দেখতে হবে।

ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের অবস্থা যেমন তেমন, এই পথের নারায়ণগঞ্জের ভুলতা অংশ পার হতেই দিন শেষ হচ্ছে। গত ১৩ এপ্রিল ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের তারাব বিশ্বরোড থেকে ভুলতা পর্যন্ত আট কিলোমিটার যানজট হয়।

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ঘুরে দেখা গেছে, নতুন তিন সেতু চালু হলেও যানজটের আশঙ্কা করছেন পরিবহন শ্রমিকরা। পুলিশের হয়রানি, শিমরাইল থেকে মেঘনা টোল প্লাজা পর্যন্ত ছোট-বড় ১১টি সিগন্যাল ও বাসস্ট্যান্ডের কারণে যানজট হতে পারে। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে বর্তমানে সংস্কার উন্নয়ন কাজ চলমান না থাকলে ফিটনেসবিহীন গাড়ি সড়কে বিকল হয়ে ভোগান্তির শঙ্কা রয়েছে। মেঘনা সেতুতে টোল আদায়ে ধীরগতিও যানজটের কারণ হতে পারে।

কাঁচপুর হাইওয়ে পুলিশের মোহাম্মদ সাজ্জাদ করিম খান বলেন, টোলপ্লাজায় যানজটের শঙ্কা নেই। তিন চাকার গাড়ি নিয়ন্ত্রণ ও চলাচল অনুপযোগী ফিটনেসবিহীন গাড়ি বন্ধ করা এবং বিকল হওয়া গাড়ি দ্রুত সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।

ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন করতে গত সপ্তাহে অংশীজনের সঙ্গে বৈঠক করেছে সওজ। বিআরটিএ চেয়ারম্যান নুর মোহাম্মদ মজুমদার বলেছেন, ঈদযাত্রায় ফিটনেসবিহীন গাড়ি চলতে দেওয়া হবে না। টার্মিনাল থেকে আটকে দিতে ভ্রাম্যমাণ আদালত নামানো হবে। সওজের প্রধান প্রকৌশলী একেএম মনির হোসেন পাঠানের দাবি, সড়ক-মহাসড়কের অবস্থা ভালো। রাস্তার কারণে যানজট হওয়ার কারণ নেই।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ড. হাদীউজ্জামান বলেছেন, ঈদ হুট করে আসে না। ঈদ কবে হবে, তা আগেই জানা থাকে। ঈদের প্রস্তুতি তো ছয় মাস আগে থেকে নেওয়া উচিত। যেসব উন্নয়ন প্রকল্পের কারণে ভোগান্তির শঙ্কা করা হচ্ছে, সেগুলো তো বহু আগেই শেষ হওয়ার কথা ছিল। কেন হয়নি, সে বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রতিবারই ঈদের আগে বলা হয়, যাত্রা নির্বিঘ্ন হবে। তার পরও ভোগান্তি হয়। কী কারণে, কার দায়ে ভোগান্তি হয়েছে, তা কি দেখা হয়? এটা দেখলে ভোগান্তি কমবে।