এ বছর পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী সারাদেশে ৩০ লাখের বেশি। মাদ্রাসার ইবতেদায়িতে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ছে তিন লাখের মতো শিক্ষার্থী। শিক্ষাবর্ষের চার মাস পার হতে চললেও এই ৩৩ লাখ ছাত্রছাত্রী এ বছর প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষায় (পিইসি) বসবে কিনা, সেটার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনও জানাতে পারেনি প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়।

সাধারণত অক্টোবরের শেষে কিংবা নভেম্বরের শুরুতে পিইসি পরীক্ষা নেওয়া হয়। সিলেবাস চূড়ান্ত, প্রশ্নপত্র তৈরি, মডারেশন, মুদ্রণ ও সারাদেশে তা পরিবহনে অন্তত দুই মাস সময় লাগে। এ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র তৈরি ও আনুষঙ্গিক কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকে ময়মনসিংহের জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমি (নেপ)। জানতে চাইলে প্রতিষ্ঠানটির দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সমাপনী পরীক্ষার বিষয়ে আমরা মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছি।

করোনার কারণে বিদ্যালয় বন্ধ থাকায় গত দুই বছর প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা বাতিল করা হয়েছিল। একই সঙ্গে বাতিল করা হয় প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর বার্ষিক পরীক্ষাও। তবে এ বছর এখনও মন্ত্রণালয় 'চুপ'।

একইভাবে, অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি) ও মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের জুনিয়র দাখিল সার্টিফিকেট (জেডিসি) পরীক্ষা নিয়েও শিক্ষা মন্ত্রণালয় পাকা সিদ্ধান্ত জানায়নি। যদিও সম্প্রতি শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি এ বছর জেডিসি পরীক্ষা না নেওয়ার বিষয়ে ইঙ্গিত দিয়েছেন। মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা (মাউশি) অধিদপ্তরের হিসাব বলছে, এ বছর বিদ্যালয়গুলোতে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ছে ২২ লাখ ৬১ হাজার ছাত্রছাত্রী। অন্যদিকে, মাদ্রাসায় অষ্টম শ্রেণিতে পড়ছে চার লাখের মতো। জেএসসি ও জেডিসি মিলিয়ে এবার পরীক্ষার্থী সংখ্যা অন্তত ২৬ লাখ ৬১ হাজার। পরীক্ষা নিয়ে এই শিক্ষার্থীরাও আছে দোটানায়।

সব মিলিয়ে দুটি সমাপনী পরীক্ষার জন্য (পিইসি, জেএসসি-জেডিসি) অপেক্ষমাণ প্রায় ৬০ লাখ ছাত্রছাত্রী শিক্ষা সংশ্নিষ্ট সরকারের দুটি মন্ত্রণালয়ের দিকে তাকিয়ে আছে।

প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষা এ বছর হবে কিনা জানতে চাইলে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব আমিনুল ইসলাম খান বলেন, পিইসি পরীক্ষার বিষয়ে এখনও আমরা সিদ্ধান্ত নিইনি। এখনও তো হাতে সময় আছে, দেখা যাক।' তিনি বলেন, 'করোনার দুই বছরে প্রাথমিক শিক্ষায় অনেক ক্ষতি হয়েছে। শিক্ষার্থীদের শিখন ঘাটতি থেকে গেছে। যে কারণে আমরা রমজানের মধ্যেও বিদ্যালয় খোলা রেখে ক্লাস নিয়ে শিক্ষার্থীদের সেই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। সামনের দিনগুলো কেমন আসে, সেটিও দেখার বিষয়।' তিনি বলেন, 'পরীক্ষার বিষয়ে সময়মতো সিদ্ধান্ত নিয়ে আমরা তা জানিয়ে দেব।'

উল্লেখ্য, পিইসি, ইবতেদায়ি সমাপনী ও জেএসসি-জেডিসি পাবলিক পরীক্ষা নয়। ফলে এসব পরীক্ষার আইনি কোনো ভিত্তিও নেই। সরকারের নির্বাহী আদেশে ২০০৯ সাল থেকে পিইসি এবং ২০১০ সাল থেকে জেএসসি পরীক্ষা নেওয়া শুরু হয়। পরে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদেরও এর আওতায় এনে ইবতেদায়ি সমাপনী ও জেডিসি পরীক্ষা চালু করা হয়।

করোনার সংক্রমণের কারণে ২০২০ সালের ১৭ মার্চ দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করেছিল সরকার। করোনা পরিস্থিতির উন্নতি হলে দীর্ঘ ১৮ মাস পর গত সেপ্টেম্বরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়া হয়। নতুন করে করোনার সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় গত ২১ জানুয়ারি আবার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছুটি ঘোষণা করে সরকার। এরপর মাধ্যমিক ও তদূর্ধ্ব প্রতিষ্ঠান খোলে ২২ ফেব্রুয়ারি আর প্রাথমিক বিদ্যালয় খোলা হয় ২ মার্চ থেকে। এর পর থেকে প্রায় পুরোদমেই চলছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।
জানা যায়, গত দুই বছর যেমন প্রাথমিক সমাপনী হয়নি, তেমনি আগামী দুই বছর পর থেকে এ পরীক্ষা নেওয়ার আর সুযোগ নেই। কারণ, আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে নতুন শিক্ষাক্রম চালু হতে যাচ্ছে। নতুন শিক্ষাক্রমে পিইসি ও জেএসসি পরীক্ষার কোনো বিধান রাখা হয়নি। ধাপে ধাপে ২০২৪ সালে অষ্টম শ্রেণি ও ২০২৫ সালে পঞ্চম শ্রেণি এ শিক্ষাক্রমের আওতায় আসবে। অর্থাৎ নতুন কারিকুলাম অনুযায়ী ২০২৪ সাল থেকে জেএসসি ও জেডিসি এবং ২০২৫ সাল থেকে পিইসি ও ইবতেদায়ি সমাপনী পরীক্ষা থাকছে না।

অভিভাবকরা বলছেন, যে পরীক্ষা আগামী দুই বছর পর এমনিতেই উঠে যাবে, সে পরীক্ষা এ বছর আর নেওয়ার কোনো মানে হয় না। কারণ ছোটদের এই বড় পরীক্ষা তারা চান না। গত দুই বছর পিইসি ও জেএসসি পরীক্ষা হয়নি। আগামীতেও পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণিতে নতুন কারিকুলাম পৌঁছাতে যে তিন-চার বছর বাকি আছে, সে সময়েও যেন পিইসি ও জেএসসি পরীক্ষা না নেওয়া হয়। আর এ বছর যদি নিতেও হয় তাহলে আরও আগেই এ ব্যাপারটি পরিস্কার করা উচিত ছিল। কারণ নভেম্বরে এই পরীক্ষাগুলো নেওয়া হয়। এখন এপ্রিল চলছে। আবার না নেওয়া হলেও এ ব্যাপারে ঘোষণা থাকা উচিত, তাহলে শিক্ষার্থীদের বাড়তি প্রস্তুতি নিতে কষ্ট করতে হবে না।

অভিভাবকদের মতের সঙ্গে সহমত প্রকাশ করে গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, সরকারের যে কোনো সিদ্ধান্ত আগেভাগেই শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের জানিয়ে দেওয়া উচিত, ঝুলিয়ে রাখা সমীচীন নয়। পিইসি পরীক্ষার বিষয়ে তিনি বলেন, পরীক্ষানির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে আমাদের বের হওয়ার সময় আরও আগেই এসেছে। আশার কথা, নতুন কারিকুলামে পরীক্ষার সংখ্যা কমানো হয়েছে। এখন দেখার বিষয়, কতটুকু তা আগামীতে কার্যকর হয়।


বিষয় : পিইসি ও জেএসসি

মন্তব্য করুন