কয়েক মাস ধরে দেশের বিভিন্ন সড়ক-মহাসড়কে ডাকাত ও ছিনতাইকারীর দৌরাত্ম্য চলছে বলে শনিবার সমকালের শীর্ষ প্রতিবেদনে যা বলা হয়েছে, তা যথেষ্ট উদ্বেগজনক। ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-রাজশাহী, ঢাকা-রংপুর ও ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের ৩০-৩৫টি জায়গায় প্রায়ই ডাকাতি হচ্ছে; মহাসড়কগুলোতে আন্তঃজেলা ডাকাত দলের ১৫-২০টি গ্রুপ এ অপরাধ করে যাচ্ছে- প্রতিবেদনের এমন তথ্য প্রমাণ করে পরিস্থিতি কতটা গুরুতর। তা ছাড়া চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে বাস, ট্রাক, প্রাইভেটকারসহ বিভিন্ন যানবাহনে ডাকাতির শিকার হয়ে জাতীয় জরুরি সেবা '৯৯৯'-এ কল করেছেন ২৪৮ জন। গত ছয় মাসে শুধু ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কাঁচপুর থেকে মেঘনা ঘাট এবং এশিয়ান হাইওয়ে সড়কের গোলাকান্দাইল থেকে মদনপুরে ১২টি ডাকাতি ও সাতটি ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এ ১৯টি ঘটনার মধ্যে মাত্র আটটিতে থানায় অভিযোগ দায়ের হয়েছে; বাকিগুলোতে ভুক্তভোগীরা অভিযোগ দায়েরের আগ্রহই দেখাননি। অনুসন্ধানে জানা গেছে, সংশ্নিষ্ট থানাগুলো সীমানার অজুহাত দেখিয়ে এসব মামলা গ্রহণে শুধু গড়িমসি করে না, অভিযোগকারীকে কখনও কখনও হয়রানিও করে।

বিভিন্ন সময় দেখা গেছে, ডাকাত ও ছিনতাইকারীরা সড়ক-মহাসড়কে এতটাই বেপরোয়া যে, অনেক সময় এরা শুধু অর্থ ও মালপত্র কেড়ে নিয়েই ক্ষান্ত হয় না, যাত্রীদের নানা ধরনের নির্যাতনও করে, যা থেকে এমনকি নারী ও শিশুরাও রেহাই পায় না। এমনও ঘটনা বিরল নয়, যেখানে ডাকাত বা ছিনতাইকারীর হাতে যাত্রীকে প্রাণও খোয়াতে হয়েছে। আমরা মনে করি, প্রশ্নটি যেমন সার্বিক আইনশৃঙ্খলার, তেমনই সড়ক ব্যবস্থাপনারও; পুলিশ বাহিনী ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ছাড়াও সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়কেও উদ্যোগী হতে হবে। পুলিশের সীমানাবিরোধ এবং প্রশাসনের ঔদাসীন্য মহাসড়কে যাত্রীদের জীবন ও সম্পদ এভাবে ঝুঁকিতে থাকতে পারে না। উদ্বেগজনক এ ঘটনায় দায় না এড়িয়ে দায়িত্ব নিতে হবে সংশ্নিষ্টদের।

সব মহাসড়ক ও কিছু সড়কে যানবাহনের নিরাপদ ও বাধাহীন চলাচল নিশ্চিত করার জন্য ২০০৫ সালে হাইওয়ে পুলিশ গঠন করা হয়। বর্তমান সরকারের আমলে বাংলাদেশ পুলিশের এ ইউনিটটিকে, প্রয়োজনের তুলনায় কিছু কম হলেও, কয়েক দফায় অনেক জনবল এবং টহলের জন্য গাড়িসহ নানা সরঞ্জাম সরবরাহ করা হয়েছে। কিন্তু দুঃখজনক হলো, এর পরও মহাসড়কে তাদের তৎপরতা খুব একটা চোখে পড়ে না। বিভিন্ন মহাসড়কে মাঝেমধ্যেই দুর্ঘটনায় তো বটেই, দুর্ঘটনা ছাড়াও যানবাহন বিকল হয়ে পড়ে। কিন্তু দেখা যায়, বিকল গাড়িটি সরাতে হাইওয়ে পুলিশের যুক্তিসংগত কোনো কারণ ছাড়াই কয়েক ঘণ্টা লেগে গেছে এবং ততক্ষণে মহাসড়কের দু'প্রান্তে ব্যাপক যানজটের সৃষ্টি হয়েছে। পরিবহন মালিকরা, বিশেষ করে তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন রপ্তানিপণ্য পরিবহনকারী ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান মালিকরা তো এমনও অভিযোগ করেন, রাতের বেলায় ডাকাতরা তাদের বহনকৃত মালপত্র লুটে নেওয়ার পর বহুবার অভিযোগ করেও হাইওয়ে পুলিশের তরফ থেকে কোনো প্রতিকার পাওয়া যায় না। এ নিয়ে তারা এমনকি গত কয়েক বছরে একাধিকবার ধর্মঘটও করেছেন; তারপরও অবস্থার খুব একটা পরিবর্তন যে ঘটেনি, সমকালের আলোচ্য শীর্ষ প্রতিবেদনই তার প্রমাণ।

আসলে সরকারকেই সমস্যাটি সমাধানে দ্রুত এগিয়ে আসা উচিত। তাদের মনে রাখতে হবে, অহরহ দুর্ঘটনার কারণে সড়ক-মহাসড়কে চলাচল এমনিতেই অনিরাপদ হয়ে পড়েছে। তার ওপর যদি ডাকাত ও ছিনতাইকারীর উৎপাত চলতে থাকে, তাহলে একসময় গোটা সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থায় অচলাবস্থা তৈরি হতে পারে। এতে শুধু যে যাত্রীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে তা নয়, এ খাতের ব্যবসায়ও স্থবিরতা নেমে আসবে। আর মহাসড়কে বিভিন্ন রপ্তানি পণ্যভর্তি কনটেইনার যদি লুট হতে থাকে, তাহলে একসময় দেশের অর্থনীতিও ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়বে। কারণ, এর ফলে সংশ্নিষ্ট পণ্যের সময়মতো জাহাজীকরণ অসম্ভব হবে, যা বিদেশে ওই পণ্যের বাজার হারানোর ঝুঁকি তৈরি করবে। এমন বিরূপ পরিস্থিতিতে সংশ্নিষ্ট ব্যবসায়ীরা এ ব্যবসা চালিয়ে যেতে নিরুৎসাহিত হবেন; দেশ হারাবে ওই রপ্তানি থেকে প্রাপ্য রাজস্ব ও মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা।