তৈরি পোশাকের বাণিজ্যে এখন রমরমা অবস্থা। প্রায় প্রতি মাসে ভাঙছে আগের মাসের রপ্তানি আয়ের রেকর্ড। গার্মেন্ট মালিকদের হাতে রপ্তানি আদেশের ঢল। চীন ও ভিয়েতনামের জন্য বিদেশি ক্রেতাদের বরাদ্দ রাখা রপ্তানি আদেশও এখন পাচ্ছে বাংলাদেশ।

সংশ্নিষ্টরা বলছেন, অনিরাপদ অবস্থা থেকে বাংলাদেশের পোশাক খাত এখন পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ কর্মপরিবেশ সৃষ্টি করেছে। কোনো কোনো বিদেশি ব্র্র্যান্ড এবং ক্রেতারা তো পোশাক খাতের উন্নয়নে বাংলাদেশ মডেল অনুসরণ করতে অন্যান্য দেশকে চাপ দিচ্ছে। পোশাক রপ্তানিতে ভিয়েতনামের মতো চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দেশে এ দেশের উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগের অনুরোধ জানাচ্ছে পশ্চিমা কয়েকটি ব্র্যান্ড।

তৈরি পোশাক খাতের এই ঘুরে দাঁড়ানোর পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে সাভারের রানা প্লাজা ট্র্যাজেডি। ৯ বছর আগের ওই দুর্ঘটনায় দেশে-বিদেশে বাংলাদেশের পোশাক খাতের সমালোচনার ঝড় ওঠে। নিরাপদ কর্মপরিবেশ না থাকার অভিযোগে জিএসপি সুবিধা স্থগিত করে এ দেশের তৈরি পোশাকের প্রধান ক্রেতা যুক্তরাষ্ট্র। একই সুবিধা স্থগিতের হুঁশিয়ারি আসে ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকেও। অনেক ক্রেতা বাংলাদেশ ছেড়ে যান।

তখন বাংলাদেশের পোশাক ব্যবহার না করার জন্য বিভিন্ন দেশে মিছিল, প্রচার-প্রচারণায় নামে গ্রিন গ্রোথ ক্যাম্পেইন, ইন্ডাস্ট্রিঅল গ্লোবাল ইউনিয়নসহ আন্তর্জাতিক অনেক শ্রমিক সংগঠন। খাদের কিনারে এসে ঠেকে ৪০ লাখ কর্মসংস্থান এবং রপ্তানি আয়ের ৮৫ ভাগ জোগানদাতা পোশাক খাত। এ রকম বৈরী বাস্তবতায় অপরিসীম ধৈর্য রেখেছেন উদ্যোক্তারা। ক্রেতাদের সব শর্ত বিনাবাক্যে মেনে নিয়েছেন। তাদের নতুন নতুন শর্ত পূরণে দিনের পর দিন বিনিয়োগ অব্যাহত রেখেছেন। নিরাপত্তা প্রশ্নে কঠোর অবস্থান নিয়েছে বিজিএমইএ। সমস্যা সমাধানের অযোগ্য ৬০০ কারখানা বন্ধ করে দেওয়া হয়।
উত্তর আমেরিকার ক্রেতাদের জোট অ্যালায়েন্স এবং ইউরোপের ক্রেতাদের জোট অ্যাকর্ডের তত্ত্বাবধানে শুরু হয় ব্যাপকভিত্তিক সংস্কার কার্যক্রম।

প্রথমে প্রতিটি কারখানা পরিদর্শনে দুর্বলতা চিহ্নিত করা হয়। এরপর এসব দুর্বলতা সারাতে কারখানাভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা নেওয়া হয়। বিনিয়োগের সক্ষমতা না থাকায় দ্বিতীয় দফায় আরও কিছু কারখানা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সংস্কার শুরুর পরও প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ ব্যয়ে অক্ষম আরও কিছু উদ্যোক্তার কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। সব মিলিয়ে প্রায় দেড় হাজার কারখানা বন্ধ হয়ে যায়। সংস্কার অগ্রগতি ধরে রাখতে উদ্যোক্তাদের নতুন প্ল্যাটফর্ম আরএমজি সাসটেইনেবিলিটি কাউন্সিলের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে ব্র্যান্ড এবং ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো। অ্যাকর্ড-অ্যালায়েন্সের তত্ত্বাবধানের বাইরের থাকা কারখানাগুলোর সংস্কারে সহযোগিতা দেয় আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা। এ রকম ব্যাপকভিত্তিক সংস্কার কার্যক্রমের সুবাদে বিশ্বের নিরাপদ পোশাক খাত হিসেবে স্বীকৃতি পায় বাংলাদেশের পোশাক খাত। এর ফলে ব্র্র্যান্ড এবং ক্রেতাদের আস্থা বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নে ডেনিম রপ্তানিতে বাংলাদেশ এখন শীর্ষে। ক্রেতাদের অবহেলা থেকে আকর্ষণীয় উৎসে পরিণত হয়েছে বাংলাদেশ।

বিজিএমইএর সহসভাপতি শহিদুল্লাহ আজিম সমকালকে বলেন, গার্মেন্ট মালিকদের হাতে এখন রপ্তানি আদেশের অভাব নেই। অ্যাডাম অ্যাপারেলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শহিদুল হক মুকুল জানান, তাদের কয়েকজন ক্রেতা ভিয়েতনামে কারখানা খুলতে অনেক দিন ধরে তার পিছু লেগে আছেন। রানা প্লাজা ধসের ঘটনা শেষ পর্যন্ত শাপে বর হয়েছে পোশাক খাতের।

আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি :নিরাপদ এবং উন্নত পরিবেশে পোশাক উৎপাদন ব্যবস্থাপনায় আন্তর্জাতিক নৈতিক মান নিরীক্ষা (এথিক্যাল অডিট) সূচকে প্রথম এবং দ্বিতীয় প্রধান রপ্তানিকারক দেশের তুলনায় এগিয়ে আছে বাংলাদেশ। তৈরি পোশাকের সরবরাহ চেইনে কমপ্লায়েন্স সেবাপ্রদানকারী চীনভিত্তিক প্রতিষ্ঠান কিউআইএমএর সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, সূচকে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের ওপরে রয়েছে তাইওয়ান। প্রতিদ্বন্দ্বী ভিয়েতনাম তৃতীয় এবং চীন রয়েছে সপ্তম অবস্থানে। নিরাপদ কর্মপরিবেশ, শ্রমিকদের বেতন-ভাতা, ছুটিসহ অন্যান্য সুবিধা এবং সামাজিক ও পরিবেশগত নিরাপত্তার ভিত্তিতে এ নিরীক্ষা করা হয়।

কিউআইএমএর স্বীকৃতির সমর্থন পাওয়া যায় মার্কিন গবেষণা প্রতিষ্ঠান ম্যাকেঞ্জির এক প্রতিবেদনে। তাদের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, কারখানার নিরাপদ পরিবেশ ও সরবরাহ চেইনে দায়িত্বশীলতা বিবেচনায় বাংলাদেশের পোশাক খাত এখন প্রথম সারির। পোশাক সরবরাহকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশ এখন সবচেয়ে আকর্ষণীয়।

২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল রাজধানীর অদূরে সাভারে রানা প্লাজা নামে একটি বহুতল ভবন ধসে পড়ে এক হাজার ১৩৮ শ্রমিক প্রাণ হারান। আহত হন আড়াই হাজার শ্রমিক। এ দুর্ঘটনাকে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম শিল্প দুর্ঘটনা হিসেবে মনে করা হয়। ওই দুর্ঘটনার পর নিরাপদ কর্মপরিবেশ না থাকার অজুহাতে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের পণ্যের শুল্ক্কমুক্ত প্রবেশ সুবিধা বাতিল করা হয়। এখন পর্যন্ত তা পুনর্বহাল হয়নি।

অবহেলায় শ্রমিকরা :পোশাক কারখানার অবকাঠামোতে উন্নয়ন হলেও শ্রমিকদের উন্নয়নে সে রকম পদক্ষেপ দেখা যায়নি। জাতীয় গার্মেন্টস শ্রমিক কর্মচারী লীগের সভাপতি সিরাজুল ইসলাম রনি বলেন, কর্মপরিবেশ আন্তর্জাতিক মানের হয়েছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে শ্রমিকের উন্নতি সে হারে হয়নি। মূল্যস্ম্ফীতির চাপে শ্রমিকরা কোণঠাসা। খাদ্যের মানের সঙ্গে আপস করে টিকে থাকার চেষ্টা করছেন তারা।