সারা বিশ্বে আলোচিত সাভারের রানা প্লাজার ট্র্যাজেডির ৯ বছর হলো রোববার। ভয়াবহ ভবন ধসের এ দিনটিকে ক্ষোভ আর কান্নায় স্মরণ করেছে হতাহতদের স্বজন-পরিজনসহ বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের নেতাকর্মীরা। নিহত শ্রমিকদের স্বজনরা চোখের জল আর বুকের ভেতরে জমে থাকা চাপা ক্ষোভ প্রকাশ করতেই যেন ছুটে এসেছেন রানা প্লাজার সামনে । 

৯ বছর পূরণ উপলক্ষ্যে ৫৪টি গার্মেন্টস শ্রমিক সংগঠন নিয়ে গঠিত- গার্মেন্টস শ্রমিক সমন্বয় পরিষদের উদ্যোগে রোববার সকাল ১০টায় ঘটনাস্থলে নির্মিত অস্থায়ী স্মৃতিস্তম্ভের সামনে শ্রমিক সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। 

আয়োজিত সমাবেশে গার্মেন্টস শ্রমিক সমন্বয় পরিষদের সাভার-আশুলিয়া, ধামরাই শিল্পাঞ্চল কমিটির আহ্বায়ক শ্রমিক নেতা রফিকুল ইসলাম সুজনের সভাপতিত্বে বক্তব্য রাখেন সমন্বয় পরিষদের কেন্দ্রীয় সদস্য সচিব শ্রমিক নেতা বীর মুক্তিযোদ্ধা আবুল হোসাইন, শ্রমিক নেতা নাহিদুল হাসান নয়ন, শামীম খান, কামরুন নাহার, অরবিন্দু বেপারী, কবির হোসেন, শাহা আলম হোসেন, পারভীন আক্তার, ইসমাইল হোসেন ঠাণ্ডু, কামরুল ইসলাম, আলমগীর শেখ লালন, সালাউদ্দিন খান, বাকের হোসেন প্রমুখ। 

সমাবেশে শ্রমিক নেতারা বলেন, ২৪ এপ্রিলকে শোক দিবস ঘোষণা করে হতাহত শ্রমিকদের উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ, স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ, শ্রমিক হত্যার বিচার, আহতদের সু চিকিৎসা, পুনর্বাসন, সোহেল রানাসহ দায়ী ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং নিরাপদ কর্মস্থল নিশ্চিত করতে হবে। এরপর সমন্বয় পরিষদের পক্ষ থেকে রানা প্লাজায় নিহত শ্রমিকদের স্মরণে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করে বিশেষ মোনাজাত করা হয়। 

৯ বছর উপলক্ষ্যে প্রতিবাদ সমাবেশ

এর আগে রানা প্লাজা ভবন ধসের নবম বছরে সকাল ৯ টায় স্মৃতিস্তম্ভে গার্মেন্টস শ্রমিক ফ্রন্ট, জি-স্কপ, শ্রমিক নিরাপত্তা ফোরাম এর পক্ষ থেকে শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন গার্মেন্টস শ্রমিক ফ্রন্ট-কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক সৌমিত্র কুমার দাশ। এ সময় বক্তব্য রাখেন গার্মেন্টস শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদ, জি-স্কপ এর কেন্দ্রীয় যুগ্ম সমন্বয়কারী আব্দুল ওয়াহেদ, এনসিসিডব্লিউ এর কেন্দ্রীয় সদস্য সচিব শাকিল আক্তার চৌধুরী, কেন্দ্রীয় নেতা আলী রেজা চৌধুরী তুহিন, আব্বাস উদ্দিন, আহমেদ জীবন, আনিসুর রহমান, খুশবু আহমেদ প্রমুখ। 

সভা থেকে বক্তারা বলেন, অবিলম্বে শ্রমিক হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে, নিহত শ্রমিক পরিবারকে আজীবন আয়ের সমান ক্ষতিপূরণ ৪৮ লাখ টাকা, আহত পঙ্গু শ্রমিকদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। একইসঙ্গে ২৪ এপ্রিলকে গার্মেন্টস শ্রমিক শোক দিবস ঘোষণা দেওয়ার দাবি জানানো হয়।

এদিকে রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির ৯ বছর পার হলেও এখনো সেদিনের ভয়ঙ্কর স্মৃতি তাড়া করে ফেরে প্রাণে বেঁচে যাওয়া শ্রমিকদের। উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ এবং চিকিৎসা সেবা না পেয়ে ফিরতে পারেননি স্বাভাবিক জীবনে। বেশিরভাগ শ্রমিকই দুর্বিষহ বেকার জীবন বয়ে বেড়াচ্ছেন। অন্যদিকে পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম স্বজন হারিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছে তাদের পরিবারের সদস্যরা। 

রানা প্লাজা সারভাইভার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মাহমুদুল হাসান হৃদয়। যিনি রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় হারিয়েছেন তার স্বাভাবিক কর্মক্ষমতা। মেরুদণ্ডের আঘাত, বুকের পাঁজর ভেঙে যাওয়াসহ ডান পা অবশ হয়ে গেছে তার। এখন দিনের বেশিরভাগ সময় কাটে ঘরে শুয়ে-বসে। ক্রাচে ভর দেওয়া ছাড়া উঠে দাঁড়ানোর শক্তিটুকুও আর অবশিষ্ট নেই তার।

সেদিন ভবন ধসের ২২ ঘণ্টা পর স্থানীয় কয়েকজন উদ্ধারকর্মী তাকে উদ্ধার করে বাইরে বের করে এনে সেনাবাহিনী সদস্যের হাতে তুলে দেয়। ওই অন্ধকার থেকে আলোতে বের হওয়ার পরপরই জ্ঞান হারান হৃদয়। সেখান থেকে তাকে প্রথমে সাভার সীমা জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়। প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে পঙ্গু হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। দীর্ঘ ১৭ দিন পর জ্ঞান ফিরলে ঢাকা মেডিকেল, সিআরপিসহ বেশ কয়েকটি হাসপাতালে প্রায় দুই বছর চিকিৎসা নেন তিনি। এখনও ওষুধের ওপরেই বেঁচে আছেন জানিয়ে হৃদয় বলেন, এভাবে আর কতদিন শরীরে অসহ্য যন্ত্রণা বয়ে বেড়ানো লাগবে তা কেবল উপরওয়ালাই জানেন। 

একটি শ্রমিক সংগঠনের ব্যানারে ভবন ধসের ঘটনায় আহত নিলুফাও এসেছিলেন নিজের দাবি এবং অধিকার আদায়ের জন্য। অস্থায়ী বেদীতে ফুল দিয়ে নিখোঁজ ও নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধাও জানিয়েছেন তিনি। কেমন আছেন জানতে চাইলে কান্না জড়িত কণ্ঠে বলতে থাকেন, ৯ বছর পূর্ণ হলো তবুও আমার উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ পেলাম না। টাকার অভাবে নিজের চিকিৎসা করাতে পারছি না, ওষুধ কিনে খেতে পারছি না। 

প্রায় ১০ ঘণ্টা ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে ছিলেন রানা প্লাজার ৫ তলার প্যান্টম অ্যাপারেলের সুইং অপারেটর হিসেবে কর্মরত নিলুফা বেগম। উদ্ধারের পর দীর্ঘ ৯ মাস হাসপাতালের বিছানায় কেটেছে তার। ভাঙা পায়ে ইনফেকশন নিয়েও ভবন ধসের ঘটনায় দোষীদের শাস্তির দাবি এবং ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের পুনর্বাসনের দাবিতে রোদে পুড়ে বিভিন্ন মিডিয়ায় বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছেন এই নারী। 

নিলুফা অস্থায়ী বেদীর সামনে দাঁড়িয়ে সমকালকে বলেন, আমার পায়ে আবার অপারেশন করতে হবে কিন্তু টাকা কে দিবে ? টাকার অভাবে পায়ের চিকিৎসা করাতে পারছি না । আমার এ পঙ্গুত্ব মেনে নিতে না পেরে স্বামীও  ৪ বছর আগে আমাকে ছেড়ে চলে গেছে। ফুটপাতে পান সিগারেট বিক্রি করে কোনরকমে জীবন চালাইতাছি । আবার পুলিশ মাঝে মাঝেই ফুটপাত থ্যাইকা দোকান ওঠায়া দেয় । এভাবে আর জীবন চলে না। যারা মারা গেছে তারাতো বাঁইচা গেছে আর আমরা যারা আহত হইয়া বাঁইচা আছি তারা বাঁইচাও মইরা আছি। রানা প্লাজার ফাঁকা জায়গায় আমাগো মতো আহত শ্রমিকদের সরকার দোকানপাট কইরা দিক তাইলেও আমরা বাঁচতে পারুম ।  

৯ বছর ধরে মায়ের ঝাপসা স্মৃতিকে আকড়ে ধরে প্রতি বছরই মায়ের আত্মার শান্তির জন্য বাবা এবং নানির সঙ্গে রানা প্লাজার অস্থায়ী বেদীতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়ে আসছে ১২ বছরের কিশোর আলিম। রানা প্লাজার ধসের সময় তার বয়স ছিলো আড়াই বছর। 

রানা প্লাজার কাঁটাতারের ফাঁক দিয়ে অপলক তাকিয়ে থাকা কিশোর আলিফ জানায়, তার মা মর্জিনা আক্তার সিনিয়র অপারেটর হিসেবে কর্মরত ছিলেন রানা প্লাজার প্যান্টম অ্যাপারেলস কারখানায়। ভবন ধসের ঘটনায় তার মায়েরও মৃত্যু হয়। ১৮ দিন পরে মরদেহ বুঝে পায় তার পরিবার। এরপর থেকে প্রতি বছরই এই দিনে রানা প্লাজার সামনে ছুটে আসে সে। হাতড়ে বেড়ায় মায়ের ঝাপসা স্মৃতি। মায়ের ছবিটাও এখন তার চোখে মলিন হতে চলেছে। তাই ফ্যাল ফ্যাল করে অশ্রুসিক্ত নয়নে চেয়ে থাকে ধ্বংসস্তুপের সেই ফাঁকা জায়গাটির দিকে।

তার মতো স্বজন হারানো ব্যক্তিদের কান্নায় ভাড়ি হয়ে উঠে রানা প্লাজার আকাশ-বাতাস। সকলেরই দাবি উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ, সুচিকিৎসা, পুনর্বাসন এবং দোষীদের শাস্তি নিশ্চি করা।