অনলাইনে ট্রেনের টিকিট লটারির মতো। শুধু ভাগ্য ভালো হলেই তা পাওয়া যায়। ঠিক সকাল ৮টায় অনলাইন লাইভ হওয়ার প্রথম সেকেন্ডে যে এক-দেড় লাখ মানুষ ওয়েবসাইটে ঢুকতে পারেন, কেবল তারাই টিকিট পান। গতকাল রোববার প্রথম সেকেন্ডে অন্তত পাঁচ লাখ মানুষ ওয়েবসাইটে প্রবেশের চেষ্টা করেন। ওই নির্দিষ্ট মুহূর্তে যাদের ইন্টারনেট গতি ভালো ছিল, তারা সেকেন্ডের ভগ্নাংশ সময় এগিয়ে থাকার সুবাদে ওয়েবসাইটে ঢুকতে পারেন। বাকিরা পড়ে যান 'কিউ ম্যানেজমেন্টে' অর্থাৎ অপেক্ষমাণের লাইনে।

ট্রেনের টিকিট বিক্রির দায়িত্বে থাকা সহজ লিমিটেডের মুখপাত্র ফরহাত আহমদ সমকালকে এসব তথ্য জানিয়েছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ঢাকা থেকে যাত্রা করা ট্রেনের মাত্র ১২ হাজার ১৫৭টি আসনের টিকিট অনলাইনে দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু ২০ লাখের বেশি মানুষ টিকিট পেতে চেষ্টা করছেন। চাহিদার তুলনায় আসন সংখ্যা নগণ্য হওয়ায় এক শতাংশেরও কম মানুষ টিকিট পাচ্ছেন। বাকিরা খালি হাতে ফিরছেন। টিকিট পাওয়া অনেকটা লটারির মতো হয়ে গেছে।

গতকাল বিক্রি করা হয় ২৮ এপ্রিলের ঈদযাত্রার ট্রেনের টিকিট। আগের দিনের মতো গতকালও উপচে পড়া ভিড় ছিল স্টেশনগুলোয়। গত শনিবার দুপুরে লাইনে দাঁড়িয়েও বহু মানুষ টিকিট পাননি। ঈদে বাড়ি ফেরার টিকিট পেতে বহু মানুষ কাঁথা-বালিশ নিয়ে রাতভর অপেক্ষায় ছিলেন কমলাপুরে। তাদের অনেকেই খালি হাতে ফিরেছেন, টিকিট না থাকায়।

গত শনিবার বিকেল ৪টায় কমলাপুরের পাঁচ নম্বর কাউন্টারের সামনে কথা হয় রংপুর এক্সপ্রেসের টিকিটের প্রত্যাশায় লাইন ধরা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী দাইয়ান সাফির সঙ্গে। টিকিট বিক্রি শুরুর ১৬ ঘণ্টা আগে তিনি লাইনে দাঁড়ান। তার সিরিয়াল ছিল ১২৭। দাইয়ান গতকাল রোববার দুপুরে সমকালকে টেলিফোনে জানান, তিনি এসির টিকিট পাননি। লাইনের শুরুতে থাকা ২০-২৫ জনকে দেওয়ার পর কাউন্টার থেকে বলা হয়, এসির টিকিট শেষ। তাই বাধ্য হয়ে শোভন চেয়ারের টিকিট নিয়েছেন। ৮টা থেকে তিন ঘণ্টা লাগে কাউন্টার পর্যন্ত যেতে।

কমলাপুর থেকে দেওয়া রংপুর, রাজশাহী ও খুলনা বিভাগের ট্রেনগুলোর টিকিটের চাহিদাই সবচেয়ে বেশি। যাত্রীরা বলছেন, উত্তরবঙ্গে সড়কের অবস্থা বেহাল, বাসে যেতে খুব কষ্ট। আর দক্ষিণবঙ্গের যাত্রীরা বলছেন, পদ্মা পারাপারের ফেরিতে খুব ভোগান্তি। তাই ট্রেনেই যেতে চান। আগের দিনের মতো গতকালও দেখা যায়, যারা শনিবার রাতের মধ্যে লাইন ধরেছেন শুধু তারাই টিকিট পাচ্ছেন। গতকাল যারা লাইনে দাঁড়িয়েছেন তারা টিকিট পাচ্ছেন না।

যাত্রীরা আগের দিনের মতো গতকাল অভিযোগ করেন, কালোবাজারি করতে টিকিট সরিয়ে ফেলছেন রেলওয়ের কর্মীরা। ভিআইপিদের জন্য এসি টিকিট সব 'বুকিং' করে রাখা হচ্ছে। সাধারণ মানুষ পাচ্ছে না। তবে রেলওয়ে এসব অভিযোগ নাকচ করেছে। কমলাপুর স্টেশনের ম্যানেজার মাসুদ সারোয়ার বলেছেন, কমলাপুর, বনানী, তেজগাঁও, বিমানবন্দর ও ফুলবাড়িয়া- এই পাঁচটি স্টেশনের কাউন্টারে ১৫ হাজার ৬৯৬টি আসনের টিকিট রয়েছে। কিন্তু টিকিট কিনতে লাখ লাখ মানুষ আসছেন। আসন সীমিত হওয়ায় ৯৫ শতাংশ মানুষই টিকিট পাচ্ছেন না। একজন যাত্রী যদি চারটি করে টিকিট নেন, তাহলে মাত্র যে চার হাজার মানুষ আগে এসেছেন, তারাই টিকিট পাচ্ছেন।

টিকিট সরিয়ে ফেলা বা ভিআইপিদের জন্য বুক করে রাখার অভিযোগ নাকচ করে রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন) সরদার সাহাদাত আলী সমকালকে বলেন, টিকিট ব্লক করার সুযোগই নেই। রেলের কর্মীদের জন্য দুই শতাংশ ছাড়া আর কোনো কোটা নেই।

অনলাইনে টিকিটের চেষ্টা করে ব্যর্থ হওয়া জহিরুল ইসলাম সমকালকে জানিয়েছেন, ঠিক সকাল সাতটা ৫৯ মিনিট ৫৯ সেকেন্ডে ওয়েবসাইটে ঢোকার চেষ্টা করেন। কিন্তু পারেননি। আটটা ২৬ মিনিট পর্যন্ত ওয়েবসাইট কাজ করছিল। তখন ঢুকতে পারলেও, অপেক্ষা করার বার্তা আসে। পরে অপেক্ষমাণ থেকে টিকিট বাছাই অপশন পর্যন্ত যেতে পারেন। কিন্তু ততক্ষণে সব টিকিট শেষ।

সহজ মুখপাত্রের দাবি, এক সেকেন্ডের জন্যও তাদের সার্ভার ডাউন হয়নি। তিনি সমকালকে বলেছেন, অবিশ্বাস্য হলেও সত্য ঠিক সকাল আটটায় চোখের পলকে লাখ লাখ মানুষ ওয়েবসাইটে ঢোকেন। সাইট যেন ডাউন না হয়, সে কারণেই নির্দিষ্ট সংখ্যক ব্যবহারকারীকে ঢুকতে দেওয়া হয়, যা নতুন প্রযুক্তি। এ কারণে এবারের ঈদে এখন পর্যন্ত সার্ভার ডাউন হয়নি।

অনলাইনের মতো কাউন্টারেও টিকিট পেতে বিলম্ব হচ্ছে। প্রতিটি টিকিট প্রিন্ট দিতে তিন থেকে চার মিনিট লাগছে। এ কারণে টিকিট দিতে দুপুর গড়িয়ে যাচ্ছে। স্টেশন ম্যানেজাররা বলেছেন, পরিচয়পত্রের নম্বর ইনপুট দিয়ে টিকিট প্রিন্ট দেওয়া হচ্ছে। সে কারণে কিছুটা বাড়তি সময় লাগছে।

আজ সোমবার সকাল আটটা থেকে দেওয়া হবে ২৯ এপ্রিলের ট্রেনের টিকিট। কিন্তু গতকাল বিকেলে লাইন ধরা শুরু হয়। বিকেল চারটার দিকে কমলাপুরে দেখা যায়, দুই ব্যক্তি এক শিশুকে ২০০ টাকা দিয়ে লাইনে দাঁড় করাচ্ছে। ওই দুই ব্যক্তি কথা না বললেও হৃদয় নামের শিশুটি সমকালকে জানায়, সে অন্যের হয়ে লাইনে দাঁড়ায়। সারারাত লাইনে থাকবে। এর জন্য দুই-চারশ' টাকা যে যা দেয়, তাই নেয়।

বনানী থেকে নেত্রকোনা, মোহনগঞ্জ, বিমানবন্দর থেকে চট্টগ্রাম ও নোয়াখালী এবং ফুলবাড়িয়া পুরাতন স্টেশন থেকে কিশোরগঞ্জ, সিলেটের ট্রেনের টিকিট বিক্রি হচ্ছে। বনানী, তেজগাঁওয়ে কমলাপুরের মতোই ভিড় হলেও ফুলবাড়িয়াতে খুব একটা চাপ ছিল না।