রানা প্লাজা ধসে ১১শর বেশি পোশাক শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনায় করা দুটি মামলার বিচার শেষ হয়নি ৯ বছরেও। দুটি মামলায় ২০১৬ সালে আসামিদের বিরুদ্ধে পৃথক অভিযোগ (চার্জ) গঠন করেন ঢাকার আদালত; কিন্তু বিচারে কোনো অগ্রগতি হয়নি।

২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল ভবন ধসের পর দিন সাভার থানা পুলিশ অবহেলাজনিত মৃত্যুর অভিযোগ এনে রানা প্লাজার মালিক সোহেল রানাসহ ২১ জনকে আসামি করে একটি মামলা করে। এ মামলায় ৫৯৪ জন সাক্ষীর মধ্যে মাত্র একজনের সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ হয়েছে। এ ছাড়া ২০১৫ সালের রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ইমারত নির্মাণ আইনে ১৩ জনকে আসামি করে আরও একটি মামলা করে। এর কার্যক্রম এখনও স্থগিত।

গত ৩১ জানুয়ারি হত্যা মামলায় সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু হলেও ভবন নির্মাণে অনিয়মের অভিযোগে করা মামলার বিচার এখনও হাইকোর্টের নির্দেশে স্থগিত। হত্যা মামলার প্রধান আসামি সোহেল রানা ছাড়া সব আসামিই জামিনে বা পলাতক।

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের ভাষ্য, আসামিরা নানাভাবে বিচার বাধাগ্রস্ত করছেন। একই মামলায় কিছু আসামি পৃথকভাবে বিচারিক আদালতের বিভিন্ন পর্যায়ের আদেশ চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্ট থেকে দফায় দফায় স্থগিতাদেশ নিয়ে নিচ্ছেন। ফলে দুটি মামলার বিচারই থমকে রয়েছে। তা ছাড়া করোনা সংক্রমণ পরিস্থিতির কারণেও প্রায় দুই বছর বিচারিক আদালতের কার্যক্রমে স্থবিরতা ছিল। বিচারে দীর্ঘসূত্রতার কারণে সাক্ষীদের অনেককেই এখন তাদের ঠিকানায় পাওয়া যাচ্ছে না।

হত্যা মামলার তদন্ত শেষে ২০১৫ সালের এপ্রিলে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ভবন মালিক, গার্মেন্ট মালিক, সরকারি কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন স্তরের ৪১ জনের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত হত্যার অভিযোগ এনে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে। পরে ২০১৬ সালের ১৮ জুলাই আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন ঢাকার বিচারিক আদালত।

এর পর চার্জ গঠনের ওই আদেশের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিল করেন ৮ আসামি। পরে হাইকোর্টের স্থগিতাদেশের কারণে প্রায় ৫ বছর হত্যা মামলার বিচারকাজ ঢাকার আদালতে বন্ধ ছিল। দীর্ঘ অপেক্ষার পর হাইকোর্টের স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার হলে গত ৩১ জানুয়ারি সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু হয়। তবে সাভারের সাবেক কাউন্সিলর মোহাম্মদ আলী হোসেনের আপিল এখনও উচ্চ আদালতে বিচারাধীন।

জানতে চাইলে বিচারিক আদালতে রাষ্ট্রপক্ষের ভারপ্রাপ্ত পাবলিক প্রসিকিউটর বিমল সমাদ্দার সমকালকে বলেন, গত ২৯ জানুয়ারি হত্যা মামলার বিচারকাজ শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে মামলার বাদী ও প্রধান সাক্ষী সাভার থানার তৎকালীন এসআই ওয়ালী আশরাফ খান সাক্ষ্য দিয়েছেন। আগামী ২৯ মে মামলার দুই থেকে পাঁচ নম্বর সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণের জন্য দিন ধার্য রয়েছে।

তিনি জানান, এই সাক্ষীদের এর আগেও দুই দফা সমন জারি করা হয়েছিল, কিন্তু দুই নম্বর সাক্ষী ছাড়া আর কেউ আসেননি। দীর্ঘদিন বিচারকাজ বন্ধ থাকায় সাক্ষীদের হাজির করাই এখন এই মামলার বিচারে বড় সমস্যা। রাষ্ট্রপক্ষ থেকে সাক্ষীদের হাজির করার জন্য সব ধরনের তৎপরতা চলছে।

আদালত সূত্র জানায়, চার্জভুক্ত ৪১ আসামির মধ্যে দু'জন মারা গেছেন। মামলার প্রধান আসামি সোহেল রানা কারাগারে এবং ৩২ জন জামিনে ও ৬ জন পলাতক আছেন।

অন্যদিকে রানা প্লাজা নির্মাণে অনিয়মের অভিযোগে করা মামলায় ২০১৬ সালের জুনে ভবন মালিক সোহেল রানাসহ ১৮ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন ঢাকার অতিরিক্ত মুখ্য বিচারিক হাকিম আদালত। মামলায় সাক্ষী করা হয়েছে ১৩৫ জনকে। পরে চার্জ গঠনের ওই আদেশের বিরুদ্ধে বজলুস সামাদ আদনানসহ তিন আসামি ঢাকার জেলা ও দায়রা জজ আদালতে পৃথক তিনটি আবেদন করেন।

এ বিষয়ে সংশ্নিষ্ট আদালতে রাষ্ট্রপক্ষের অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর আনোয়ারুল কবির বাবুল সমকালকে বলেন, 'আসামিদের করা তিনটি রিভিশন আবেদনের মধ্যে দুটি উচ্চ আদালতে নিষ্পত্তি হয়েছে। তবে সাভারের সাবেক মেয়র আসামি রেফাতুল্লাহর আবেদনে হাইকোর্ট এক বছরের জন্য এই মামলার বিচারকাজে স্থগিতাদেশ দিয়েছেন। এর মেয়াদ আগামী ৭ নভেম্বর শেষ হবে। এ পর্যায়ে রাষ্ট্রপক্ষ থেকে হাইকোর্টের ওই স্থগিতাদেশ প্রত্যাহারের জন্য আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে।

এদিকে দুটি মামলার প্রধান আসামি সোহেল রানা বিভিন্ন পর্যায়ে বিচারিক আদালত থেকে শুরু করে হাইকোর্টে দফায় দফায় জামিনের জন্য চেষ্টা চালিয়েছেন। তবে হত্যা মামলায় তার জামিন হয়নি এখনও।