কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়ায় দেশের সর্ববৃহৎ ঈদ জামাতকে কেন্দ্র করে জেলা পুলিশের ছুটি বাতিল করা হয়েছে। ২০১৬ সালে ৭ জুলাই জঙ্গি হামলা ও মাঠের সার্বিক নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে ছুটি বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। বৃহত্তম এই জামাতকে কেন্দ্র করে শুক্রবার থেকে কিশোরগঞ্জ শহরের আবাসিক হোটেল, ছাত্রাবাসসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পুলিশ তল্লাশি ও বিশেষ নজরদারি করছে। ইতোমধ্যে শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দানে পুলিশের একটি দল অস্থায়ী ক্যাম্প তৈরি করে মাঠের সার্বিক নিরাপত্তার দায়িত্ব নিয়েছে।

পুলিশ সুপার মো. মাশরুকুর রহমান খালেদ বিপিএম সমকালকে জানান, মাঠের নিরাপত্তার জন্য বোমা শনাক্ত ও নিষ্ক্রিয়করণ দল শোলাকিয়া মাঠে মেটাল ডিটেক্টরের সাহায্যে বিশেষ অনুসন্ধান চালাবে। এছাড়া এবার ড্রোন সিকিউরিটির মাধ্যমে মাঠ ও আশপাশের এলাকায় বিশেষ নজরদারি করা হবে। পাশাপাশি শোলাকিয়া ময়দান ও আশপাশ সিসি ক্যামেরায় আওতায় আনা হয়েছে। সিসি ক্যামেরায় কঠোর নজরদারি করা হবে।  

তিনি জানান, পাঁচ প্লাটুন বিজিবির পাশাপাশি মাঠে আর্মস পুলিশ ব্যাটালিয়নের সদস্যরা প্রস্তুত থাকবে। যাতে নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে থেকে দেশের দূর দূরান্ত থেকে আসা মুসল্লিরা নির্বিঘ্নে নামাজ আদায় করতে পারেন। এছাড়া হ্যান্ড মেটাল ডিটেক্টর নিয়ে মাঠের ২৮টি প্রবেশ পথে নিরাপত্তা কর্মীরা শরীর তল্লাশি করে মাঠে মুসল্লিদের ঢোকার ব্যবস্থা করবে। ঈদের আগের দিন থেকে শহরে সব ধরনের যান চলাচল বন্ধ রাখা হবে। এর পাশাপাশি পুলিশের গোয়েন্দা সংস্থা ও র‌্যাব সদস্যরা বিশেষ নজরদারি করবেন। 

তিনি বলেন, প্রতি বছরই নিরাপত্তার বিষয়টি মাথায় রেখে জেলা পুলিশ কঠোর নিরাপত্তার জন্য এ কাজগুলো করে থাকে। তবে এ বছর লোকজনের সমাগম বেশি হবে এমন ধারণা থেকে নিরাপত্তার ব্যবস্থা আরও জোরদার করা হয়েছে।

শোলাকিয়া ঈদগাহ মাঠ ও আশপাশের এলাকায় পুলিশি টহল  

জেলা প্রশাসন ও ঈদগাহ মাঠ কমিটি সূত্রে জানা গেছে, প্রতি বছরের মতো এ বছরও দেশের বৃহত্তম ঈদুল ফিতরের জামাত অনুষ্ঠিত হবে কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক শোলাকিয়ার ঈদগাহ মাঠে। এবার ১৯১তম ঈদের জামাতে ইমামতি করবেন বিশিষ্ট ইসলামিক চিন্তাবিদ মাওলানা ফরিদ উদ্দিন মাসঊদ। সকাল ১০টায় ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হবে। জামাত শুরুর সাত, পাঁচ ও এক মিনিট আগে বন্দুকের ফাঁকা গুলির আওয়াজ করে সংকেত দেয়া হবে।

এই জামাতকে কেন্দ্র করে এবারও কিশোরগঞ্জে ব্যাপক প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। অপরূপ সাজে সাজানো হয়েছে মাঠ ও আশপাশের এলাকা। ঈদ উদযাপন উপ-কমিটি, পৌর কর্তৃপক্ষ, বিভিন্ন সরকারি সংস্থা ও প্রশাসনের উদ্যোগে যথাযথ ব্যবস্থা ইতিমধ্যে গ্রহণ করা হয়েছে। মাঠ পরিস্কার পরিচ্ছন্ন, মাঠের মেহরাবের চুনকাম, মাঠে দাগ কাটার কাজ, অজুখানা পরিষ্কার, নলকূপ বসানোর কাজসহ অন্যান্য কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন শোলাকিয়া ঈদগাহ মাঠ ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য সচিব, সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আবদুল্লাহ আল মাসউদ।

মুসল্লিদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা

মাঠ কমিটির সভাপতি ও জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ শামীম আলম জানান, করোনা অতিমারির সংক্রমণ কমে যাওয়ায় এবার ঐতিহাসিক শোলাকিয়ায় এশিয়ার সর্ববৃহৎ ঈদের জামাতে মুসুল্লির সংখ্যা যেকোনো বছরের তুলনায় অনেক বেশি হবে। এ বছর লোকজনের সমাগম বেশি হবে এমন ধারণা থেকে নিরাপত্তার ব্যবস্থা আরও জোরদার করা হয়েছে। শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠানের জন্য যাবতীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে। ঈদের আগের দিন নামাজ আদায়ের জন্য দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আগত মুসল্লিদের থাকা-খাওয়া ও ইফতার আয়োজনেরও ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে মাঠের সার্বিক নিরাপত্তার জোরদার করা হয়েছে। সবকটি চেক পোস্টে ২৫ জন নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেটের নেতৃত্বে মোবাইল টিম নিরাপত্তার ব্যাপারে কাজ করবে। এছাড়া বিজিপির জন্য সংশ্লিষ্ট বিভাগে পত্র দেওয়া হয়েছে।

এদিকে, এই জামাত উপলক্ষে কিশোরগঞ্জ শহরবাসীর মধ্যেও বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনা লক্ষ্য করা গেছে। শহরের বিভিন্ন সড়কে ঈদকে স্বাগত জানিয়ে বড় বড় তোরণ নির্মাণ এবং সড়ক দ্বীপগুলো বর্ণিল ব্যানারে সাজানো হয়েছে।

দুটি বিশেষ ট্রেন

বাংলাদেশ রেলওয়ে জানিয়েছে, শোলাকিয়ায় নির্বিঘ্নে মুসুল্লিদের আসা-যাওয়ার সুবিধার্থে বাংলাদেশ রেলওয়ে দুটি বিশেষ ট্রেনের ব্যবস্থা করেছে। শোলাকিয়া স্পেশাল সার্ভিস নামে একটি ট্রেন ময়মনসিংহ রেল স্টেশনে থকে ঈদের দিন সকাল ৫টা-৫৫ মিনিটে ছেড়ে সকাল ৯ট-৫মিনিটে কিশোরগঞ্জ পৌঁছবে। অন্যটি ভৈরব থেকে সকাল ৬টায় ছেড়ে সকাল পৌনে ৯টায় কিশোরগঞ্জ পৌঁছবে। উভয় ট্রেন দুটি দুপুর ১২টায় কিশোরগঞ্জ থেকে ভৈরব ও ময়মনসিংহের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যাবে।   

উল্লেখ্য, ১৮২৮ সালে শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দানে প্রথম ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়। সাত একর জমির ওপর মূল ঈদগাহটি প্রতিষ্ঠিত হলেও স্থান সংকুলানের অভাবে মাঠের চারপাশের খালি-জায়গা, বসতবাড়ির আঙিনা এবং রাস্তাঘাটে অগণিত মুসল্লিকে নামাজ আদায় করতে হয়। এবার দেশ-বিদেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে সাড়ে তিন লাখ ধর্মপ্রাণ মুসল্লি জামাতে অংশ নেবেন বলে কমিটির লোকজন ধারণা করছেন।