বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক ও আদিবাসী বিষয়ক সংসদীয় ককাসের সভাপতি ফজলে হোসেন বাদশা ‘সেচের পানির জন্য আত্মহত্যা’ করা দুই কৃষকের বাড়ি গিয়েছেন। আজ সোমবার সকালে রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার নিমঘুটু গ্রামে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সাঁওতাল সম্প্রদায়ের দুই কৃষকের বাড়ি গিয়ে অবশ্য কাউকে পাননি। 

এ সময় ‘গোদাগাড়ীর নিমঘুটুতে এখনো সন্ত্রাস চলছে’ মন্তব্য করে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘আদিবাসীরা কেমন আছে, তাদের নিরাপত্তা কতটুকু সেটা দেখার জন্য আজ এসেছিলাম। আমরা এসপিকে জানিয়ে এসেছি। থানাকেও জানানো হয়েছে। কিন্তু গ্রামে এসে দেখছি আদিবাসীশূন্য। তার মানে কী? তার অর্থ হচ্ছে এখানে সন্ত্রাস চলছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘দুই কৃষকের মৃত্যু, এখানেই শেষ না। যারা বেঁচে আছে তাঁদের ওপরে চলছে সন্ত্রাসী প্রভুত্ব। এই প্রভু কারা? যাদের প্রজা হয়ে গ্রামে আদিবাসীদের বসবাস করতে হচ্ছে তাঁরা কারা? তাদের চিহ্নিত করতে হবে। এটা মনে করার কোনো কারণ নেই যে, কোনো কিছু করে সাহায্য সংস্থার নামেই হোক, আর প্রশাসনিক ব্যবস্থার নামেই হোক, আদিবাসীদের ওপরে যে ত্রাস চলবে- সেটা হবে না।’

বোরো ধানের জমিতে পানি না পেয়ে গত ২৩ মার্চ গোদাগাড়ীর নিমঘুটু গ্রামের কৃষক অভিনাথ মারান্ডি ও তার চাচাতো ভাই রবি মারান্ডি বিষপান করেন বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। সেদিনই অভিনাথ বাড়িতে মারা যান। এ নিয়ে পুলিশ সাদা কাগজে অভিনাথের স্ত্রী রোজিনা হেমব্রমের সই নিয়ে একটি অপমৃত্যুর মামলা করে। বিষয়টি জানতে পেরে ২৫ মার্চ রোজিনা থানায় যান বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিএমডিএ) গভীর নলকূপ অপারেটর সাখাওয়াত হোসেনের বিরুদ্ধে আত্মহত্যার প্ররোচনার মামলা করতে।

কিন্তু পুলিশ মামলা না নিয়ে তাকে দীর্ঘ সময় বসিয়ে রাখে। খবর পেয়ে সেদিন থানায় যান রাজশাহী-২ (সদর) আসনের সাংসদ ফজলে হোসেন বাদশা। এরপর মামলা রেকর্ড করা হয়। এ দিনই আরেক কৃষক রবি মারান্ডি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। সেদিন ফজলে হোসেন বাদশা দুই কৃষকের বাড়িতেই গিয়েছিলেন। তাদের আত্মহত্যার বিচারের জন্য তিনি জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যানের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেন। কিন্তু সোমবার তিনি নিমঘুটুতে পরিবার দুটিকে পেলেন না। তিনি প্রতিবেশী এবং ঘটনাস্থলে আসা পুলিশের একটি দলের সঙ্গে সার্বিক বিষয়ে কথা বলেন।

গোদাগাড়ীর নিমঘুটু গ্রামেই তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘কেউ নিজের ইচ্ছায় নিজের বাড়ি থেকে অন্যত্র চলে যায় না। যেদিন দুই কৃষক মারা যান, সেদিন মামলা করতে আমরা থানায় গিয়েছিলাম। এই গ্রামের চেয়ারম্যান যাননি তো। সেই মামলা তো আমরা থানায় দিয়ে এসেছিলাম। সেটার চার্জশিট হয়েছে। পোস্টমর্টেম রিপোর্ট হয়েছে। মানবাধিকার কমিশনে আমরা মিটিং করেছি। কমিশনের চেয়ারম্যান বলেছেন, পোস্টমর্টেম রিপোর্ট দেওয়া হবে। তার একদিনের মধ্যে রিপোর্ট দেওয়া হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘যারা আদিবাসীদের দাস বানিয়ে রাখছে তাদের আমরা যেন প্রতিহত করতে পারি। তবে আইন হাতে তুলে নেব না। যারা মনে করছে নিমঘুটু গ্রামই একটা রাষ্ট্র, তারা ভুল করছে। তারা ধূলিসাৎ হয়ে যাবে। পুলিশকে জানিয়েছি, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়-মানবাধিকার কমিশনকে জানাব। আদিবাসীরা ভালো নেই। তারা সুখে নেই। আদিবাসীদের জীবন এখনো নিরাপদ নয়। এই দেশের সংখ্যালঘু জাতিসত্তা সুখে নেই। এর নিরাপত্তা বিধান না করা হলে সারাদেশে প্রতিবাদের ঝড় উঠবে। সারাদেশ নিমঘুটু হয়ে যাবে। তখন বোঝা যাবে আগুন নিয়ে খেলা ঠিক নয়।’

ফজলে হোসেন বাদশা আরও বলেন, ‘এই গ্রামে আসামিপক্ষের সমর্থক কিছু আছে বলেই এই ঘটনাগুলো ঘটছে। তবে সত্য কি তা প্রমাণ করার দায়িত্ব এই এলাকার জনপ্রতিনিধিদের। যারা আসামিপক্ষের হয়ে কাজ করছেন তাদের বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। আমি মনে করি এর দায় হচ্ছে বিএমডিএ’র। তাদের ব্যবস্থাপনা পাম্প চালককে তৈরি করেছে। তাকে দুর্বৃত্ততে পরিণত করেছে। অতএব তারা দায় এড়াতে পারে না। সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়েই বিষয়গুলো জানানো হবে।’

উল্লেখ্য, দুই কৃষকের আত্মহত্যার ঘটনায় পরিবারের পক্ষ থেকে দুটি আত্মহত্যার প্ররোচনার মামলা করা হয়। দুটি মামলাতেই একমাত্র আসামি গভীর নলকূপ অপারেটর সাখাওয়াত হোসেন। ঘটনার ১১ দিন পর পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠিয়েছে। সম্প্রতি দুই কৃষকের মরদেহের ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুজনেরই মারা গেছেন একই ধরনের বিষপান করে। এরপর পুলিশ সাখাওয়াত হোসেনের বিরুদ্ধে আদালতে একটি মামলার অভিযোগপত্র দাখিল করেছে। অন্য মামলাটিরও অভিযোগপত্র প্রস্তুত হচ্ছে। ঈদের পর সেটিও দাখিলের কথা রয়েছে।