ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের (ইআরএল) জ্বালানি তেল পরিশোধন, মজুত ও সংরক্ষণ ক্ষমতা বাড়াতে ২০১৫ সালে নেওয়া হয় একটি প্রকল্প। কিন্তু গত সাত বছরেও শেষ হয়নি দেশের একমাত্র সরকারি তেল শোধনাগার প্রতিষ্ঠানটির ওই কাজ। এরই মধ্যে কয়েক দফায় সংশোধনের কারণে বেড়ে গেছে এর ব্যয়।

তৃতীয় দফায় প্রকল্পটির ব্যয় ও সময় ফের বাড়াতে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে পরিকল্পনা কমিশনে। এতে প্রকল্পের মোট ব্যয় বাড়িয়ে ৭ হাজার ১২৫ কোটি টাকার প্রস্তাব করা হয়েছে। এটি প্রথম অনুমোদন হওয়া মূল প্রকল্প ব্যয়ের চেয়ে ২ হাজার ১৮৯ কোটি টাকা বেশি।

ইস্টার্ন রিফাইনারির পরিশোধন ক্ষমতা ১৫ লাখ টন থেকে ৪৫ লাখ টনে উন্নীত করা এবং পরিশোধিত তেল মজুত ও সংরক্ষণ ক্ষমতা বাড়ানোর উদ্দেশ্যে 'ইনস্টলেশন অব সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) উইথ ডাবল পাইপলাইন' নামের ওই প্রকল্পটি নেওয়া হয়। ইতোমধ্যে দুই দফায় প্রকল্পটির ব্যয় বাড়ানো হয়েছে ১ হাজার ৬৩২ কোটি টাকা।

পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, ২০১৫ সালে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) অনুমোদন হওয়ার সময় প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয় ৪ হাজার ৯৩৬ কোটি টাকা। ওই বছরই শুরু হয়ে ২০১৮ সালে প্রকল্পটির কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। নির্ধারিত তিন বছরে শেষ না হওয়ায় ২০১৮ সালে প্রথম সংশোধনীর মাধ্যমে এর মেয়াদ এক বছর বাড়ানো হয়।

তবে বর্ধিত মেয়াদেও কাজ শেষ না হওয়ায় ২০১৯ সালে দ্বিতীয় সংশোধনীর মাধ্যমে তা ২০২২ সাল পর্যন্ত বাড়ানো হয়। ব্যয় ধরা হয় ৬ হাজার ৫৬৮ কোটি টাকা। কিন্তু ওই সময়ের মধ্যেও কাজ শেষ করা সম্ভব হয়নি। এবার তৃতীয় সংশোধনীর প্রস্তাবে সময় চাওয়া হয়েছে আরও এক বছর। প্রস্তাবনা অনুসারে কাজ চলবে ২০২৩ সাল পর্যন্ত।

প্রকল্প সংশোধন নিরুৎসাহিত করার নির্দেশনা আছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার। এরপরও তৃতীয় দফায় সংশোধনের সুপারিশ করেছে পরিকল্পনা কমিশন। এ দফা অনুমোদন পেলে তিন বছরের প্রকল্পে সময় লাগছে আট বছর। আগামীকাল মঙ্গলবার একনেক বৈঠকে অনুমোদনের জন্য সংশোধিত প্রকল্প প্রস্তাব উপস্থাপন করা হবে। একনেক চেয়ারপারসন হিসেবে প্রধানমন্ত্রী বৈঠকে সভাপতিত্ব করবেন।

একনেকে অনুমোদনের সুপারিশের আগে প্রকল্পটি যাচাই-বাছাই করেছে পরিকল্পনা কমিশনের সংশ্নিষ্ট শিল্প শক্তি বিভাগ। জানতে চাইলে এ বিভাগের সদস্য সরকারের সচিব এ কে এম ফজলুল হক সমকালকে বলেন, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এ ধরনের প্রকল্প একেবারে নতুন। এ কারণে কাজ শুরুর পর বাস্তবিক এবং খুব যুক্তিসংগত কারণেই কিছু পরিবর্তন আনতে হয়েছে। অতিরিক্ত কিছু নতুন কাজ সংযোজন করতে হয়েছে। এ ছাড়া মুদ্রার বিনিময় হারের পরিবর্তনের কারণেও ব্যয় কিছুটা বেড়েছে। বাড়তি ব্যয় করছে রাষ্ট্রীয় পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)।

মেয়াদ বৃদ্ধির কারণ সম্পর্কে ইস্টার্ন রিফাইনারি কর্তৃপক্ষ বলেছে, প্রকল্পের জার্মানভিত্তিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান আইএলএফ কনসালটিং ইঞ্জিনিয়ার্সের সঙ্গে সম্পাদিত মূল চুক্তির কর্মপরিধির বাইরে কুতুবদিয়া চ্যানেল ও মাতারবাড়ী অ্যাপ্রোচ চ্যানেল অংশের কাজের নকশা পর্যালোচনা করতে হবে। চুক্তির অতিরিক্ত কাজ সংযোজন করতে হচ্ছে। এ ছাড়া ডলারের বিপরীতে টাকার মান কিছুটা কমে যাওয়ার কারণে প্রকল্পের ব্যয় বেড়েছে।

প্রকল্পের আওতায় কুতুবদিয়া চ্যানেল ও মাতারবাড়ীতে ১৪৬ কিলোমিটার অফশোর এবং ৭৪ কিলোমিটার অনশোর পাইপলাইন নির্মাণ করার কথা। মহেশখালীতে ৬০ হাজার ঘনমিটার ক্ষমতার তিনটি অপরিশোধিত তেল সংরক্ষণাগার এবং ৩৬ হাজার ঘনমিটার সম্পন্ন তিনটি ডিজেল স্টোরেজ ফার্ম নির্মাণও এর অন্যতম কাজ।

প্রকল্পের জন্য ৪ হাজার ৭৮৮ কোটি টাকার ঋণ সহায়তা দিয়েছে চায়না এক্সিম ব্যাংক। সরকার দিয়েছে ৬০১ কোটি টাকা। বাকি ১ হাজার ৮৩৫ কোটি টাকা বাস্তবায়নকারী সংস্থা এবং বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি)।

বৈশ্বিক যে কোনো অস্থিরতায় জ্বালানি তেলের দরে অস্বাভাবিক ওঠানামা দেখা যায়। যার প্রভাব পড়ে দেশের মূল্যস্ম্ফীতিতেও। এ রকম পরিস্থিতি এড়াতে অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় জ্বালানি নিরাপত্তায় গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মজুত বৃদ্ধির মাধ্যমে সব ধরনের জ্বালানির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে এতে। নিরাপদ মজুতের মাধ্যমে স্বল্প ব্যয়ে জ্বালানি সরবরাহের লক্ষ্য রয়েছে সরকারের। কিন্তু সংশ্নিষ্ট প্রকল্প বাস্তবায়ন ঠিক সময়ে না হওয়ায় এ লক্ষ্য অর্জন পিছিয়ে যাচ্ছে বলে মনে করেন সংশ্নিষ্টরা।

বিষয় : ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড ইআরএল জ্বালানি তেল পরিশোধন

মন্তব্য করুন