ভোজ্যতেলের তেলেসমাতিতে সব শ্রেণির মানুষ জ্বলছে 'তেলেবেগুনে'। তেলের রেকর্ড দাম বাড়ার বিষয়টি কেউই মানতে পারছেন না। এক সয়াবিনের কারণে প্রতিটি সংসারেই খরচা বেড়েছে আরেক দফা। এই বাড়তি খরচ মাসে অন্তত ৩০০ টাকা। ফলে অনেকেই কমিয়েছেন রান্নায় তেলের ব্যবহার।

এদিকে, হঠাৎ করেই অনেক রেস্তোরাঁর পরোটা, শিঙাড়া, সমুচা আর ডালপুরি আগের অবয়বে নেই; হয়েছে আকারে ছোট। রেস্তোরাঁ মালিকরা তেলের বাড়তি খরচ সমন্বয় করতে এই সূক্ষ্ণ কারসাজিতে নেমেছেন। অনেক মালিক আবার এসব পণ্যের আকার ঠিক রেখে দাম বাড়িয়েছেন দ্বিগুণ। এক লাফে ভোজ্যতেলের দাম লিটারে বেড়েছে সর্বোচ্চ ৪৪ টাকা। এ কারণে বিপাকে পড়েছেন স্বল্প আয়ের মানুষ।

এক থেকে দেড় বছর ধরেই বাড়ছে ভোজ্যতেলের দাম। ১০০ টাকার তেলের লিটার বাড়তে বাড়তে এখন ২০০ টাকার কাছাকাছি। সম্প্রতি বিশ্ববাজারে ভোজ্যতেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় দেশের বাজারে এক ধরনের কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়েছে। দাম আরও বাড়তে পারে- এমন চিন্তা থেকে অনেক ডিলার ও পাইকারি ব্যবসায়ী তেল মজুত করার কারণে সৃষ্টি হয়েছে এমন সংকট। তবে দাম বাড়ানোর পর বড় বড় বাজারে সয়াবিন তেল ফিরতে শুরু করলেও পাড়া-মহল্লাসহ কোনো কোনো বাজারে এখনও কিছুটা সংকট রয়ে গেছে।

সয়াবিনের পেছনে বাড়তি খরচ :দুই ছেলে, এক মেয়ে, স্ত্রীসহ পাঁচ সদস্যের পরিবার মোস্তফা কামালের। থাকেন রাজধানীর পূর্ব তেজতুরীবাজারে। মাসে তার সংসারে প্রয়োজন হয় পাঁচ থেকে সাড়ে পাঁচ লিটার সয়াবিন তেল। দাম বাড়ার কারণে শুধু তেলের পেছনে তার খরচ বেড়েছে ২০০ টাকার ওপরে।

গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর কারওয়ান বাজার থেকে দুই লিটার তেল কেনেন তিনি। আক্ষেপ করে বলেন, শুধু তেলেই যদি মাসে ২০০ টাকার বেশি খরচ বাড়ে, তাহলে বোঝেন সংসার চালানো এখন কত কঠিন। এত দিন মাসে পাঁচ থেকে ছয় লিটার তেল খরচ করলেও এখন তা কমিয়ে তিন থেকে চার লিটারে নিয়ে আসতে হবে।

কাঁঠালবাগানের বাসিন্দা নাজমুল ইসলাম জানান, ভাই, বোন, ভাগিনাসহ চার সদস্যের পরিবার তাদের। গ্রাম থেকে বেশিরভাগ সময় আত্মীয়স্বজন আসায় চার সদস্যের পরিবারে কখনও কখনও ছয় থেকে সাতজন সদস্য হয়ে যায়। তিনি বলেন, মাসে তাদের সাত থেকে আট লিটার তেলের দরকার হয়। সে হিসাবে তাদের তেল খরচ বাড়বে ২৬৬ থেকে ৩০৪ টাকা।

মহাখালী কাঁচাবাজার থেকে দুই লিটারের এক বোতল সয়াবিন তেল কেনেন গৃহিণী মারুফা। তিনি জানান, আগে পাঁচ লিটারের বোতল কিনতেন ৭৬০ টাকায়। এখন ওই বোতলের দাম ২২৫ টাকা বাড়ার কারণে দুই লিটার কিনতে বাধ্য হয়েছেন। রমজান মাসে ব্যবসায়ীরা সব জিনিসের দাম বাড়িয়েছেন। তেল না দিয়ে মানুষকে ভুগিয়েছেন। এখন দাম বাড়িয়ে মানুষের পকেট কাটছেন। সরকারের দূরদর্শিতার অভাবে ব্যবসায়ীরা এই সুযোগ নিচ্ছেন।

তেজগাঁওয়ের শাহীনবাগ এলাকার রাহেলা বেগম বাসাবাড়িতে কাজ করে চালান সংসার। তিনি জানান, এত দিন দুই লিটার করে সয়াবিন তেল কিনতেন। লিটারে ৪৪ টাকা দাম বাড়ার কারণে এখন এক লিটার কিনতে হচ্ছে। রান্নার কাজে নামমাত্র তেল ব্যবহার করছেন।

গত ৫ মে নতুন করে সয়াবিন ও পাম অয়েলের দাম নির্ধারণ করে বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন। প্রতি লিটার খোলা সয়াবিন তেলের দাম ৪৪ টাকা, বোতলজাত সয়াবিনে ৩৮ ও পাম অয়েলের লিটারে ৪২ টাকা বাড়ানো হয়। এখন প্রতি লিটার খোলা সয়াবিন তেল কিনতে হচ্ছে ১৮০ টাকায়। আর সয়াবিন তেলের এক লিটারের বোতল ১৯৮ ও পাঁচ লিটারের বোতলের দাম পড়ছে ৯৮৫ টাকা। এ ছাড়া প্রতি লিটার পাম অয়েলের নতুন দাম ১৭২ টাকা। গত শনিবার থেকে কার্যকর হয়েছে এই নতুন দর।

ছোট হচ্ছে পরোটা-শিঙাড়া-সমুচা-ডালপুরি :রাজধানীর মহাখালীর আলম রেস্টুরেন্টে ভাতের পাশাপাশি নাশতা হিসেবে বিক্রি হয় পরোটা, শিঙাড়া, সমুচা, ডালপুরি। ঈদের পর কয়েক দিন তিনি এসব আইটেম বানানো বন্ধ রেখেছিলেন। রেস্টুরেন্টটির মালিক মো. শরীফ বলেন, পাম অয়েলের দাম বেড়েছে লিটারে ৪২ টাকা, আর ময়দা বস্তায় বেড়েছে ১৫০ টাকা। ২ হাজার ৮৫০ টাকার ময়দার বস্তা কিনতে হচ্ছে তিন হাজার টাকায়। কয়েক দিন নাশতা তৈরি বন্ধ রেখেছিলাম। এখন বাধ্য হয়ে পরোটা, শিঙাড়া, সমুচা আকারে ছোট করতে হচ্ছে।

তিনি জানান, প্রতিদিন তার হোটেলে ২৫ লিটার পাম অয়েলের প্রয়োজন হয়। দাম বাড়ার কারণে তেলের খরচ বেড়েছে দৈনিক ১ হাজার ৫০ টাকা। এত দিন তিনি পরোটার পিস ১৫ টাকা আর শিঙারা, সমুচা, ডালপুরির পিস ১০ টাকায় বিক্রি করেছেন। তিনি বলেন, 'এখন হঠাৎ শিঙাড়া, সমুচা, ডালপুরির দাম ১৫ টাকা করলে ক্রেতার সঙ্গে বাগ্‌বিতণ্ডায় জড়াতে হবে। মানুষ খেতে চাইবে না। এতে ক্রেতা কমে যাবে। তা ছাড়া বিভিন্ন সংস্থা এসে ঝামেলা করবে, জরিমানা করবে। সে কারণেই দাম না বাড়িয়ে পণ্যের আকার ছোট করেছি।'

তিনি বলেন, 'আগে এসব নাশতার পিস ছিল পাঁচ টাকা; এরপর হয়েছে ছয় টাকা, পরে আট টাকা, এখন ১০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বিবেকের তাড়নায় আবারও দাম না বাড়িয়ে আকারে কিছুটা ছোট করার পথ বেছে নিতে হয়েছে।'
তবে আকারে ছোট না করে বরং কিছুটা বড় করে দাম দ্বিগুণ করেছে কারওয়ান বাজারের হাজী বিরিয়ানি অ্যান্ড কাবাব হাউস। প্রতিষ্ঠানটির বিক্রয়কর্মী মো. সুমন জানান, তিন দিন ধরে তারা শিঙাড়া, বেগুনি, পেঁয়াজু ১০ টাকা করে বিক্রি করছেন, যা এত দিন ছিল পাঁচ টাকা করে। তবে পরোটা ও জিলাপির দাম না বাড়ালেও আকারে কিছুটা ছোট করতে বাধ্য হয়েছেন তিনি।

একই বাজারের পরোটা বিক্রেতা হারুন মিয়া জানান, তিনি পরোটার পিস ১০ টাকাই রাখছেন। তবে আগের চেয়ে কিছুটা ছোট করেছেন। পরোটার দাম না বাড়ালেও প্রতি প্লেট ডাল ও ভাজা ডিমের দাম পাঁচ টাকা বাড়িয়ে ২০ টাকায় বিক্রি করছেন তিনি।
যে কারণে পাড়া-মহল্লা ও খুচরা বাজারে তেলের সরবরাহ কম :ঈদের সাত দিন আগে থেকেই বাজার থেকে উধাও হয়ে যায় ভোজ্যতেল। তবে দাম বাড়ানোর পর বাজারে তেল ফিরছে। বড় বাজার ও ডিলার পর্যায়ে তেলের সরবরাহ বেড়েছে। পাড়া-মহল্লাসহ কোনো কোনো বাজারে এখনও কিছুটা সংকট রয়েছে।

মহাখালী কাঁচাবাজারের মাসুমা জেনারেল স্টোরের মালিক আল আমিন বলেন, ডিলারদের কাছে তেল আছে। কিছু কিছু কোম্পানির বিক্রয় প্রতিনিধিরা ছুটিতে গেছেন। তাই দোকানে এসে দিয়ে যাচ্ছেন না। ডিলার পয়েন্টে গিয়ে আনতে হয়। এতে রিকশা ভাড়া লাগছে। তাই তেল আনা হয় না। তবে আজ (মঙ্গলবার) রূপচাঁদা ব্র্যান্ডের তেল এসেছে। আগামীকাল (বুধবার) বসুন্ধরাসহ অন্য ব্র্যান্ডের তেল আসবে।

একই বাজারের ব্যবসায়ী বিকাশ বণিকের রয়েছে চারটি দোকান। তিনি চার দোকানে না তুলে এক দোকানেই তীর, পুষ্টি, সান ও রূপচাঁদা ব্র্যান্ডের তেল রেখেছেন। বিকাশ বণিক বলেন, অনেক খুচরা ব্যবসায়ী ডিলারদের কাছ থেকে বাকিতে তেল নিতে চান। এখন সংকটময় সময়, তাই তারা বাকিতে দিচ্ছেন না। তবে তাদের কাছে প্রচুর তেল আছে। এ ছাড়া ডিলারদের বিক্রয়কর্মীরা ঈদের ছুটিতে বাড়ি যাওয়ার পর অনেকেই এখনও ফেরেননি। এ কারণে খুচরা দোকানে তেলের সরবরাহ কিছুটা কম। তবে আজ (মঙ্গলবার) বসুন্ধরা, তীরসহ কয়েকটি কোম্পানি অর্ডার নিয়ে গেছে। দু-এক দিনের মধ্যেই তেল চলে আসবে।

কারওয়ান বাজারের হাবিব জেনারেল স্টোরের স্বত্বাধিকারী মো. হাবিব বলেন, কয়েক দিন সংকট ছিল। দাম বাড়ানোর পর নতুন দামের লেবেল লাগানো তেল বাজারে এসেছে। এখন সংকট নেই। তীর, ফ্রেশ, রূপচাঁদা, সানসহ প্রায় সব ব্র্যান্ডের তেল আসছে।

সংকটের বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ পাইকারি ভোজ্যতেল ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি গোলাম মাওলা বলেন, ঢাকার বাইরে ছিলাম কয়েক দিন। এ বিষয়ে আমার জানা নেই।

তবে মিলাররা বলছেন, ঈদের ছুটির কারণে ডিলারদের অনেক বিক্রয়কর্মী ছুটিতে ছিলেন। ব্যাংকসহ অফিসগুলো বন্ধ ছিল। এ কারণে ঈদের পর তেল সরবরাহ করা হয়ে ওঠেনি। আজকের মধ্যেই তেল পৌঁছবে। তবে সারাদেশে পৌঁছাতে আরও এক-দু'দিন সময় লাগতে পারে।

বসুন্ধরা মাল্টি ফুড প্রোডাক্টস লিমিটেডের নির্বাহী পরিচালক (বিক্রয়) মো. রেদওয়ানুর রহমান বলেন, ঈদের ছুটির কারণে সরবরাহ বন্ধ ছিল। তবে রোববার থেকে অর্ডার নেওয়া শুরু হয়েছে। এরই মধ্যে ডিলার পর্যায়ে তেল পৌঁছে গেছে। ডিলারদের থেকে খুচরা বাজারে পৌঁছতে হয়তো কিছুটা সময় লাগছে। তবে তেলের সংকট আপাতত নেই।

বিষয় : সংসারে ব্যয়ের চাপ হোটেলে উত্তাপ

মন্তব্য করুন