চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ। দেশের অন্যতম বড় পাইকারি মোকাম। এই খাতুনগঞ্জ ঘিরে বন্দরনগরীতে রয়েছে সহস্রাধিক ব্যবসায়ীর পাঁচ শতাধিক গুদাম। ভোজ্যতেলের তেলেসমাতিতে বড় বড় ব্যবসায়ীর এসব গুদামে এখন সবার নজর। নজরবন্দি এড়াতে অসাধু ব্যবসায়ীরা নিয়েছেন কূটকৌশল। অচেনা দোকানকে বানিয়েছেন গুদাম। কেউ কেউ ভোজ্যতেল মজুত করেছেন বাড়িতে, তৈরি করা হয়েছে সুড়ঙ্গ। পাহারাও বসেছে সেখানে। নগর ছেড়ে ভোজ্যতেলের গোপন মজুত ঠাঁই নিয়েছে গ্রামের প্রান্তরেও।

নগরীর ষোলশহরের কর্ণফুলী মার্কেটের 'মেসার্স খাজা স্টোর' তৈরি করেছে গোপন সুড়ঙ্গ। সেই সুড়ঙ্গে রাখা হাজার হাজার লিটার ভোজ্যতেল। জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের রোববারের অভিযানে বেরিয়ে আসে থলের বেড়াল। শনিবার রাতে আরেকটি অভিযানে ফটিকছড়ির বাগানবাজার এলাকার দক্ষিণ গজারিয়া গ্রামে ভোজ্যতেলের মজুত মেলে এক ব্যবসায়ীর বাড়িতে। আর গত সোমবার নগরের পাহাড়তলী বাজারের সিরাজ সওদাগরের এক দোকানের তিন গুদামে অভিযান চালিয়ে পাওয়া যায় ১৫ হাজার লিটার সয়াবিন তেল। শুধু চট্টগ্রাম নগর কিংবা জেলা নয়, ভোজ্যতেল মজুতের তথ্য আসছে বিভিন্ন উপজেলা থেকেও।

জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারির তুলনায় মার্চ ও এপ্রিলে মিলগেট থেকে তেলের সরবরাহ কিছুটা বাড়িয়েছেন আমদানিকারকরা। তার পরও চট্টগ্রামসহ দেশের অনেক বাজারে নেই এর প্রভাব।
খাতুনগঞ্জ ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মাহবুবুল আলম বলেন, 'অচেনা দোকান ও গুদামে ভোজ্যতেল মিলছে হাজার হাজার লিটার। এমন কেন হচ্ছে- তা খুঁজে বের করতে হবে প্রশাসনকে। এভাবে চলতে থাকলে ভোক্তারা তেল পাবে না বাজারে। ভোজ্যতেল নিয়ে নীতিনির্ধারকদেরও নতুন করে ভাবতে হবে।

সরবরাহ ব্যবস্থায় কোনোভাবেই যাতে সমস্যা তৈরি না হয়, সেদিকে দিতে হবে নজর। এলসির পরিমাণ যাতে না কমে, সেদিকেও দৃষ্টি রাখতে হবে মন্ত্রণালয়কে।' ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর বিভাগীয় কার্যালয়ের উপপরিচালক মোহাম্মদ ফয়েজ উল্যাহ বলেন, 'সরেজমিন অভিযানে গিয়ে পিলে চমকানো তথ্য-প্রমাণ পাচ্ছি। তেল নিয়ে সবাই দিশেহারা হলেও বাজারে কৃত্রিম সংকট করতে ব্যস্ত কিছু অসাধু ব্যবসায়ী। বাড়তি লাভের আশায় তারা নানা কৌশল আঁটছেন। প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিতে কেউ দোকানের ভেতরেই তৈরি করছেন সুড়ঙ্গ। কেউ বা আবার দোকানে বিক্রির তেল না রেখে রাখছেন বাসা-বাড়িতে। বিষয়টি উদ্বেগের।'

ক্যাবের সহসভাপতি এসএম নাজের হোসাইন বলেন, 'মজুত ঠেকাতে সরকার ও দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাকে আরও কঠোর হতে হবে। বড় ব্যবসায়ীদের গুদামেও অভিযান চালাতে হবে।'

আতঙ্ক বাড়াচ্ছে গোপন মজুত : ঢাকার মৌলভীবাজার ও চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ। এখান থেকেই সারাদেশে প্রতিদিন প্রায় ৬ হাজার টন ভোজ্যতেল যায়। খাতুনগঞ্জ থেকে তেল সরবরাহ বেশি করে এস আলম ও সিটি গ্রুপ। ঢাকায় তেলের আমদানিকারক সবচেয়ে বেশি। টিকে, মেঘনা, বসুন্ধরা গ্রুপ ও বাংলাদেশ এডিবল অয়েলের তেল বেশি সরবরাহ হয় ঢাকা থেকে। মোট ভোজ্যতেলের প্রায় ৩০ শতাংশ বাজার নিয়ন্ত্রণ করে চট্টগ্রাম। সেখানেও এখন মিলছে না পর্যাপ্ত ভোজ্যতেল। নাম প্রকাশ না করার শর্তে খাতুনগঞ্জের ভোজ্যতেলের অন্যতম এক পরিবেশক জানান, আগের চেয়ে মিলগেট থেকে সরবরাহ বেড়েছে। তার পরও কেন বাজারে মিলছে না পর্যাপ্ত ভোজ্যতেল, তা খুঁজে বের করা দরকার প্রশাসনের। তিন-চার দিন পর পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

চাহিদা মতো তেল মিলছে না খাতুনগঞ্জেও

দেশের ভোগ্যপণ্যের সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এক সপ্তাহের ব্যবধানে বৃহৎ এই পাইকারি মোকামের ভোজ্যতেলের চেহারা পাল্টে গেছে। বেশিরভাগ মোকামে মিলছে না কাঙ্ক্ষিত তেল। এক সপ্তাহ আগে প্রতি মণ (৩৭.৩২ কেজি) পাম অয়েল বিক্রি হয়েছিল ৫ হাজার ৮০০ থেকে ৬ হাজার টাকায়। বর্তমানে তা বিক্রি হচ্ছে ৬ হাজার ৪০০ থেকে ৬ হাজার ৪৫০ টাকায়। আর সয়াবিন তেল বিক্রি হচ্ছে প্রতি মণ ৭ হাজার ৫০০ টাকায়, যা এক সপ্তাহ আগেও বিক্রি হয়েছিল ৬ হাজার ৯০০ থেকে ৭ হাজার টাকায়। চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ আড়তদার ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম বলেন, 'বাজারে পর্যাপ্ত তেল না মিললেও অনেক অসাধু ব্যবসায়ীর বাসা-বাড়ি কিংবা গুদামে মিলছে। এটি সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রতারণা ছাড়া আর কিছুই নয়।'

তিন গুদামে 'তালা'

বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে ফায়দা লুটতে চট্টগ্রাম নগরের পাহাড়তলী বাজারের সিরাজ সওদাগরের এক দোকানের তিন গুদামের ভেতরেই গোপনে মজুত করা হয় ১৫ হাজার লিটার সয়াবিন তেল। সোমবার সেখানে অভিযান চালিয়ে সেসব তেল জব্দ করেছে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। এজন্য ওই ব্যবসায়ীকে ১ লাখ ৭০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।

দোকানের সুড়ঙ্গে ১ হাজার ৫০ লিটার তেল : নগরের কর্ণফুলী মার্কেটের খাজা স্টোরে সুড়ঙ্গ করে সেখানে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল ১ হাজার ৫০ লিটার তেল। গত রোববার সেখানে হানা দেয় জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম বিভাগীয় কার্যালয়ের একটি দল। এই কারসাজির অপরাধে প্রতিষ্ঠানটিকে ৪০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।

দোকানির বাড়িতেই মজুত ২৩২৮ লিটার তেল : ফটিকছড়িতে এক মুদি দোকানি তেল দোকানে না রেখে মজুত করেন নিজের বাড়িতে। গত শনিবার ফটিকছড়ির বাগানবাজার এলাকার দক্ষিণ গজারিয়া গ্রামের বাসিন্দা মুদি দোকানদার আকতার হোসেনের বাড়ি থেকে ২ হাজার ৩২৮ লিটার সয়াবিন তেল উদ্ধার করে স্থানীয় প্রশাসন।