মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনযাপনে অঙ্কের হিসাব কষা চলছে খরচের ক্ষেত্রে। অনেকেই নিতান্ত প্রয়োজনের বাইরে কোনো কিছুর দিকেই হাত বাড়াচ্ছেন না। বুধবার সমকালে 'সংসারে ব্যয়ের চাপ রেস্তোরাঁয় উত্তাপ' শিরোনামে শীর্ষ প্রতিবেদনে যে চিত্র উঠে এসেছে, তাতে দেখা যায় ভোজ্যতেলের দাম এক লাফে অস্বাভাবিক বৃদ্ধির ফলে এর বিরূপ প্রভাব বহুমুখী হয়ে উঠেছে।
ভোজ্যতেল নিয়ে যখন সংকট চলছে, তখন লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে পেঁয়াজের দামও। কৃষকের স্বার্থ বিবেচনা করে সরকার পেঁয়াজ আমদানি বন্ধ রাখার বিলম্বিত এই সিদ্ধান্তের কার্যত কোনো সুফল তো নয়ই, উপরন্তু ভোক্তার ওপর আরও চাপ বেড়েছে। কৃষকের উৎপাদিত পেঁয়াজ হাতছাড়া হয়ে আড়তদার-মজুতদারের কবজায় চলে গেছে। এ অবস্থায় কৃষক ও ভোক্তাশ্রেণি উভয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও মধ্যস্বত্বভোগীদের পোয়াবারো। আমরা মনে করি, দ্রুত ভোক্তার স্বার্থে অসময়ে নেওয়া এই সিদ্ধান্ত বাদ দিয়ে পেঁয়াজ আমদানি করে বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক করা প্রয়োজন। বুধবারই সমকালের ভিন্ন একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের বিভিন্ন স্থানে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর অভিযান চালিয়ে ১ লাখ ৬৭ হাজার ৪০৬ লিটার ভোজ্যতেল অবৈধভাবে মজুতকারীদের 'গোপন গুদাম' থেকে উদ্ধার করেছে। জরিমানা করা হয় ৬ লাখ ৩৭ হাজার টাকা। একই দিনে অন্য একটি দৈনিকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভোজ্যতেল নিয়ে কারসাজির ফলে সৃষ্ট কৃত্রিম সংকটে ভোক্তার ১৬০ কোটি টাকা লুট হয়ে গেছে। হোটেল-রেস্তোরাঁর খাবারেও নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধির অভিঘাত লেগেছে।
আমরা জানি, কিছুদিন আগে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির ফলে এমনিতেই জনজীবনে নানামুখী চাপ পড়েছিল। রমজানের কয়েক দিন আগে এ সম্পাদকীয় স্তম্ভেই আমরা বাজার পরিস্থিতি নিয়ে সতর্ক করেছিলাম। আমরা এও বলেছিলাম, করোনা দুর্যোগ-উত্তর পরিস্থিতিতে বাজার ব্যবস্থার অস্থিতিশীলতা মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে আসতে পারে। রমজান শুরু হতে না হতেই আমাদের আশঙ্কা বাস্তবে পরিণত হয়েছিল। আমরা জানি, তখন বাজারে তদারকি বাড়িয়ে, অভিযান চালিয়ে জরিমানা করেও অসাধু ব্যবসায়ী অর্থাৎ অতি মুনাফাবাজদের কারসাজি বন্ধ করা যায়নি। প্রশ্ন হচ্ছে- অসাধু মহল নানা রকম ফন্দি এঁটে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা বারবার ব্যতিব্যস্ত করে তোলার সাহস পায় কী করে? কেন 'সিন্ডিকেট' ভাঙা যাচ্ছে না?
শুধু যে ভোগ্যপণ্য নিয়েই কারসাজি চলছে, তা নয়। সরকারের সংস্থা বিবিএসের তথ্য বলছে, দেশের পরিবহন ব্যয় রেকর্ড উচ্চতায় উন্নীত হয়েছে। গত এক বছরে মানুষের যাতায়াত ও পণ্য পরিবহন ব্যয় বেড়েছে ৯১ শতাংশ। যাতায়াতে সাধারণ মানুষকে কয়েক গুণ ব্যয় তো করতেই হচ্ছে; উপরন্তু পণ্য পরিবহনে ব্যয় বাড়ায় এরও বিরূপ ধাক্কা লেগেছে বাজারে। বহুচক্রের স্বার্থসিদ্ধির জন্য নীতিনৈতিকতা বিবর্জিত কর্মকাণ্ডে জনজীবনে যে নাভিশ্বাস উঠেছে, এ থেকে মুক্তি দেওয়ার দায় সরকার এড়াতে পারে না। বৃহৎ জনগোষ্ঠী কিংবা ভোক্তার স্বার্থকে প্রাধান্য না দিয়ে মহলবিশেষের স্বার্থ রক্ষার জন্য সরকার কোনোভাবেই 'চাপ' কিংবা অযৌক্তিক দাবির কাছে নত হতে পারে না।
আমরা দেখছি, সিন্ধুর মাঝে বিন্দুর মতো সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ-টিসিবির ট্রাকসেলে এক সময় ছিল নিম্ন আয়ের মানুষের সারি। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, সেখানে ক্রমেই মধ্যবিত্তের ভিড় বাড়ছে। সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে উঠে এসেছে ক্যামেরা দেখলেই এই শ্রেণির মানুষের মুখ লুকানোর চিত্র। তাতে সহজেই প্রতীয়মান, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা কত কঠিন হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা বাড়ানোর পাশাপাশি বাজার পরিস্থিতি যে কোনো মূল্যে নিয়ন্ত্রণ করতেই হবে। মানুষের জীবনযাপন করতে হবে নির্বিঘ্ন। তা না হলে বিদ্যমান পরিস্থিতি উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতার জন্য বুমেরাং হতে পারে।

বিষয় : সম্পাদকীয় জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি

মন্তব্য করুন