উপকূলের চাষি আবদুল হাকিম। নোয়াখালীর সুবর্ণচরের চারবাটা ইউনিয়নে এবার ৫ একর জমিতে ফলিয়েছেন বোরো ধান। মাঠে মাঠে তখন সোনা রং। সপ্তাহখানেক আগে পাকা ধান কেটে শুকানোর জন্য জমিতেই রাখেন, আর স্বপ্ন বোনেন। খড় শুকালেই সেই সোনালি ধান চলে আসত বাড়ির আঙিনায়। কথা ছিল, উঠানেই হবে ধান মাড়াইয়ের আয়োজন। সবই চলছিল নিয়ম মেনে। তার আগেই ঘূর্ণিঝড় 'আসানি' চাষি হাকিমের কাছে আসে দুঃস্বপ্ন হয়ে। মাঠে থাকা সব ধান প্রবল বৃষ্টিতে যায় তলিয়ে। ফসল হারিয়ে হাকিমের মতো এমন অনেক চাষি এখন মনঃকষ্টে নির্বাক।

এর আগে গত এপ্রিলে পাহাড়ি ঢলে হাওরাঞ্চলে তলিয়ে যায় বোরোর জমি। সে সময় অনেক চাষি হারান পাকা ধান। প্রকৃতির দুই ধাক্কায় এবার সংকটে বোরো উৎপাদন। সরকারের ধান ও চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ নিয়েও রয়েছে শঙ্কা। শত বছরের পুরোনো দেশের পূর্বাঞ্চলের সবচেয়ে বড় হাট ধান সংকটে খাঁ খাঁ করছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগে এবার চালের বাজারদরে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে বলে শঙ্কা সংশ্নিষ্ট বিশেষজ্ঞদের। তবে এ নিয়ে চিন্তিত নয় সরকার। খাদ্য ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, যে পরিমাণ ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তা মোট আবাদের ১ শতাংশ। তার পরও অভ্যন্তরীণ সংগ্রহের পরিস্থিতি বুঝে আমদানির সিদ্ধান্তের কথা ভাববেন তারা।

বাজার পর্যবেক্ষকরা বলছেন, অতীতেও হাওরের উৎপাদন বিপর্যয়ের ধারাবাহিকতায় দেশে চালের বাজার অস্থিতিশীল হয়েছিল। সর্বশেষ ২০১৭ সালে হাওরের আগাম বন্যার কারণে জমেছিল চালের বাজারে মেঘ। অতীতের মতো সরকারি সংস্থা চাল নিয়ে তৃপ্তিতে থাকলে এবারও বিপদ বাড়বে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তার বলছেন, এখনই চাল নিয়ে সরকারকে ভাবতে হবে। তা না হলে নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে উঠতে পারে চালের বাজার।

হাওরে ক্ষতি, বড় শঙ্কা: কৃষি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে হাওরের সাত জেলায় ৯ হাজার ৭০০ হেক্টর জমির বোরো ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে স্থানীয় কৃষক, হাওরের ফসল রক্ষা আন্দোলনে সম্পৃক্ত সংগঠনগুলোর তথ্যমতে, এই বোরো মৌসুমে শুধু সুনামগঞ্জেরই ৩১টি হাওরের ২০ হাজার হেক্টর জমির ফসল পানিতে তলিয়েছে। এতে ১ লাখ ২০ হাজার টন ধান পুরোপুরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যার বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৩০০ কোটি টাকা।

হাওর বাঁচাও আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সভাপতি আবু সুফিয়ান বলেন, '২০ হাজার হেক্টর জমির ফসল পানিতে তলিয়ে গেছে।'

কৃষি বিভাগ বলছে, ২০ হাজার কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। বাস্তবে ক্ষতিগ্রস্ত চাষির সংখ্যা ৫০ হাজার ছাড়িয়ে যাবে।

আসানির বৃষ্টিতে অশনি: ঘূর্ণিঝড় আসানির প্রভাবে বৃষ্টিতে ধানগাছ নুইয়ে পড়া, ক্ষেতে পানি জমে ধান নষ্ট হওয়া ও ব্লাস্ট রোগের কারণে এই বোরো মৌসুমে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ধান উৎপাদন কম হওয়ার আশঙ্কা করছে জেলা পর্যায়ের কৃষি বিভাগ। তবে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বৃষ্টিতে মোট ক্ষতির চূড়ান্ত তথ্য দিতে পারেনি। স্থানীয় কৃষি বিভাগের মাধ্যমে সমকালের প্রতিনিধিদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য বিশ্নেষণ করে দেখা গেছে, ২০ জেলায় আসানির বৃষ্টিতে ২ লাখ হেক্টর বোরো ফসল নষ্ট হয়েছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪৮ লাখ ৭২ হাজার হেক্টর। এর বিপরীতে বোরো আবাদ হয়েছে ৪৯ লাখ ৬৩ হাজার হেক্টর জমিতে। ২০২০-২১ অর্থবছরে বোরো আবাদের মাধ্যমে দেশে প্রায় ২ কোটি ৮ লাখ ৮৫ হাজার টন চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছিল। এ জন্য ৪৮ লাখ ৭২ হাজার হেক্টর জমিতে ধানের আবাদ হওয়ার কথা ছিল।

তবে বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, এ সময়ে দেশে বোরো আবাদ হয়েছে ৪৭ লাখ ৮৬ হাজার ৯৯৮ হেক্টর জমিতে। এতে উৎপাদন হয়েছে ১ কোটি ৯৮ লাখ ৮৫ হাজার ২৮৩ টন চাল। ফলে ডিএই লক্ষ্যমাত্রা থেকে দেশে বোরোর আবাদ ও উৎপাদন দুটিই কমেছে। লক্ষ্যমাত্রা থেকে দেশে বোরো আবাদ কমে প্রায় ১৪ হাজার ৪০০ হেক্টর ও উৎপাদন কমেছে প্রায় ১০ লাখ টন। এ বছর দুই প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে উৎপাদন আরও কমতে পারে বলে আশঙ্কা সংশ্নিষ্টদের।

ধানের বাজারে সংকট: ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জের মেঘনা নদীর ভিওসি ঘাটে বসে পূর্বাঞ্চলের শত বছরের পুরোনো বড় ধানের হাট। ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কিশোরগঞ্জ, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, সুনামগঞ্জ, সিলেট, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জের হাওর এলাকার উৎপাদিত ধান চাষির কাছে থেকে কিনে ভিওসি ঘাটের হাটে আনেন ব্যাপারিরা। আশপাশের আড়াইশরও বেশি চালকলে ধানের জোগান দেয় এ হাট। প্রতিদিন চালকলগুলোতে ১ থেকে দেড় লাখ মণ ধানের চাহিদা আছে। এখানকার চালকল থেকে চট্টগ্রাম, সিলেট ও ঢাকা বিভাগের বিভিন্ন জেলায় চাল সরবরাহ করা হয়।

হাট-সংশ্নিষ্টরা জানিয়েছেন, নতুন ধানের মৌসুমে প্রতিদিন ঘাটে ধানবোঝাই অর্ধশত নৌকা এসে নোঙর করে। তবে এবার হাটে ধানের আমদানি কম। এখন প্রতিদিন ঘাটে আসছে ১৫ থেকে ২০টি নৌকা। এ হাটে মৌসুমে প্রতিদিন অন্তত ১ লাখ মণ ধান বেচাকেনা হতো। আর বাকি সময়গুলোতে দিনে বিক্রি হতো ৩০ থেকে ৪০ হাজার মণ ধান। এখন প্রতিদিন বিক্রি হচ্ছে ১০ থেকে ১৫ হাজার মণ, যার অধিকাংশ অপরিপকস্ফ ও চোঁচাঁ (চালবিহীন)। এক বস্তা (৮০ কেজি) ধানে ১৫ থেকে ২০ কেজিই চোঁচাঁ।

হাটে বিআর-২৮ জাতের প্রতি মণ ধান বিক্রি হচ্ছে ৮১০ থেকে ৮৫০ টাকা আর হীরা ধান বিক্রি হচ্ছে ৬২০ থেকে ৬৭০ টাকা দরে। হাটে মানসম্পন্ন পর্যাপ্ত ধান না পাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন চালকল মালিকরা।

আশুগঞ্জ অটো রাইস মিল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক জিয়াউল করিম খান সাজু বলেন, 'প্রতিদিন চালকলগুলোতে যে পরিমাণ ধানের প্রয়োজন, তার চেয়ে অনেক কম ধান আসছে হাটে। অপরিপকস্ফ ও চোঁচাঁ হওয়ায় এসব ধান থেকে চাল কম হচ্ছে। মানসম্পন্ন ধান না পাওয়ার কারণে সংকট তৈরি হয়েছে। এ সংকট চলতে থাকলে চালের দাম কিছুটা বাড়বে।'

চালের কেমন আমদানি ও মজুত: এক বছর ধরে বাজারে সরু চাল বিক্রি হচ্ছে ৭০ টাকা কেজি দরে। এই চাল দেশের চাষিরা উৎপাদন করেন। তার পরও সংকট এড়াতে প্রচুর চাল আমদানিও করা হয়। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, গত ১১ এপ্রিল পর্যন্ত ১০.২৬ লাখ টন চাল মজুত ছিল। ২০২১ সালের জুলাই থেকে ১১ মে পর্যন্ত সরকারি ও বেসরকারিভাবে চাল আমদানি হয়েছে ৯৮২ টন। এর পরও কমেনি এ চালের দাম। সরকারি হিসাব বলছে, গত এক বছরে সরু চালের দাম বেড়েছে কেজিতে ৪ শতাংশের বেশি (৫ টাকা)।

লক্ষ্যমাত্রা পূরণ নিয়ে সংশয়: প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে ধানের বাজারদর বেশি হওয়ায় সরকারি গুদামে না দিয়ে বিভিন্ন এলাকার চাষিরা স্থানীয় বাজার ও ব্যবসায়ীদের কাছে ধান বিক্রি করছেন। ফলে এ মৌসুমে ধান-চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে গত ২৮ এপ্রিল থেকে প্রতি কেজি ধান ২৭ টাকা এবং ৭ মে থেকে প্রতি কেজি সিদ্ধ চাল ৪০ টাকা দরে কেনা শুরু করেছে সরকার। এ সংগ্রহ অভিযান আগামী ৩১ আগস্ট পর্যন্ত চলবে। ১১ মে পর্যন্ত অভ্যন্তরীণ বোরো ধান ২৯০ টন আর চাল ৯৬২ টন সংগ্রহ হয়েছে।

খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার বলেন, 'কেউ অবৈধভাবে মজুত করছে কিনা, তা কঠোর নজরদারি করা হচ্ছে।'

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক গবেষণা পরিচালক ও অর্থনীতিবিদ এম আসাদুজ্জামান বলেন, 'বোরো ধানের প্রায় ১০ শতাংশ হাওর থেকে আসে। আমাদের চাল উৎপাদনের ৬০ শতাংশই যেহেতু বোরো, এ কারণে হাওরে বন্যার ক্ষতির বেশ প্রভাব পড়তে পারে। সর্বশেষ বৃষ্টিতেও বড় ক্ষতি হয়েছে। ফলে বোরো উৎপাদনে একটা অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।' খাদ্য নিরাপত্তার এ হুমকি সামাল দিতে এখনই সরকারকে প্রস্তুতি নিতে হবে জানিয়ে এ অর্থনীতিবিদ বলেন, 'যে বিপর্যয়ের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, হয়তো আমদানি করে সেটা সামাল দেওয়া যাবে। এ জন্য নীতিনির্ধারকদের এখনই প্রস্তুতি নিয়ে রাখতে হবে।'

খাদ্যনীতিবিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ফুড পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (ইফপ্রি) সাম্প্রতিক এক গবেষণায় বলা হয়েছে, বোরো ধান মে থেকে জুনের মধ্যে কাটা হয়ে যায়। আর আগস্টের মধ্যে চাষিদের কাছ থেকে বেশিরভাগ ধান ফড়িয়া, চালকল মালিক ও ব্যবসায়ীদের হাতে চলে আসে। তখন থেকেই ধান-চালের দাম বাড়তে থাকে। ফলে তখন এর সুফল চাষিরা আর পান না।

সাবেক খাদ্য সচিব আবদুল লতিফ মণ্ডল বলেন, 'বর্তমানের উচ্চ শুল্ক্কহার কমিয়ে বেসরকারি খাতকে চাল আমদানিতে উৎসাহিত করতে হবে। ২০১৭ সালে আমদানি শুল্ক্ক পুরোপুরি রহিত করেও চালের বাজার নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি। শুল্ক্ক কমানোর সিদ্ধান্ত নিতে দেরি হওয়ায় চালের দাম অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে ফেলে। এই দিকটি সরকারকে খেয়ালে রাখতে হবে।'

খাদ্য সচিব ড. নাজমানারা খানুম বলেন, 'হাওরাঞ্চলে কী পরিমাণ ফসলের ক্ষতি হয়েছে সে তথ্য সংগ্রহের কাজ চলছে। বোরো ধান ও চাল আগস্ট পর্যন্ত সংগ্রহ হবে। সংগ্রহের পরিস্থিতি দেখে প্রয়োজনে আমদানির সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।'