অপরাধীকে সাধারণত কারাগারে বন্দি রেখে সংশোধনের সুযোগ দেওয়া হয়। দাগি আসামি বা সন্ত্রাসীরা কারাবন্দি থাকলে বাইরের সহযোগীদের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ থাকে না। কিন্তু এর উল্টোটা হচ্ছে। নিজের অপরাধ সংশোধনের সুযোগ তো নিচ্ছেই না, উল্টো বন্দি অবস্থা থেকেই কারাগারের বাইরে থাকা সহযোগীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করছে। তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসীরা কারাগারে বসেই নিয়ন্ত্রণ করছে অপরাধ জগৎ।
চাঁদা দাবি থেকে শুরু করে সহযোগীদের দিয়ে চাঁদা আদায়, দখল, এলাকার নিয়ন্ত্রণ- সবই করা হচ্ছে কারাগারে বসে।

বন্দি থেকে বাইরের অপরাধ-রাজ্য সামলানোর কাজে সন্ত্রাসীদের সুযোগ করে দিচ্ছে অসাধু কারারক্ষীরা। তাদের মোবাইল ফোন ব্যবহার করে বাইরে সহযোগীদের নানা নির্দেশনা দিচ্ছে বন্দি সন্ত্রাসীরা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সূত্রে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

সংশ্নিষ্ট সূত্র বলছে, কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট (সিটিটিসি) সম্প্রতি অন্তত দু'জন কারাবন্দি অপরাধীর বাইরে থাকা সহযোগীদের নজরদারি করে কারাগারে বসে বাইরে মোবাইল ফোন ব্যবহার করে রাজ্য সামলানোর তথ্য পেয়েছে।

কয়েক মাস আগে কারাগার থেকে জামিনে বেরিয়েছেন- এমন অন্তত তিনজনের সঙ্গে কথা বলে সমকাল নিশ্চিত হয়েছে, কারাগারে বসে বেশি টাকা দিলেই মোবাইল ফোনে কথা বলা সম্ভব। কিছু কারারক্ষী ছাড়াও কারা ওয়ার্ডের প্রভাবশালী বন্দিরা টাকা নিয়ে এই সুযোগ করে দিচ্ছে।

নাম প্রকাশ না করে তথ্য দেওয়া ওই তিনজন ছিনতাই ও ডাকাতি মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে গিয়েছিল। তারা বলেছে, সরকারিভাবেই (কারা কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে) বৈধভাবে সপ্তাহে একবার ১০ মিনিটের জন্য আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা বলা যায়। কিন্তু তা অনেক ঝামেলার। এ জন্য যেসব বন্দির টাকা আছে, তারা অবৈধভাবেই ফোনে বেশি টাকায় বেশিক্ষণ কথা বলে।

তাদের সঙ্গে কথা বলে আরও জানা যায়, অবৈধভাবে ফোনে কথা বলতে নির্ধারিত কোনো মূল্য নেই। তবে মিনিটে তা অন্তত ৩০ থেকে ৫০ টাকা দিতে হয়। আরও বেশি সময়ে কথা বলার জন্য নিজের কাছে মোবাইল রাখা যায়। তাতে কয়েক হাজার টাকা লাগে।

সিটিটিসির অ্যান্টি-ইলিগ্যাল আর্মস অ্যান্ড ক্যানাইন টিম সূত্র বলছে, ২০২১ সালের নভেম্বরে রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকা থেকে আলী আকবর, মো. হোসেন, লালতন পাংখুয়া ও আদিলুর রহমান সুজন নামের চারজন অবৈধ অস্ত্র ব্যবসায়ীকে গ্রেপ্তার করা হয়। ওই সময়ে তাদের কাছ থেকে পাঁচটি আগ্নেয়াস্ত্রের সঙ্গে ৩০১ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়। এসব গুলির মধ্যে ১০ রাউন্ড ছিল এ কে-৪৭ রাইফেলের। এই চক্র পাহাড়ি অঞ্চলের সীমান্ত দিয়ে আগ্নেয়াস্ত্র এনে রোহিঙ্গা ক্যাম্পসহ নানা জায়গায় বিক্রি করছিল। চারজনকে কারাগারে পাঠালেও বাইরে থাকা তাদের সহযোগীদের দিকে নজরদারি চলছিল। এই নজরদারি করতে গিয়েই দেখা যায়, কাশিমপুর কারাগারে থাকা আকবর ভেতর থেকে বাইরে সহযোগীদের সঙ্গে যোগাযোগ করছে।
ওই সূত্র জানায়, চলতি বছরের জানুয়ারিতে আকবর গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগারের পার্ট-২-এ বন্দি ছিল। সেখান থেকে নিজের স্ত্রী ও অন্য সহযোগীদের অবৈধ অস্ত্র হাতবদলের নানা নির্দেশনা দেয়। ওই ঘটনা গোয়েন্দারা জানতে পারলে আকবরকে হাই সিকিউরিটি কারাগারে নেয় কারা কর্তৃপক্ষ। এরপরও তার মোবাইল ফোনে কথা বলা বন্ধ হয়নি। গত দুই মাসে সে স্ত্রী শাহিদা বেগম ছাড়াও চট্টগ্রামে তার সহযোগী মোসলেম ও মিতা আকবর নামে অপর একজনের সঙ্গে যোগাযোগ করে অবৈধ অস্ত্র বিক্রি-সংক্রান্ত নানা নির্দেশনা দেয়। যদিও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতায় তাদের এসব অবৈধ কার্যক্রম রোধ করা গেছে।

আকবরের সহযোগীদের নজরদারি করছেন সিটিটিসির এমন একজন কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, আকবর মূলত তিনটি মোবাইল নম্বরে কথা বলে আসছিল। ওই নম্বরগুলো তাঁরা যাচাই করে দেখেছেন, এগুলো তিন কারারক্ষী বিভিন্ন সময়ে ব্যবহার করেছে। ওই তিনটি নম্বরে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে বাইরে থেকে নিয়মিতই বড় অঙ্কের টাকাও কারাগারের ভেতর ঢুকছে। কথা বলা শেষ হলেই এগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়।

সিটিটিসি সূত্রের কাছ থেকে সমকাল ওই তিনটি নম্বর সংগ্রহ করেছে। গত বুধবার এগুলোতে ফোন দিয়ে বন্ধ পাওয়া গেছে। মোবাইল নম্বর ব্যবহারকারীর পরিচয় শনাক্তকারী অ্যাপস 'ট্রু-কলার' দিয়ে তাতে ফোন করা হলে একটির কোনো নাম পাওয়া যায়নি। অপর দুটি নম্বরে ডায়াল করলে 'ওয়ার্ড হেড আবুল কালাম আজাদ' নাম ভেসে আসে।

সন্ত্রাসীদের নজরদারি করা গোয়েন্দা সূত্র বলছে, মতিঝিলে ছিনতাই করে পালানোর সময়ে বাধা পেয়ে ডিবি পুলিশের দুই সদস্যকে গুলি করে হত্যা মামলার ফাঁসির দণ্ড পাওয়া আসামি ইদুল কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কারাগারের কনডেম সেলে বন্দি। তালিকাভুক্ত এই সন্ত্রাসী সেখান থেকেই মোবাইল ফোনে বাইরে নিজের সহযোগী সন্ত্রাসীদের নানা নির্দেশনা দিয়ে আসছে। সে যাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছে- এমন অন্তত পাঁচ সহযোগীকে চিহ্নিত করা হয়েছে। তাদের গতিবিধি নজরদারি করা হচ্ছে।

কারাগার থেকে বন্দি সন্ত্রাসীরা মোবাইল ফোন ব্যবহার করে বাইরে সহযোগীদের সঙ্গে কীভাবে কথা বলছে- জানতে চাইলে কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার পার্ট-২-এর সিনিয়র জেল সুপার (ভারপ্রাপ্ত) আমিরুল ইসলাম এ বিষয়ে মন্তব্য করতে চাননি।

অবশ্য কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার আবদুল জলিল সমকালকে বলেন, কোনো বন্দির অবৈধভাবে মোবাইল ফোনে কথা বলার সুযোগ নেই। এরপরও তাঁরা নানা সময়ে অভিযোগ পেয়ে থাকেন। সে অনুযায়ী সেলগুলোতে তল্লাশিও চালানো হয়। কিন্তু অভিযোগগুলো সুনির্দিষ্ট না হওয়ায় এই কার্যক্রমে সফলতা আসে না। যদিও মাঝেমধ্যে তাঁরা সন্দেহভাজন বন্দিদের সেলগুলোতে আকস্মিক অভিযান চালিয়ে থাকেন। এই কর্মকর্তা আরও বলেন, কারারক্ষীরা যখন বিভিন্ন সেলে দায়িত্ব পালন করতে যান, তখন তাঁদের মোবাইল ফোন ব্যবহারের সুযোগ থাকে না। বিষয়টি নিশ্চিতের জন্য দায়িত্ব পালনের শুরুতে সংশ্নিষ্ট কারারক্ষীর দেহ তল্লাশি করে ভেতরে ঢুকতে অনুমতি দেওয়া হয়। একইভাবে দায়িত্ব শেষ করে বের হওয়ার সময়েও দেহ তল্লাশি করা হয়। এরপরও সুনির্দিষ্টভাবে কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।