ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডের শীর্ষ সন্ত্রাসী সুমন শিকদার মুসা হঠাৎ করেই সংযুক্ত আরব আমিরাত (দুবাই) ছাড়লেন। তিন দিন আগে ওমানে চলে যান তিনি। বাংলাদেশে একাধিক মামলার আসামি মোস্ট ওয়ান্টেড মুসা সেখানেই স্থায়ীভাবে থাকার ফন্দি করছেন। মুসার দুবাই ছাড়ার বিষয়টি জানতে পেরেছে বাংলাদেশের একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা। তবে তাঁকে দেশে ফেরাতে আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে চিঠিও দেওয়া হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক সূত্র থেকে গতকাল এই তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের মতিঝিল বিভাগের ডিসি রিফাত শামীম সমকালকে বলেন, টিপু হত্যাকাণ্ডে মুসার বড় ধরনের ভূমিকা ছিল। তাঁকে ধরা গেলে এই হত্যার ব্যাপারে আরও অনেক তথ্য পাওয়া যেত।

ঢাকায় ইন্টারপোলের শাখা কার্যালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এআইজি (এনসিবি) মহিউল ইসলাম সমকালকে বলেন, মুসাকে ফেরাতে ইন্টারপোলের মাধ্যমে কাজ চলছে। ওমানের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। দ্রুতই এ ব্যাপারে আরও বিস্তারিতভাবে বলা যাবে।

মতিঝিল থানা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক জাহিদুল ইসলাম টিপু হত্যার পর ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডের দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী সুমন শিকদার মুসার নাম নতুনভাবে সামনে আসে। পুলিশের তদন্তে উঠে আসে ওই হত্যাকাণ্ডে ব্যবহূত অস্ত্র ও কিলার ভাড়া করে দিয়েছেন তিনি। কিলিং মিশনের ১২ দিন আগে ১২ মার্চ বাংলাদেশ থেকে গোপনে দুবাই চলে যান মুসা। সেখানে বসেই হত্যার ছক সাজানো হয়।

অতীত কর্মকাণ্ডের জন্য টিপু হত্যাকাণ্ডের আগে থেকেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে 'মোস্ট ওয়ান্টেড' হিসেবে পরিচিত মুসা।

পুলিশের একাধিক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা সমকালকে জানান, বিভিন্ন সময় বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে যাওয়া সন্ত্রাসীদের অধিকাংশ দুবাই গিয়ে আস্তানা তৈরি করে আছেন। সেখানে নিরাপদে বসেই ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ড নিয়ন্ত্রণ করছেন কেউ কেউ। শিষ্যদের মাধ্যমে চাঁদাবাজি ও টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করেন এমন সংখ্যাও অনেক। আবার কখনও কখনও সঙ্গীদের নিয়ে ইউরোপ ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশের পলাতক সন্ত্রাসীরা আসা-যাওয়া করেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গ্রেপ্তার আতঙ্কে আকস্মিকভাবে দুবাই ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন মুসা। দীর্ঘকাল ধরে দুবাই বসে একাধিক সন্ত্রাসী তাঁদের ঢাকার রাজত্ব চালিয়ে যাচ্ছেন। এর মধ্যে আছেন জিসান ও তাঁর ভাই শামীম। ২০১৯ সালে জিসান দুবাই পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হন। এরপর আবার জামিনে বেরিয়ে যান। এ ছাড়া ফ্রিডম মানিক নামে ঢাকার আরেক সন্ত্রাসীও দেশের বাইরে রয়েছেন। তাঁর সঙ্গে মুসার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক কর্মকর্তা জানান, জিসানসহ একাধিক সন্ত্রাসী বাংলাদেশি পাসপোর্ট ব্যবহার করা ছাড়াই বিদেশে অবস্থান করছেন। অনেকে দক্ষিণ আফ্রিকার পাসপোর্ট নিয়েছেন। তাই কখনও বিদেশে গ্রেপ্তার হলেও বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে প্রমাণ করে তাঁকে দেশে ফেরত আনা কষ্টসাধ্য হয়ে যায়।

জানা গেছে, ভারত ও থাইল্যান্ড ছাড়া আর কোনো দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের অপরাধী প্রত্যর্পণ চুক্তি নেই। তবে দুবাই থেকে বাংলাদেশ পুলিশের মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাগ্রিমেন্ট বা এমএলএর মাধ্যমে সেখানে পলাতক সন্ত্রাসীদের ফিরিয়ে আনা যাবে। আগে দুবাইকে বাংলাদেশকেন্দ্রিক শীর্ষ সন্ত্রাসীদের 'নিরাপদ জোন' মনে করলেও সম্প্রতি পরিস্থিতি কিছুটা বদলেছে। কীভাবে একাধিক সন্ত্রাসী সেখানে নিরাপদে অবস্থান করে ঢাকার অপরাধ জগৎ নিয়ন্ত্রণ করছেন, এমন তথ্যউপাত্ত দেশটির আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ইন্টারপোলের মাধ্যমে জানিয়েছে বাংলাদেশ। তাই পলাতক সন্ত্রাসীরা দুবাইয়ে কিছুটা অস্বস্তিতে আছেন। অনেকে নতুন ঠিকানা খুঁজছেন। ফলে দুবাই থাকা ঝুঁকিপূর্ণ মনে করায় ওমানে পালিয়েছেন মুসা।

পুলিশের একাধিক সূত্র জানায়, টিপু হত্যার অন্যতম পরিকল্পনাকারী মুসা ২০১৬ সালে মতিঝিলে যুবলীগ কর্মী রিজভী হাসান ওরফে 'বোঁচা বাবু' হত্যা মামলারও আসামি। মামলাটি মিটমাটের জন্য মুসাসহ ওই মামলার কয়েকজন আসামি টিপুর শরণাপন্ন হন। কারণ বাবুর বাবা আবুল কালামের সঙ্গে টিপুর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। দুবাই যাওয়ার পর মুসা আন্ডারওয়ার্ল্ডের সন্ত্রাসীদের মাধ্যমে শুটার নিয়োগ থেকে শুরু করে বিভিন্ন কর্মকা পরিচালনা করেন। নাসির, ওমর ফারুক ও কাইল্যা পলাশের কাছ থেকে টিপু হত্যা মিশনের আপডেট নিতেন।

মুসার বাংলাদেশি পাসপোর্টের তথ্য বলছে, তাঁর গ্রামের বাড়ি চট্টগ্রামে। মুসার বাবার নাম আবু সাঈদ শিকদার। ইমিগ্রেশনের তথ্য বলছে, ভ্রমণ ভিসায় বৈধ পথেই দেশ ছেড়েছেন তিনি। তার জন্ম ১৯৭৯ সালে। চলতি বছরের ২৩ ফেব্রুয়ারি তাঁর নামে ১০ বছর মেয়াদি পাসপোর্ট ইস্যু করা হয়েছে।