দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনেই ইভিএমের মাধ্যমে নাকি মিশ্র পদ্ধতিতে ভোট অনুষ্ঠিত হবে, এটাই হচ্ছে বর্তমান সময়ের সবচেয়ে আলোচিত বিষয়। নির্বাচন কমিশন সূত্র মতে, তাদের হাতে থাকা দেড় লাখ ইভিএম দিয়ে ১০০ থেকে ১১০ আসনে ভোট করা সম্ভব। ৩০০ আসনে একসঙ্গে ইভিএমে ভোট করতে হলে আরও প্রায় ৩ লাখ ইভিএম প্রয়োজন হবে। এখনও যেহেতু দেড়-দুই বছরের মতো সময় আছে, তাই যথাসময়ে সিদ্ধান্ত হলে আগামী নির্বাচন ইভিএমে করা সম্ভব। এ ক্ষেত্রে সব আসনে ইভিএম ব্যবহূত হলে একাধিক দিনে ভোট গ্রহণ করা যেতে পারে। এর আগে ব্যবহূত প্রতিটি ইভিএমের দাম পড়েছে প্রায় ২ লাখ ৩৫ হাজার টাকা। সে হিসাবে তিন লাখ নতুন ইভিএম সংগ্রহ করতে আরও ৮ হাজার কোটি টাকা লাগবে। একটি অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের লক্ষ্যে কমিশন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংলাপ করবেন এবং ইতোমধ্যেই বিভিন্ন অংশীজন যেমন শিক্ষাবিদ, বিশিষ্ট নাগরিক, পত্রিকার সম্পাদক ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকদের সঙ্গে সংলাপ করেছেন। এসব সংলাপে ইভিএম ব্যবহারের পক্ষে-বিপক্ষে মত এসেছে এবং ঐক্যমতের ভিত্তিতে ইভিএমের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা বলেছেন তারা।

সারাবিশ্বেই প্রযুক্তির ব্যবহার দিন দিন বেড়ে চলছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিপ, মেশিন লার্নিং, ইন্টারনেট অব থিংকস, ব্লকচেইন ইত্যাদি আধুনিক প্রযুক্তির মিশেলে চলছে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের মানুষ এখন ঘরে বসেই তার কর্মক্ষেত্র নিয়ন্ত্রণ করছে। বাংলাদেশেও শহর-গ্রাম-হাওর বিচ্ছিন্ন এলাকায় ডিজিটাল ডিভাইস এবং ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা বৃদ্ধি পেয়েছে। দেশ-বিদেশে ফোনে কথা বলা, বিকাশ, রকেট, নগদ ইত্যাদি মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে টাকা লেনদেন ও বিভিন্ন ইউটিলিটি বিল পরিশোধ করা ৮০ বছরের বৃদ্ধার জন্যও তেমন কোনো কঠিন কাজ নয়, অন্যান্য কাজেও প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতেই হবে। তবে সে প্রযুক্তি হতে হবে স্বচ্ছ, নির্ভরযোগ্য, ব্যবহারকারীবান্ধব ও বিতর্কের ঊর্ধ্বে। ইভিএম নিয়ে দেশে-বিদেশে বিতর্ক আছে। আমাদের দেশে এই বিতর্ক আরও প্রকট। ১ ফেব্রুয়ারির (২০২০) ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আঙুলের ছাপ দিয়েও কোনো কোনো ভোটার ভোট দিতে পারেননি। অনেক ক্ষেত্রে ভোটারদের আঙুলের ছাপ মেলেনি। প্রধান নির্বাচন কমিশনার নিজেই আঙুলের ছাপ দিয়ে ভোট দিতে পারেননি। 

নানা অনিয়ম ও অভিযোগের কারণে বিশ্বের অনেক দেশে এই পদ্ধতি বাতিল করেছে। নেদারল্যান্ডস ২০০৬ সালে, ২০০৯ সালে জার্মানি, আয়ারল্যান্ড ও ইতালি এ পদ্ধতি জনসাধারণের আপত্তির মুখে বাতিল করেছে। ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সও তাই করেছে। ইলেকট্রনিক ভোটিংয়ের কার্যকারিতা নিয়ে খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও প্রবল বিতর্ক আছে। বিশেষ করে ইভিএম এবং ডিআরই পদ্ধতিতে নির্বাচনী কারচুপির প্রমাণ পেয়েছে। যেহেতু ইভিএম একটি ইলেকট্রনিক যন্ত্র, এতে কারিগরি সমস্যা হতেই পারে কিন্তু যান্ত্রিক ত্রুটি ছাড়াও আমাদের দেশে ইভিএমকে ইচ্ছামতো ম্যানুপুলেট করার অভিযোগ আছে। চূড়ান্ত ফলাফলকে ওলটপালট করে নির্দিষ্ট কোনো প্রার্থীকে বিজয়ী ঘোষণা করা যায়, কোনো আপত্তি বা বিতর্ক হলে তা খতিয়ে দেখার রেকর্ড থাকে না এই যন্ত্রে। কারণ এটি শুধু রিড অনলি মেমোরি। ভোটারের ভোট কাঙ্ক্ষিত প্রার্থীর পক্ষে জমা হলো কিনা তাও বুঝার কোনো উপায় নেই; এই সমস্যা সমাধানের জন্য ভোটার ভেরিফাইড পেপার অডিট ট্রেইল (ভিভিপিএটি) সংযুক্ত হতে পারে ইভিএমের সঙ্গে। 

ভারতে এই পদ্ধতি দীর্ঘকাল ধরে ব্যবহার করে সফলতা পাচ্ছে। দেশে চলমান সুধীজনদের সঙ্গে সংলাপেও ভিভিপিএটি যুক্ত করার পরামর্শ এসেছে। এ ব্যবস্থায় একজন ভোটার ভোট দেওয়ার পর প্রতীক সংবলিত একটি প্রিন্টেড কাগজ স্বচক্ষে কিছুক্ষণ (সাত সেকেন্ড) দেখতে পায়। অতঃপর এই কাগজটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ইভিএমের সঙ্গে সংযুক্ত একটি বপে জমা হয়, যা প্রিসাইডিং অফিসার কর্তৃক সর্বস্বত্ব ফলে কারচুপি করার কোনো সুযোগ নেই এখানে। তাহলে বর্তমানে ব্যবহূত ইভিএমের সঙ্গে এই ভিভিপিএটি যন্ত্রটি যুক্ত করলেই ভোটারদের মধ্যে স্বস্তি ও আস্থা জন্মাবে আর এভাবেই ভোট গ্রহণে স্বচ্ছতা নিশ্চিন্ত হবে, দূর হবে সব ধরনের সন্দেহ ও অবিশ্বাস। 

তবুও ইভিএম ব্যবহারে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ আছে। বয়স্ক ভোটারদের প্রযুক্তিভীতি, দক্ষ জনবলের অভাব, কিছু ক্ষেত্রে ইভিএমে ভোটারের আঙুলের ছাপ না মেলা ও যান্ত্রিক ত্রুটি ইত্যাদি। আবার সংসদ ও স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন নির্বাচনে কাগজের ব্যালটের তুলনায় ইভিএমে ভোট পড়ার হারও কম দেখা গেছে। এর কারণ ইভিএম একটি নতুন যন্ত্র/পদ্ধতি কিংবা এটি বিকল হয়ে যাওয়া নয়। এটিকে নিজের ইচ্ছামতো চলতে না দেওয়া এবং নির্বাচনী পরিবেশ না থাকায় আরও যদি কোনো কারণ থাকে, তা চিহ্নিত করতে হবে। যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিলে দ্রুত আরেকটি ইভিএম প্রতিস্থাপন করতে হবে। প্রয়োজন হবে ইভিএম পরিচালনার জন্য দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করা। এত বিপুলসংখ্যক অভিজ্ঞ কর্মী বা ইঞ্জিনিয়ার কমিশনে নেই। সে জন্য সদ্য পাস করা বিএসসি ইঞ্জিনিয়ার এবং কমিশনে থাকা অভিজ্ঞ ট্রেনিংপ্রাপ্ত কর্মীদের সমন্বয়ে একটি টিম তৈরি করা যেতে পারে। কীভাবে ইভিএমে ভোট দিতে হয়, তা এলাকার ভোটারদের নিয়ে বছরব্যাপী প্রশিক্ষণ ও হাটে-বাজারে জারি গান, গম্ভীরা ও পুঁথি পাঠ, পোস্টার, কার্টুন ইত্যাদি প্রদর্শন এবং গণমাধ্যমে বারবার প্রচার করার ব্যবস্থা করতে হবে, ভোট চলাকালে ইভিএম যন্ত্রটিকে যারা নিয়ন্ত্রণ করবে তারা দেশের গণতন্ত্র এবং ভোটারদের সাংবিধানিক অধিকার সমুন্নত রাখার ওপর জোর দিতে হবে। যথাস্থানে বাটন প্রেস করে মানুষ যেন তার ভোটটি কাঙ্ক্ষিত প্রার্থীর অনুকূলে দিতে পারে সেই সুযোগটি নিশ্চিন্ত করতে হবে, তবেই ইভিএমের প্রতি মানুষের আস্থা বাড়বে, নির্বাচন কমিশন ফিরে পাবে তাদের হারানো সম্মান এবং ঐতিহ্য। অতিসম্প্রতি নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে সবার আন্তরিকতায় এবং সহযোগিতায় ইভিএম দিয়ে স্বচ্ছ ভোট হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়েছে। ইভিএমের সব ভুল ত্রুটি বিশ্নেষণ করে ভবিষ্যতে আরও সতর্কতা অবলম্বন করে ৩০০ আসনেই ভোট নেওয়া সম্ভব। কোনোভাবেই ইভিএম থেকে একেবারে সরে আসা ঠিক হবে না। কমিশন চাইলে সব আসনে ভিভিপিএটি যুক্ত ইভিএম দিয়ে অথবা উভয় পদ্ধতিতেই নির্বাচন করতে পারে, যা একান্তই তাদের এখতিয়ার।