টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট (এসডিজি) বাস্তবায়নে বাংলাদেশের অগ্রগতি ভালো দাবি করা হলেও এর হালনাগাদ তথ্য-উপাত্তের বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ওয়েবসাইট 'এসডিজি ট্রাকার' নামে তথ্য ভান্ডার রয়েছে। এখানে কয়েক বছরের পুরোনো তথ্য রয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ২০১৯ সালের তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। যদিও বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ, দপ্তর তাদের সঙ্গে এসডিজির যে অংশ সম্পর্কিত, সেগুলোর বাস্তবায়ন অগ্রগতি প্রকাশ করে। সে ক্ষেত্রে অধিকাংশ তথ্য ২০২০ সালের। কোনো কোনো মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও দপ্তর ২০২১ সালের তথ্যও প্রকাশ করেছে।

তথ্যের এমন ঘাটতির মধ্য দিয়ে আজ সোমবার থেকে শুরু হচ্ছে এসডিজির বাস্তবায়ন পর্যালোচনা নিয়ে দ্বিতীয় জাতীয় সম্মেলন। তিন দিনের এ আয়োজন করেছে পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের গভর্ন্যান্স ইনোভেশন ইউনিট। বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এ সম্মেলন উদ্বোধন করার কথা রয়েছে।

এসডিজি ট্রাকার পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, অধিকাংশ অভীষ্টে ২০১৯ সালের তথ্য রয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে আরও পুরোনো তথ্য দেখানো হচ্ছে। পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেছেন, করোনার কারণে অনেক কিছুই সময় মতো করা সম্ভব হয়নি। কয়েকটি জরিপ পিছিয়ে গেছে। বিশেষ করে খানা আয়-ব্যয় জরিপ, শ্রম জরিপ সময় মতো করা হয়নি। এখন জনশুমারি করার প্রস্তুতি চলছে। ফলে অনেক তথ্যই হালনাগাদ নেই। এর আগে ২০২০ সালে এসডিজি অর্জনের অগ্রগতি প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। সেখানে ২০১৯ সালের তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে।

এসডিজি হচ্ছে বিশ্ব মানবতার সমৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যে জাতিসংঘ কর্তৃক ঘোষিত একটি কর্মপরিকল্পনা। এর মূল প্রতিশ্রুতি হলো, কাউকে পেছনে ফেলে রাখা যাবে না। এ প্রতিশ্রুতি পূরণে মূল ১৭টি অভীষ্ট ঠিক করা হয়েছে। অভীষ্টগুলো হচ্ছে- দারিদ্র্য ও ক্ষুধা দূর, সুস্বাস্থ্য, অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা, লিঙ্গসমতা ও নারীর ক্ষমতায়ন, নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন, সাশ্রয়ী জ্বালানি, টেকসই প্রবৃদ্ধি, শিল্প ও অবকাঠামো, অসমতা হ্রাস, টেকসই শহর ও জনপদ, পরিমিত ভোগ, জলবায়ু কার্যক্রম, জলজ জীবন, স্থলজ জীবন, শান্তি, ন্যায় বিচার ও টেকসই উন্নয়নে বৈশ্বিক অংশীদারিত্ব। এর অধীনে রয়েছে ১৭২টি লক্ষ্যমাত্রা, যা ২০৩০ সালের মধ্যে বাস্তবায়নের কথা।

এ বিষয়ে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ও এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম বাংলাদেশের কোর গ্রুপের সদস্য অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান সমকালকে বলেন, বৈশ্বিকভাবে যখন এসডিজি বাস্তবায়নের স্বেচ্ছা পর্যালোচনা শুরু হয়, তখন থেকেই বাংলাদেশ তা করে আসছে। এই পর্যালোচনার জন্য উচ্চ পর্যায়ের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন কমিটিও গঠন করা হয়েছে। দ্বিতীয় পর্যালোচনার আয়োজন খুবই ভালো উদ্যোগ। এসডিজি বাস্তবায়নকে অন্যান্য অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশ গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে। ফলে এসডিজির অভীষ্ট বাস্তবায়ন অগ্রগতির পর্যালোচনা পরিবীক্ষণের দিক থেকে ভালো। ফলাফলের দিক দিয়ে সবচেয়ে দ্রুতগতির বাস্তবায়নের স্বীকৃতিও পেয়েছে বাংলাদেশ। তবে করোনার প্রভাব দারিদ্র্য, ক্ষুধা, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন অভীষ্টে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।

এসডিজি বাস্তবায়নের গড় অগ্রগতি ভালো হলেও 'কাউকে পেছনে ফেলে নয়' যে ধারণা, সেখানে আরও অগ্রগতি দরকার। প্রান্তিক মানুষ সুযোগ পাচ্ছেন কিনা দেখা দরকার। পেছনে পড়া মানুষকে এগিয়ে আনতে আরও অনেক পদক্ষেপ দরকার। পাশাপাশি কিছু সূচকে অগ্রগতি ভালো হলেও মান নিয়ে প্রশ্ন আছে। বিশেষ করে শিক্ষায়। পঞ্চম বা অষ্টম শ্রেণি পাসের সংখ্যা অনেক ভালো। কিন্তু শিক্ষার্থীদের বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান অনেক ক্ষেত্রেই সন্তুষ্ট পর্যায়ের নয়। ফলে এসডিজি অর্জনের পরিমাপ পদ্ধতিতে চ্যালেঞ্জ রয়েছে। তিনি বলেন, এসডিজি বাস্তবায়নের দ্বিতীয় পাঁচ বছর শুরু হয়েছে। বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করতে হবে। সরকার যে ৩৯টি প্রথম শ্রেণির অগ্রাধিকার ঠিক করেছে, তার বাইরেও নজর দিতে হবে। আর সে জন্য শুধু সরকার নয়, পুরো সমাজ ব্যবস্থাকে সম্পৃক্ত করে বাস্তবায়ন করতে হবে। এ জন্য সরকারি-বেসরকারি খাতের মধ্যে সমন্বয় দরকার।

এর আগের পর্যালোচনায় দেখা গেছে, লক্ষ্যগুলোর মধ্যে পরিমিত ভোগ ও টেকসই উৎপাদন ধরন নিশ্চিত করা এবং জলবায়ু পরিবর্তন ও এর প্রভাব মোকাবিলায় জরুরি কর্মব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এগিয়েছে। এদিকে দারিদ্র্য নিরসনে বাংলাদেশ ঠিক পথে থাকলেও করোনার কারণে তা নতুন করে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।