কোণঠাসা হয়ে থাকলেও বাংলাদেশে ধর্মপন্থি দলগুলোর মধ্যে এখনও জামায়াতে ইসলামী সবচাইতে বড় ও সংগঠিত দল। এর বাইরেও, বিশেষত তথাকথিত 'সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ' শুরু হওয়ার পর থেকে নিত্যনতুন সংগঠনের নাম শোনা যায়। তবে এর কোনটা আসল বা কোনটা নকল তা বলা কঠিন। 'জঙ্গি' বা 'সন্ত্রাসী' দমনের নামে যুক্তরাষ্ট্রের 'সন্ত্রাস দমন' মডেলে প্রবেশ করেছে বাংলাদেশও। একই উদ্দেশ্য সামনে রেখে ভারতের সঙ্গেও যৌথ কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। এই মডেলে প্রবেশের অর্থ যে জঙ্গি ও সন্ত্রাসীর বর্ধিত পুনরুৎপাদন এবং সন্ত্রাসের চিরস্থায়ীকরণ- তা আমাদের অভিজ্ঞতায় আছে।
জঙ্গি, ইসলামী সন্ত্রাসী বলে যে প্রচার 'সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের' মূল ভিত্তি, তাতে তিন ধরনের ইসলামপন্থি গোষ্ঠীর বা 'সন্ত্রাসী'র দেখা পাওয়া যাচ্ছে। প্রথমত, আসলেই কিছু ইসলামপন্থি গ্রুপ সক্রিয়ভাবে কাজ করছে, যারা 'ইসলামী রাষ্ট্র' 'খিলাফত' প্রতিষ্ঠায় রাজনৈতিক কার্যক্রম চালাচ্ছে। এদের কেউ কেউ সন্ত্রাসী পথই সঠিক মনে করে। তবে সবাই 'সন্ত্রাসী' পথ অনুমোদন করছে, তা নয়। পশ্চিমা ব্যবস্থার তারা বিরোধিতা করে নিজেদের বুঝমতো ইসলামী হুকুমত কায়েম করতে চায়। তবে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন, তার যে মানুষ ও পরিবেশ বিধ্বংসী চরিত্র; তারা সেটার বিরোধিতা করে, না ধর্মীয় বিচারে নির্দিষ্টভাবে খ্রিষ্টান ও ইহুদিদের বিরোধিতা করে- সেটা একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। এ বিষয়ে সবার অভিন্ন বৈশিষ্ট্য পাওয়া যায় না। অধিকাংশের বিরোধিতা ধর্মীয় বিবেচনায়। সে কারণে সাম্রাজ্যবাদের মূল শক্তি তাদের ধরাছোঁয়ার বাইরেই থাকে।
দ্বিতীয়ত, আরেকটি ইসলামপন্থি ধারার নাম আমরা প্রচারণায় পাই, যারা বিভিন্ন দেশে গোয়েন্দা সংস্থার পালিত গোষ্ঠী বলে ধারণা করা যায়। বিভিন্ন সময়ে তাদের ব্যবহার করা হয়, যা অনেক সন্ত্রাসী ঘটনা নিয়ে সরকারের রহস্যজনক ভূমিকা থেকে পরিস্কার হয়। এসব ঘটনার কোনো কূলকিনারা পাওয়া যায় না। কিন্তু সেগুলো দেখিয়েই দেশে দেশে নতুন নতুন নিপীড়ন ও নিয়ন্ত্রণমূলক চুক্তি, বিধি ও নীতি তৈরি হতে থাকে।
তৃতীয়ত, মিডিয়ার মাধ্যমে নির্মিত। এসব প্রচারণার মাধ্যমে আতঙ্ক তৈরি এবং নিপীড়নমূলক ব্যবস্থা, সামরিকীকরণ, নিরাপত্তা বাণিজ্য সবই বৈধতা পায়। আতঙ্ক এখন সাম্রাজ্যবাদী বিশ্ব রাজনীতি এবং লুটেরা দেশীয় রাজনীতির প্রধান অবলম্বন। খুবই পরিকল্পিত ও একচেটিয়া প্রচারণার কারণে ইউরোপ-আমেরিকার মানুষের মধ্যেও আতঙ্ক আর মুসলিমবিদ্বেষ দিন দিন বিস্তৃত হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, ভারতসহ মুসলিম সংখ্যালঘু দেশগুলোতে মুসলিম নিরাপত্তাহীনতা বাড়ছে। মুসলিম পোশাক, মুসলিম নাম, দাড়ি, হিজাব, বোরকা দেখলেই অনেকের মধ্যে প্রচণ্ড প্রতিক্রিয়া হয়; বর্ণবাদ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। এই প্রবণতা মুসলমান জনগোষ্ঠীকেও ধর্মীয় পরিচয়কে গুরুত্ব দেওয়ার দিকে ঠেলে দেয়।
এই পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের সামনে এখন হাজির কমপক্ষে পাঁচ ধরনের বিপদ। প্রথম বিপদ হলো সাম্রাজ্যবাদ। ৯০-পরবর্তী সাম্রাজ্যবাদের অস্তিত্বের জন্য বড় আশ্রয়, যুক্তি কিংবা উপলক্ষ হলো ইসলামী জঙ্গি বা সন্ত্রাসী। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর তার সামনে দৃশ্যমান এবং উপস্থাপন করার মতো শত্রু নেই, যাকে দেখিয়ে নিজের সব অপকর্ম সে জায়েজ করতে পারে। তাদের যে সামরিক অবকাঠামো ও বিনিয়োগ, তার যৌক্তিকতা কী, যদি বড় কোনো শত্রু না থাকে? যুক্তরাষ্ট্রের মানুষকে ক্ষুধার্ত রেখে; শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত রেখে বিভিন্ন বৃহৎ ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর স্বার্থে সমরাস্ত্র, যুদ্ধ আগ্রাসনের পেছনে বিপুল ব্যয় কীভাবে যুক্তিযুক্ত হবে? সুতরাং 'শত্রু' বাঁচিয়ে রাখা; কোথাও না থাকলে সেখানে তৈরি করা সাম্রাজ্যবাদীদের জন্য আবশ্যিক। তার হাত ধরেই তাদের অগ্রযাত্রা। সুতরাং এই পরিস্থিতি সামনে আরও জটিল হবে। কারণ, বাংলাদেশ-ভারতের মতো দেশগুলোর শাসক শ্রেণিও এ মডেলেই অগ্রসর হচ্ছে।
দ্বিতীয় বিপদ হলো ইসলাম ও মুসলিম বিদ্বেষ। বিশ্বজুড়ে মুসলিম ও ইসলামবিদ্বেষ ছড়িয়ে বিশ্বের মুসলমান সমাজকে যেভাবে ঘা দেওয়া হচ্ছে; আহত করা হচ্ছে, তার প্রতিক্রিয়া হচ্ছে সম্প্রদায়গতভাবেই। এর ফলে ধর্মীয় রাজনীতির ভূমিই উর্বর হচ্ছে। ধর্মবিশ্বাসী বা নিয়মিত ধর্ম পালনকারী নয় এমন ব্যক্তিরাও হয়ে উঠছে ধর্মীয় রাজনীতির সমর্থক। সে জন্য আমরা পশ্চিমা দেশগুলোতে, ইংলিশ মিডিয়াম প্রতিষ্ঠান বা সমাজের সচ্ছল অংশগুলোতেও ইসলামপন্থি রাজনীতির প্রভাব বাড়তে দেখছি।
তৃতীয় বিপদ, দেশের মূলধারার রাজনীতি। বৃহৎ রাজনৈতিক দুটি দল এবং তাদের জোট ক্ষমতা ও ভোটের রাজনীতিতে বিজয় অর্জনের জন্য প্রতিযোগিতা করে ধর্মপন্থি রাজনীতির ওপর ভর করেছে। ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহার বৃদ্ধি করেছে। দেশের লুটেরা চোরাই কোটিপতিদের রাজনৈতিক প্রতিনিধি এ দুই দল বা জোট। বাংলাদেশে বিভিন্ন ধর্মীয় গোষ্ঠী, মাদ্রাসার শিক্ষক-শিক্ষার্থী, পীরদের 'রিজার্ভ আর্মি' হিসেবে নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবহার করতে গিয়ে দুই প্রধান ধারার ভোটের রাজনীতি এখন এক কদর্য রূপ গ্রহণ করেছে। এ রকম পরিস্থিতিতে দেশের জনস্বার্থবিরোধী বিভিন্ন চুক্তি ও তৎপরতা অনেক নিরাপদ হচ্ছে। শাসক শ্রেণির এ দুই অংশের প্রতিযোগিতা ও পৃষ্ঠপোষকতা, তাদের আসা-যাওয়ার দুষ্টচক্র অন্য বিকল্পের অভাবে ধর্মপন্থি উগ্র অসহিষ্ণু রাজনীতি ও তাদের এজেন্ডাকেই শক্তিশালী করছে।
চতুর্থ বিপদ, ভারতের রাষ্ট্র ও রাজনীতি। ভারতে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি ও সাম্প্রদায়িকতার প্রসার বাংলাদেশে ইসলামপন্থি রাজনীতি এবং সাম্প্রদায়িকতাকে উস্কানি দিচ্ছে, সহায়তা করছে। ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের মধ্য দিয়ে সাম্প্রদায়িকতার যে বিষবাষ্প তৈরি হয়েছিল, তার রেশ তো আছেই, সেই সঙ্গে ভারতের আগ্রাসী রাজনীতি ও অর্থনীতিও এ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে।
পঞ্চম বিপদ, বিপ্লবী, বামপন্থি বা জনপন্থি রাজনীতির দৈন্য দশা। সমাজ-অর্থনীতির এই গতি ও বৈপরীত্য অর্থাৎ প্রাচুর্য ও দারিদ্র্য, সমৃদ্ধি ও বঞ্চনা, সম্ভাবনা ও হতাশা, নিপীড়ন ও নিরাপত্তাহীনতা, চিকিৎসা বাণিজ্য ও চিকিৎসাহীনতা ইত্যাদির গোলক ধাঁধার শিকার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ। এর থেকে মুক্তির পথ খোঁজা মানুষের তাই অবিরাম তাগিদ। দেশে লুটেরা ও চোরাই কোটিপতিদের রাজনৈতিক আধিপত্যকে মোকাবিলা ও পরাজিত করার মতো রাজনৈতিক শক্তিই মানুষের আকাঙ্ক্ষা। কিন্তু তা বামপন্থিদের নেই। বরং তাদের বড় অংশ একের পর এক আপস ও আত্মসমর্পণ করে নিজেদের স্বাতন্ত্র্য ও গ্রহণযোগ্যতা নষ্ট করেছে। সমাজে তাই দিশাহীনতা, হতাশা ও অনিশ্চয়তা। পাঁচ নম্বরে উল্লেখ করলেও এটাই আসলে প্রধান সমস্যা। কেননা, এই বিপদ দূর হলে আগের চারটি বিপদ মোকাবিলা করা বাংলাদেশের জনগণের জন্য খুবই সম্ভব। শ্রমিক, নারী, শিক্ষার্থী, জাতীয় সম্পদ নিয়ে ছোট-বড় বিভিন্ন জনপ্রতিরোধে তার প্রমাণ পাওয়া যায়।
প্রশ্ন উঠতে পারে- উপায় কী? দেশে-বিদেশে এখন আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তা সব ধরনের সক্রিয়তার পথ আগলে আছে। জনগণের মুক্তির লড়াই ছিন্ন ও বিচ্ছিন্ন। পুঁজিবাদী বিশ্বায়নের বর্তমান গতি ও জাল, তার অন্তর্গত সংকটের কারণেই কার্যত এক বৈশ্বিক ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার মধ্যে নিয়ে গেছে বিশ্বের সব প্রান্তের মানুষকে। পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থার ফ্যাসিবাদী আবহাওয়ার মধ্যে, কোথাও তার সহযোগী হিসেবে, কোথাও তার বিরোধিতা করতে গিয়ে বিভিন্ন চরিত্রের ধর্মপন্থি রাজনীতির বিস্তার ঘটছে। কিন্তু ধর্মপন্থি রাজনীতি তার কাঠামোগত ও মতাদর্শিক সীমাবদ্ধতার কারণেই। বর্তমান দানবীয় বিশ্বব্যবস্থার বিরুদ্ধে সব মানুষের একটি মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠার লড়াই এগিয়ে নিতে সক্ষম নয়, বরং বর্তমান ধরনে এই রাজনীতির বিস্তার দেশে দেশে মানুষের মুক্তির লড়াইকে বাধাগ্রস্ত করে বিশ্বের শোষক, নিপীড়ক, যুদ্ধবাজ জালেমদের শক্তিকেই স্থায়িত্ব দিচ্ছে। যারা জালেমদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ইচ্ছা নিয়ে এখানে শরিক হয়েছেন; জালেমের জাল সম্পর্কে তাদের মোহমুক্তি সবার জন্যই জরুরি।
এই শৃঙ্খল থেকে দুনিয়া ও মানুষের মুক্তির জন্য শ্রেণি, ধর্ম-বর্ণ, লিঙ্গ-জাতিগত বৈষম্য ও নিপীড়নবিরোধী বৈশ্বিক মানুষের ঐক্যবদ্ধ লড়াই অপরিহার্য। ধর্ম-বর্ণ, জাতিগত গণ্ডি অতিক্রম করে মানবিক নতুন পরিচয়ে নিজেদের সংহতি দাঁড় করানো দরকার। তা গড়ে ওঠার প্রক্রিয়া এখনও নানা বাধার মুখে। তবে নতুনভাবে নির্মিত হওয়ার লক্ষণও বিশ্বজুড়ে মাঝেমধ্যে দেখা দিচ্ছে। এই সংহতি ছাড়া কোনো ধর্মের মানুষেরই মুক্তি নেই। মুক্তি নেই ধর্মপন্থিদেরও। প্রতিকূলতা ও সংকটেই নতুন সৃষ্টির সময় আসে। প্রবল প্রতিকূলতা আর অনিশ্চয়তা সত্ত্বেও সেখানেই আমাদের চিন্তা ও সক্রিয়তা যোগ করতে হবে।
আনু মুহাম্মদ :অর্থনীতিবিদ; অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়