দিনভর নাটকীয়তার পর কুমিল্লা সিটি করপোরেশন (কুসিক) নির্বাচনে স্বতন্ত্র (বিদ্রোহী) প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষণাবিষয়ক উপকমিটির সদস্য মাসুদ পারভেজ খান ইমরান। তিনি আওয়ামী লীগ নেতা প্রয়াত অধ্যক্ষ আফজল খানের বড় ছেলে এবং সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য আঞ্জুম সুলতানা সীমার ভাই। গতকাল মঙ্গলবার শেষ সময়ে এসে রিটার্নিং অফিসারের কাছে তাঁর পক্ষে মনোনয়নপত্র জমা দেন শিক্ষক জসিম উদ্দিন আহমেদ। আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন না পেয়ে ইমরান স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ায় ভোটের মাঠে নতুন করে উত্তাপ ছড়াতে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্নেষকরা।

গতকাল ছিল কুমিল্লা সিটি করপোরেশন, ছয়টি পৌরসভা ও ১৩৫টি ইউনিয়ন পরিষদের সাধারণ নির্বাচনে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিন।

এদিকে, শেষ দিনে নৌকার প্রার্থী ও মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আরফানুল হক রিফাত, স্বতন্ত্র প্রার্থী বিএনপি নেতা মনিরুল হক সাক্কুর পক্ষে তাঁর ছোট ভাই মো. কাইমুল হক রিংকু এবং কুমিল্লা মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি নিজাম উদ্দীন কায়সার মনোনয়নপত্র জমা দেন। এ ছাড়া মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের রাশেদুল ইসলাম ও নাগরিক কমিটির প্রার্থী কামরুল আহসান বাবুল।

সংশ্নিষ্ট সূত্রে জানা যায়, কুমিল্লা মহানগর আওয়ামী লীগে এমপি হাজি আ. ক. ম. বাহাউদ্দিন ও প্রয়াত আফজল খান পরিবারের রাজনৈতিক বিরোধ দীর্ঘদিনের। কুসিক নির্বাচনে নৌকার যে ১৪ জন মনোনয়ন চেয়ে দলীয় সভাপতির কাছে আবেদন করেন, এর মধ্যে আফজল খানের ছেলে ইমরানও ছিলেন। এ ছাড়া ইমরানের বোন এমপি সীমাও চেয়েছিলেন দলীয় মনোনয়ন। তবে নৌকার মনোনয়ন পান আরফানুল হক রিফাত। তিনি সদর আসনের এমপি ও মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি বাহাউদ্দিনের অনুসারী। নগরীতে এখন এমপি সীমা-ইমরান খান গ্রুপের সঙ্গে এমপি বাহার গ্রুপের সম্পর্ক সাপে-নেউলে। মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষক্ষণে এসে নাটকীয়ভাবে ইমরান ভোটের মাঠে থাকার সিদ্ধান্তের বিষয়টি গণমাধ্যমকে জানান।

মাসুদ পারভেজ খান ইমরান বলেন, 'আমি বিদ্রোহী প্রার্থী না, স্বতন্ত্র পদে নির্বাচনে মাঠে থাকব। আমার অনেক নেতাকর্মী, অনুসারী ও সাধারণ জনগণ চাচ্ছে আমি নির্বাচনে থাকি। তাঁদের অনুরোধে নির্বাচন করতে হচ্ছে।' তিনি আরও বলেন, 'সিটি করপোরেশন প্রতিষ্ঠার পর নগরী রীতিমতো একটি ডাস্টবিনে পরিণত হয়েছে। আমি জয়ী হতে পারলে যানজট, জলাবদ্ধতাসহ নাগরিক সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নেব।'

ইমরানের প্রার্থী হওয়ার ব্যাপারে নৌকার প্রার্থী আরফানুল হক রিফাত বলেন, 'আওয়ামী লীগের একজন ছোট কর্মীও যদি দলের মনোনয়নের বাইরে গিয়ে নির্বাচন করে, এটা স্বতন্ত্র নয়, বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে ধরে নেওয়া হয়। ফলে কেউ দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে নির্বাচন করলে বিষয়টি কেন্দ্রীয় নেতারা দেখবেন। এ নিয়ে আমার বেশি কিছু বলার নেই।'

এদিকে বিএনপিতেও সাক্কু ও ইয়াছিনের মধ্যে রয়েছে বিরোধ। ২০০৯ সালের ২৪ নভেম্বর কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা বিএনপির সম্মেলনে সাক্কুকে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকের পদ দেওয়া হয়। এর পর থেকে তাঁদের মধ্যে দ্বন্দ্ব। সাক্কু ২০১২ ও ২০১৭ সালে দু'বারের মেয়র।
মনিরুল হক সাক্কু বলেন, 'যে কেউ মনোনয়নপত্র দাখিল করতেই পারে। আমি তো এখনও প্রচারণাই শুরু করিনি। মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই হবে বৃহস্পতিবার। আমার মনোনয়ন বৈধ হওয়ার পর দলের কাছে অব্যাহতি চাইব। এর আগে আমাকে দল থেকে বহিস্কার করলে কিছুই করার নেই।'
অন্যদিকে নিজাম উদ্দিন কায়সার বলেন, 'নগরবাসী পরিবর্তন চায়। এখন তারুণ্যের সময়। আমার ভক্ত-অনুসারী ও সাধারণ ভোটারদের অনুরোধে বিএনপি করলেও স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছি। আশা করি, জয়ী হবো।'

নৌকা প্রার্থীর ১০ কোটি টাকার ক্ষতিপূরণ মামলা :কুসিক নির্বাচনে নৌকার মেয়র প্রার্থী আরফানুল হক রিফাত ভোরের কাগজের প্রকাশক, সম্পাদকসহ পাঁচজনের নামে মানহানির অভিযোগে ১০ কোটি টাকার ক্ষতিপূরণ মামলা করেছেন। গতকাল দুপুরে তিনি বাদী হয়ে কুমিল্লার প্রথম যুগ্ম জেলা জজ আদালতে মামলাটি করেন। আদালতের বিচারক আবদুল হান্নান অভিযোগটি আমলে নিয়ে বিবাদীদের প্রতি সমন জারি করেন। মামলাটির কার্যক্রমের পরবর্তী দিন ধার্য করা হয়েছে আগামী ৩ জুলাই। ১৫ মে ওই পত্রিকার প্রথম পাতায় 'কুমিল্লার শীর্ষ মাদক কারবারি রিফাত এখন নৌকার কাণ্ডারি' শিরোনামে একটি সংবাদ প্রকাশিত হলে বিভিন্ন মহলে তোলপাড় শুরু হয়।

এর আগে সকালে নৌকার প্রার্থী রিফাতের পক্ষে টাউন হল মিলনায়তনে মহানগর আওয়ামী লীগের ব্যানারে সাংবাদিকদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হয়।

কালকিনিতে এক ইউনিয়নের ভোট স্থগিত :স্বতন্ত্র চেয়ারম্যান প্রার্থী নিয়ামুল আকনকে মনোনয়নপত্র জমা দিতে বাধা দেওয়া এবং রিটার্নিং কর্মকর্তার ওপর হামলার জের ধরে মাদারীপুরের কালকিনির পূর্ব এনায়েতনগর ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন স্থগিত করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। একই সঙ্গে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তদন্ত করে এই ঘটনায় জড়িতদের বিষয়ে ইসিতে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য মাদারীপুরের জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপারসহ সংশ্নিষ্টদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। গতকাল বিকেলে নির্বাচন কমিশনের যুগ্ম সচিব (জনসংযোগ) এসএম আসাদুজ্জামানের পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।