বঙ্গবন্ধু পরিবারের সদস্যসহ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নাম ব্যবহার করে বিভিন্ন ব্যক্তি ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রতারণা করে আসছিল একটি চক্র। তারা সরকারের নানা রকম প্রকল্পের কাজ পাইয়ে দেওয়ার নামে হাতিয়ে নিত মোটা অঙ্কের টাকা। এভাবে গত তিন বছরে তারা অন্তত দুই কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে। চক্রের দুই সদস্যকে গ্রেপ্তারের পর বুধবার এসব তথ্য জানায় র‌্যাব।

গ্রেপ্তার দু'জন হলো- প্রতারক চক্রের মূল হোতা মনসুর আহমেদ ও মহসিন চৌধুরী। মঙ্গলবার রাতে জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই) ও র‌্যাব-৩ রাজধানীর পল্টন এলাকা থেকে তাদের গ্রেপ্তার করে। অভিযানে প্রতারণার কাজে ব্যবহূত বিভিন্ন দলিল ও ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট জব্দ করা হয়।

এ ব্যাপারে বিস্তারিত জানাতে বুধবার সকালে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে র‌্যাব মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। এতে র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, গ্রেপ্তাররা সংঘবদ্ধ চক্রের সদস্য। এই চক্রে ৫-৭ জন সদস্য রয়েছে। তাদের মধ্যে মূল হোতা মনসুর। তারা প্রায় ৩-৪ বছর ধরে বিভিন্ন প্রকল্পে কাজ পাইয়ে দেওয়ার নামে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রতারণা করে আসছিল। তারা নতুন সিমকার্ড কিনে বঙ্গবন্ধু পরিবারের সদস্যসহ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নামে সেভ করত। এরপর ওই ব্যক্তি সেজে নিজেদের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চ্যাট করত। চক্রের সদস্যদের মোবাইল ফোন নম্বর মূল হোতা ও তার সহযোগীর মোবাইল ফোনে বঙ্গবন্ধু পরিবারের সদস্যদের নাম ও ছবি দিয়ে সেভ করা থাকত। পরে তারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিজেদের মধ্যে সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ পাইয়ে দেওয়ার ব্যাপারে চ্যাট করত। এই কথোপকথন এমনভাবে করা হতো যেন কোনো ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান দেখলে মনে করে তারা এর আগে অনেক কাজ পাইয়ে দিয়েছে। আর তাদের সঙ্গে বঙ্গবন্ধু পরিবারের সদস্যদের খুবই ভালো সম্পর্ক রয়েছে। এই চক্রের সদস্য সাইফুল বর্তমানে সংযুক্ত আরব আমিরাতে আছে। সে নিজেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব পরিচয় দিয়ে বিভিন্ন প্রকল্পের কাজ পাইয়ে দেওয়ার মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিত। বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জনের জন্য গ্রেপ্তাররা বঙ্গবন্ধু পরিবারের সদস্যসহ রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে তাদের ছবি আগ্রহী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে দেখাত। নিজেদের কোম্পানিকে প্রতিষ্ঠিত ও স্বনামধন্য হিসেবে উপস্থাপন করার লক্ষ্যে তারা হাজার হাজার কোটি টাকার ভুয়া ব্যাংক গ্যারান্টি দেখাত। তারা কোনো অফিসে বৈঠকের সময় বেশভূষা পরিবর্তন করে দামি গাড়ি ও বডিগার্ড নিয়ে যেত।

র‌্যাবের এ কর্মকর্তা জানান, গ্রেপ্তাররা সরকারের চলমান প্রকল্পগুলোয় কাজ পাওয়ার যোগ্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান খুঁজে বের করত। তাদের ১০ শতাংশ হারে কমিশনের বিনিময়ে কাজ পাইয়ে দেওয়ার প্রলোভন দেখানো হতো। এ সময় তারা নিজেদের প্রমাণের জন্য চলমান সরকারি প্রকল্পে কাজ পেয়েছে এমন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নাম উল্লেখ করে তাদের কাজ পাইয়ে দিয়েছে বলে দাবি করত। একপর্যায়ে তারা বিভিন্ন ভুয়া প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে করা চুক্তিপত্র, ভুয়া ব্যাংক গ্যারান্টি দেখাত। এভাবে তারা তিতাস নদী ড্রেজিং, আড়িয়াল খাঁ ড্রেজিং ও নদীর তীর রক্ষা বাঁধ প্রকল্প, ঢাকা মহানগর উত্তর সিটি করপোরেশনের ড্রেনের সংস্কার, রাজধানীর বিভিন্ন সরকারি অফিস কনস্ট্রাকশনের কাজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের কনস্ট্রাকশনের কাজসহ অন্যান্য উন্নয়নমূলক প্রকল্পের কাজ পাইয়ে দেওয়ার নামে প্রতারণার পরিকল্পনা করেছিল।

র‌্যাব জানায়, গ্রেপ্তার মনসুর প্রথমে এলাকায় জমির দালালি করত। পরে সে ঢাকায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি নেয়। সেখানে কর্মরত অবস্থাতেই প্রতারণার বিষয়টি তার মাথায় আসে। ওই এজেন্সির এক কর্মচারীর মাধ্যমে সাইফুলের সঙ্গে পরিচয় হলে সে প্রতারণা চক্রটি গড়ে তোলে।