প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, বিএনপির নির্বাচন নিয়ে কথা বলার কোনো অধিকার নেই। কারণ, তারা তাদের মেয়াদে নির্বাচন প্রক্রিয়াকে কলুষিত করেছে।

বিএনপি নেতৃত্বের সবাই সাজাপ্রাপ্ত হওয়ায় তাদের নেতৃত্ব কোথায়-এমন প্রশ্ন তুলে আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেছেন, নেতৃত্ব নেই, সবাই সাজাপ্রাপ্ত আসামি। সাজাপ্রাপ্ত আসামি দিয়ে নির্বাচন করে জেতা যায় না। নির্বাচনে পরাজয় হবে জেনেই তো বিএনপি নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে চায়। কলুষিত করতে চায়।

বুধবার রাজধানীর বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউর আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে দলের ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ উপ-কমিটি আয়োজিত আলোচনা সভায় গণভবন থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস উপলক্ষে এই আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, সংবিধান লঙ্ঘন করে অবৈধভাবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখলে নেওয়া সামরিক শাসক জিয়াউর রহমানই এ দেশের নির্বাচনকে কলুষিত করা শুরু করেছিলেন। তার হাতে তৈরি দলটি নির্বাচন নিয়ে কোনো মুখে প্রশ্ন তুলছে।

শেখ হাসিনা বলেন, বিএনপির সময় নির্বাচনে ঢাকা-১০ এ ফালু (মোসাদ্দেক আলী ফালু) ইলেকশন করেছিলেন। যে ইলেকশনের চিত্র সবার নিশ্চয়ই মনে আছে। মাগুরা ইলেকশন হয়- যে ইলেকশন নিয়ে আন্দোলন করে আমরা খালেদা জিয়াকে উৎখাত করেছি। মিরপুর ইলেকশনসহ প্রতিটি নির্বাচনের চিত্রই আমরা দেখেছি। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির ভোটারবিহীন নির্বাচনও দেখা হয়েছে। যাদের নির্বাচনে এত কলুষিত রেকর্ড, তাদের মুখেই এখন নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন।

নির্বাচন ব্যবস্থার আধুনিক ও যুগোপযোগীকরণে তার সরকারের সময় ছবিসহ ভোটার তালিকা, স্বচ্ছ ব্যালট বাপ এবং ইভিএম ব্যবস্থা বলবৎ করার কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে নির্বাচন ব্যবস্থার যেসব উন্নয়ন, সেগুলো আওয়ামী লীগের সিদ্ধান্ত ও চিন্তা-চেতনার বাস্তবায়ন। এটা নিয়ে প্রশ্ন তোলার কোনো অর্থই হয় না। কারণ আওয়ামী লীগ জনগণের ভোটে নির্বাচিত, আওয়ামী লীগ সরকার জনগণের ভোটের অধিকার আবার জনগণের কাছেই ফিরিয়ে দিয়েছে। জনগণের শক্তিতে ক্ষমতায় আছে বলেই জনগণের জন্য আওয়ামী লীগ কাজ করতে পেরেছে।

বঙ্গবন্ধু হত্যার পর ১৯৮১ সালের ১৭ মে তার দেশে ফেরার দিনটির স্মৃতিচারণসহ দলের দায়িত্ব গ্রহণ এবং দলকে সুসংগঠিত করার প্রসঙ্গ তুলে ধরেন আওয়ামী লীগ সভাপতি। একই সঙ্গে ২০০৭ সালের ওয়ান-ইলেভেনের পর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় তাকে গ্রেপ্তারসহ তৎকালীন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে তিনি বলেন, মাত্র ১৫ দিনের মধ্যে ২৫ লাখ স্বাক্ষর সংগ্রহ করা এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে পৌঁছে দেওয়া- এটা একটা বড় সিগনাল ছিল তাদের কাছে। আন্তর্জাতিকভাবে এই তত্ত্বাবধায়ক সরকার তখন একটা নাজুক অবস্থার মধ্যে পড়ে। কারণ দেশ চালানো এত সহজ নয়।

দেশে ফিরতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বাধা দেওয়ার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি বলেন, 'সেদিন যদি জোর করে ফিরে না আসতাম আর জেল না খাটতাম, তা হলে হয়তো বাংলাদেশের জনগণের এত ভোট পেতাম না। সেই নির্বাচনে জয়ী হয়ে আজকে তিন টার্ম পরপর সরকারে আছি।

শেখ হাসিনা আরও বলেন, দীর্ঘ সময় যদি ক্ষমতায় থাকতে না পারি, দেশের উন্নতিটা দৃশ্যমান হয় না। উন্নতি করাও যায় না। কারণ ১৯৯৬ সাল থেকে ২০০১ পর্যন্ত যে কাজগুলো করেছিলাম, তার অধিকাংশ তো খালেদা জিয়া এসে নষ্ট করে দিলেন। কমিউনিটি ক্লিনিক বন্ধ, কেন? যারা কমিউনিটি ক্লিনিকে চিকিৎসা পাচ্ছেন, তারা নৌকায় ভোট দেবেন, ধানের শীষে ভোট দেবেন না- এটা ছিল খালেদা জিয়ার যুক্তি। এভাবে যতগুলো কাজ আমরা হাতে নিই, সব বন্ধ করে দেয় বিএনপি জোট সরকার। বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর নির্মাণকাজ শুরু করে দিয়েছিলাম, সেখানে কমিশন খেতে গিয়ে বিএনপি সরকার সেই বিদ্যুৎ উৎপাদনও প্রায় ব্যাহত করে।

বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারই সর্বপ্রথম বেসরকারি খাতে বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র উন্মুক্ত করে দিয়েছে। বিদেশি বিনিয়োগ, আমেরিকার বিনিয়োগ প্রথম বাংলাদেশে আসে। আমেরিকার একটা কোম্পানি দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্র বেসরকারি খাতে নির্মাণকাজ শুরু করে। সেই থেকে আমরা বেসরকারি খাতে সব কিছু উন্মুক্ত করে দিয়েছিলাম।

২০০১-২০০৬ বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের দুঃশাসনের প্রসঙ্গ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সে সময় তারা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড করেছে। ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলায় এবং ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় সাজাপ্রাপ্ত আসামি তারেক জিয়া ২০০৭-এ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে মুচলেকা দিয়েছে, সে জীবনে কোনোদিন রাজনীতি করবে না। এই মুচলেকা দিয়েই কিন্তু দেশ ছেড়ে চলে যায়। এই মামলায় বিচারের রায়ে সে সাজাপ্রাপ্ত।

দুর্নীতির দায়ে সাজাপ্রাপ্ত বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার শর্তসাপেক্ষে প্যারোলে মুক্তির প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, 'এতিমের অর্থ আত্মসাৎ করে সাজাপ্রাপ্ত খালেদা জিয়াকে কারাগার থেকে এখন বাসায় থাকার সুযোগ দিয়েছি, অসুস্থতার জন্য। এটুকু মানবিকতা দেখিয়েছি, যিনি আমাকে হত্যার চেষ্টা করেছেন বারবার, তাকেই আমি এই করুণা ভিক্ষা দিয়েছি যেন তিনি এখন বাসায় থাকতে পারেন। সাজাপ্রাপ্ত আসামি তাকে সুযোগ আমরা দিয়েছি। নির্বাহী আদেশেই দেওয়া হয়েছে।'

দেশের উন্নয়ন নিয়ে বুদ্ধিজীবী মহলের ঢালাও সমালোচনার জবাবে তিনি বলেন, আজ বাংলাদেশ পৃথিবীতে উন্নয়নের রোল মডেল। দেশ অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে যাচ্ছে।

গণভবন প্রান্ত থেকে আলোচনা সভার সঞ্চালনা করেন আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক ড. আবদুস সোবহান গোলাপ। বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ প্রান্তে উপস্থিত ছিলেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মতিয়া চৌধুরী, অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর কবির নানক, আবদুর রহমান, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ, আফম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাংগঠনিক সম্পাদক আহমদ হোসেন, অ্যাডভোকেট আফজাল হোসেন, কৃষি ও সমবায় বিষয়ক সম্পাদক ফরিদুন্নাহার লাইলী, ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ বিষয়ক সম্পাদক সুজিত রায় নন্দী, দপ্তর সম্পাদক ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ুয়া, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদক প্রকৌশলী আবদুস সবুর, শিক্ষা ও মানবসম্পদ বিষয়ক সম্পাদক শামসুন নাহার চাঁপা, স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যা বিষয়ক সম্পাদক ডা. রোকেয়া সুলতানা, উপ-প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক আমিনুল ইসলাম আমিন, উপ-দপ্তর সম্পাদক সায়েম খান, কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সদস্য শাহাবুদ্দিন ফরাজী, ইকবাল হোসেন অপু, মারুফা আক্তার পপি, ঢাকা মহানগর উত্তরের সভাপতি শেখ বজলুর রহমান, মহানগর দক্ষিণের সভাপতি আবু আহমেদ মন্নাফী, উত্তরের সাধারণ সম্পাদক এসএম মান্নান কচি, দক্ষিণের সাধারণ সম্পাদক হুমায়ুন কবির প্রমুখ।

আলোচনা সভা শেষে দলের ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ বিষয়ক সম্পাদক সুজিত রায় নন্দীর সঞ্চালনায় বিভিন্ন সংগঠনের মাধ্যমে এতিম ও দুঃস্থদের মধ্যে খাদ্যসামগ্রী এবং বেকারদের কর্মসংস্থানের জন্য সেলাই মেশিন বিতরণ করা হয়।