সিলেট ও সুনামগঞ্জের পর এবার চাঁপাইনবাবগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। এ জেলার গোমস্তাপুরে উজানের পানিতে ১০ হাজার বিঘা জমির ধান এখন পানির নিচে। এদিকে, সুনামগঞ্জে স্কুল ঘরে হাঁটুপানি থাকায় ২৮টিতে পাঠদান বন্ধ রাখা হয়েছে। সিলেট শহরের লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে দুর্ভোগে রয়েছেন। সুনামগঞ্জের ছাতকে প্রায় ৫০ হাজার মানুষ পানিবন্দি রয়েছেন। সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জে পাঁচটি ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। সিলেট-বিয়ানীবাজার আঞ্চলিক মহাসড়কের কয়েকটি অংশ পানিতে নিমজ্জিত হওয়ায় যানবাহন চলাচলে বিঘ্ন ঘটছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জে পানির নিচে ধান :জেলার গোমস্তাপুরে উজানের পানিতে ১০ হাজার বিঘা জমির ধান এখন পানির নিচে। মঙ্গলবার বিকেলে আকস্মিক ঢলে কিছু বুঝে ওঠার আগেই এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। বিলের কিছু ধান ঢলের পানিতে ডুবে গেছে এবং কিছু ধান কাটার পর জমিতে ফেলে রাখায় ভেসে গেছে।

সরেজমিন দেখা গেছে, ভারত হয়ে দিনাজপুর ও নওগাঁর পোরশার ওপর দিয়ে প্রবেশ করা পুনর্ভবা নদীর পানিতে শত শত বিঘা জমির উঠতি বোরো ধান তলিয়ে গেছে। স্থানীয়রা নৌকায় করে ভেসে যাওয়া ধান উদ্ধার এবং জমিতে পড়ে থাকা ধানগুলো উদ্ধারের চেষ্টা চালাচ্ছেন।
স্থানীয়রা জানান, সম্প্রতি উপজেলার রাধানগর ইউনিয়নের বিল কুজাইন ও চন্দের বিল এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। গত কয়েক দিনের লাগাতার বৃষ্টিপাতের কারণে এবং ভারতীয় অংশের নদীতে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় বিল দুটিতে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।

হঠাৎ করে জমিতে কেটে রাখা ধান নিমজ্জিত হতে দেখে উপস্থিত কৃষকদের হাহাকার করতে দেখা যায়। শ্রমিক সংকটের কারণে তাঁরা সময়মতো ধান কাটতে পারেননি। তাঁদের দীর্ঘদিনের দাবি, কুজনঘাটে পুনর্ভবা নদীর ওপর সেতু নির্মাণের কোনো ব্যবস্থা না হওয়ায় তাঁরা নিম্নাঞ্চল থেকে দ্রুত ধান সংগ্রহ করতে পারছেন না। এ ছাড়া বিল অঞ্চল থেকে দ্রুত পানি নিস্কাশনের কোনো ব্যবস্থা না থাকায় প্রায় প্রতিবছরই এ অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হচ্ছে। তাঁরা নদী, বিল ও খাঁড়িগুলোতে দ্রুত ড্রেজিং ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণের দাবি জানান।

সুনামগঞ্জে ২৮ প্রাথমিক স্কুলে পাঠদান বন্ধ :জেলায় বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় সুনামগঞ্জে ভারি বর্ষণ না হলেও উজানের আসাম, মেঘালয়ে ভারি বৃষ্টি হয়েছে। উজানের আসাম-চেরাপুঞ্জির ঢলের পানি নামা অব্যাহত থাকায় জেলার ছাতক, দোয়ারাবাজার উপজেলার সুরমাসহ সব নদীর পানি উপচে নিম্নাঞ্চলে ঢুকছে। সুনামগঞ্জ জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা য়ায়, ঢলের পানিতে জেলার ২২০টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের আঙিনা প্লাবিত হয়েছে। এর মধ্যে ২৮টিতে সাময়িকভাবে পাঠদান বন্ধ রয়েছে।

সিলেটে পানির সঙ্গে বাড়ছে ভোগান্তি :জেলার উপশহর ও তেররতন, কানিশাইল, যতরপুর, সোবহানীঘাট, চালিবন্দর, আখালিয়ার বিভিন্ন এলাকা, ঘাসিটুলা, তালতলাসহ অর্ধশত এলাকার লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়ায় দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন। এ ছাড়া সিলেটের ১৩ উপজেলায় আরও পাঁচ লাখের মতো মানুষ পানিবন্দি হয়ে আছেন। অনেক এলাকায় সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় নৌকাই এখন চলাচলের ভরসা। গ্রামাঞ্চলের অনেক বাড়িতে এখন পানি। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পানির জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।

আখালিয়া নেহারিপাড়ার বাসিন্দা ইমরান আহমদ তাঁর এলাকার অধিকাংশ বাসায় পানি উল্লেখ করে জানান, অনেকে আত্মীয়ের বাসায় গিয়ে উঠেছেন। কেউ বা গ্রামের বাড়িতে চলে গেছেন।

সিলেটে বন্যার অবনতি ও দুর্গতদের দেখতে এ অবস্থায় গতকাল পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. মো. এনামুর রহমান বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করেন। তাঁরা নগরীর চালিবন্দরসহ কয়েকটি এলাকায় ত্রাণ বিতরণ করেন। ওই সময় ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন, সিলেটে বন্যাদুর্গত এলাকায় ২৫ লাখ টাকা ও ২০০ টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ড. মোমেন জানান, সরকার বন্যার্তদের পাশে রয়েছে। জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, সিলেটে ২৭৪টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত করা হয়েছে। এর মধ্যে ৭৮টিতে বন্যার্তরা অবস্থান করছেন।

এদিকে, পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) উপবিভাগীয় প্রকৌশলী একেএম নিলয় পাশা সমকালকে জানিয়েছেন, কয়েকদিন ধরে সিলেটে অব্যাহত ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলের কারণে নদীর পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিছু এলাকায় সামান্য কমলেও অন্য এলাকায় বাড়ছে। সিলেট সদর, জকিগঞ্জ, কোম্পানীগঞ্জ, গোয়াইনঘাট, কানাইঘাট ও জৈন্তাপুর এলাকার লোকজন বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

ছাতকে বানভাসী মানুষের দুর্ভোগ :উপজেলায় সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। উপজেলার ১৩টি ইউনিয়নের মধ্যে অধিকাংশ লোকজনই বন্যাকবলিত। এ পর্যন্ত উপজেলার প্রায় ৫০ হাজার মানুষ পানিবন্দি বলে স্থানীয় বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা গেছে। পানি বৃদ্ধির কারণে ছাতকে সড়কে কয়েকটি স্থানে পানি উঠে যাওয়ার কারণে দু'দিন ধরে উপজেলার সঙ্গে সারাদেশের সড়ক যোগাযোগ এখন বিচ্ছিন্ন রয়েছে। বন্যার পানিতে পৌর এলাকার অধিকাংশ অলিগলিতে পানি ডুকে পড়ায় পরিবার নিয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন এসব এলাকার লোকজন।

টানা বৃষ্টিতে শহরের বিভিন্ন রাস্তায় দেখা দিয়েছে জলাবদ্ধতা। বর্তমানে বন্যা দুর্গতদের জন্য চারটি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। এসব আশ্রয়কেন্দ্রে শতাধিক পরিবার আশ্রয় নিয়েছে। দুর্গতদের উপজেলা প্রশাসন বুধবারও শুকনা খাবার বিতরণ করেছে। উপজেলার নিচু এলাকার শাকসবজি ক্ষেত পানিতে তলিয়ে গেছে। বন্যার পানিতে ৩০টি মৎস্য খামারের মাছ ভেসে গেছে। পানির প্রবল স্রোতের কারণে আতঙ্কে রয়েছে সুরমা নদী-তীরবর্তী শতাধিক পরিবার।

গোলাপগঞ্জে পানিবন্দি অর্ধ লক্ষাধিক মানুষ :উপজেলার প্রায় সবক'টি ইউনিয়নের নিচু এলাকা বন্যায় প্লাবিত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। তবে বাঘা ও ফুলবাড়ি ইউনিয়নে বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। কয়েক দিনের টানা অব্যাহত বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলে সুরমা-কুশিয়ারা নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে নদী-তীরবর্তী বিভিন্ন জনপদের পাশাপাশি স্কুল, কলেজ, মসজিদ, হাটবাজারে বন্যার পানি ঢুকে পড়ায় সাধারণ মানুষ অসহায় হয়ে পড়েছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে উপজেলার অর্ধ লক্ষাধিক মানুষ।

ফেঞ্চুগঞ্জে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত :টানা বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে উপজেলার ৫টি ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। বন্যায় পানিবন্দি হয়ে পড়েছে শত শত মানুষ। বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকায় বিভিন্ন এলাকায় কাঁচা বাড়িঘর বিধ্বস্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। অনেক এলাকায় রাস্তাঘাটসহ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পানি ঢুকে পড়ার উপক্রম হয়েছে। তা ছাড়া প্রবল বর্ষণে ও পাহাড়ি ঢলে মৌসুমি শাকসবজিসহ আউশের বীজতলা, মৎস্য খামার, গবাদি পশুর খামারসহ কৃষি ক্ষেত্রে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। পাহাড়ি ঢলের ফলে কুশিয়ারা নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়া অব্যাহত রয়েছে।
বিয়ানীবাজারে তলিয়ে গেছে মহাসড়ক :কুশিয়ারার দু'কূল উপচে উপজেলার পাঁচ ইউনিয়ন, সিলেট-বিয়ানীবাজার আঞ্চলিক মহাসড়কের ১২টি এলাকা তলিয়ে গেছে। গত কয়েক দিনের অতিবৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে বিয়ানীবাজারের বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। বুধবার সুরমা-কুশিয়ারা এ দুই নদীতে পানি বেড়েছে বলে জানিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আশিক নূর। তিনি জানান, বন্যার্তদের জন্য উপজেলার ২৪টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। কিছু পরিবার এতে আশ্রয় নিয়েছে।

কুশিয়ারার পানি কূল উপচে এবং ডাইক ভেঙে সিলেট-বিয়ানীবাজার আঞ্চলিক মহাসড়কের কাকরদিয়া, মেওয়ার মায়নচত্বর, বৈরাগী, দুবাগবাজার, গাছতলা, রাধমাসহ পনেরোটি অংশ তলিয়ে গেছে। পানি বৃদ্ধি পাওয়া ঝুঁকি নিয়ে যানবাহন চলাচল করছে।

বিষয় : বন্যার চিত্র ১০ হাজার বিঘা জমির ধান পানির নিচে

মন্তব্য করুন