বিশিষ্ট সাংবাদিক ও কলাম লেখক আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরীর মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে দেশের রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও গণমাধ্যম অঙ্গনে। অনুজ গণমাধ্যমকর্মীরা তাঁকে গভীর শ্রদ্ধায় ও শোকে স্মরণ করছেন। তাঁর জীবন ও কর্মের প্রতি আলোকপাত করে সুধীজনরা বলেছেন, অকুতোভয় কলমযোদ্ধা গাফ্‌ফার চৌধুরী বাঙালির গর্বের ধন। তিনি গতানুগতিক ইতিহাসের পথ অনুসরণ করা কোনো পথিক নন; বরং তিনি নিজে ইতিহাস নির্মাণ করেছেন। জীবনের ওপারে গিয়েও তিনি চিরকাল ইতিহাসের অংশ হয়েই থাকবেন। আধুনিক সংবাদপত্রে সহজ সরল ভাষায় কলাম লিখে তিনি কলামকে পাঠকের কাছে জনপ্রিয় করে তুলেছেন। পৃথিবীতে যত দিন বাংলা ও বাঙালি থাকবে, একুশের চেতনায় অমর একুশে গানের রচয়িতা গাফ্‌ফার চৌধুরী চিরভাস্বর হয়েই থাকবেন। তাঁর কর্ম ও লেখনী তরুণ সাংবাদিকদের জন্য চির প্রেরণার হয়ে থাকবে। সুধীজনরা দেশের বড় কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর নামে 'চেয়ার' স্থাপন করে তাঁর জীবন ও কর্ম নিয়ে গবেষণা, তাঁর লেখনীগুলো একত্র করে প্রকাশ করার উদ্যোগ নেওয়ার জন্যও সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। গতকাল বৃহস্পতিবার সমকালকে দেওয়া পৃথক প্রতিক্রিয়ায় তাঁরা এসব কথা বলেন।

বিশিষ্ট সাংবাদিক আবেদ খান বলেন, ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী দেশের প্রত্যেক মানুষের কাছে তিনি ব্যাপক জনপ্রিয়। তিনি বাঙালির গর্বের ধন। গণতন্ত্র ও অসাম্প্রদায়িকতার বিশ্বাসে অটল একজন মানুষ আজ চলে গেলেন। এ শূন্যতা পূরণ হওয়ার নয়। তিনি বলেন, গাফ্‌ফার চৌধুরীর মৃত্যু কেবল একটি নক্ষত্রের পতনই নয়, আমাদের মাথার ওপর থেকে যেন সূর্যটা চলে গেল। তিনি কেবল কলামিস্ট আর সাংবাদিকই ছিলেন না; ছিলেন একজন মানবিক মানুষ। ছিলেন পরমতসহিষ্ণু। তাই দেশে যখন আসতেন, যাঁরা তাঁর রাজনৈতিক বিশ্বাসের বিপরীত মেরুতে ছিলেন, সেই বদরুদ্দীন উমর ও শফিক রেহমানের সঙ্গেও আড্ডা দিতে ভুলতেন না। তিনি মূল্য দিয়েছেন বন্ধুত্বকে। গাফ্‌ফার চৌধুরী ছিলেন বঙ্গবন্ধুর স্নেহের সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, গাফ্‌ফার ভাইয়ের মৃত্যু জাতীয় জীবনের অপূরণীয় ক্ষতি। এটি কথার কথা নয়, এই কথা আমরা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি। তাঁর মৃত্যু মেনে নেওয়া খুবই কঠিন। পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর দেশে যত বিপদ-আপদ এসেছে, আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরীর কলম জাতিকে আলো দেখিয়েছে। তাঁর কলম ছিল আশা-জাগানিয়া। অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের স্বপ্ন তিনি আজীবন দেখতেন। কঠিন কথাটা কলামে সহজভাবে বলার বিরল গুণ কেবল তাঁরই ছিল। সাংবাদিকতায় আজীবন বস্তুনিষ্ঠতা বজায় রেখে চলেছেন। তিনি আপাদমস্তক সাংবাদিক ছিলেন। লিখতে গিয়ে কে কখন সরকারে আছেন- সেদিকে তাকাননি। কেবল ভাবতেন, দেশের মঙ্গল কীসে নিহিত রয়েছে। দেশ ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের প্রতি তাঁর আনুগত্যে ছিলেন অটল ও অবিচল। তিনি বলেন, আমি আশা করব, নবীন সাংবাদিকরা তাঁর কাজ অনুসরণ করবে। গাফ্‌ফার ভাইয়ের লেখাগুলো নবীন সাংবাদিকদের জন্য টেক্সট হিসেবে কাজ করবে।

বরেণ্য শিক্ষাবিদ অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বলেন, আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী আমাদের ইতিহাসের একজন নির্মাতা। তাঁর অমর একুশের গান ছিল বায়ান্নতে বাঙালির সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার ঘটনা। তাঁর মতো করে সেক্যুলার বাংলাদেশের স্বপ্ন আর কেউ দেখেছে কিনা, জানি না। তাঁর গানে তিনি চির অমর; তাঁর কর্ম আমাদের চিরকালের প্রেরণা। তিনি যৌক্তিক কারণে বিদেশে গিয়েছিলেন, কিন্তু আজীবন আমাদের সঙ্গেই তিনি থেকেছেন। সুযোগ পেলেই দেশের টানে, নাড়ির টানে ছুটে আসতেন। তাঁর কবিতা ও সাহিত্যও অনবদ্য লেখনীর। বিনয়ী মানুষ ছিলেন। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত শেখার চেষ্টা করে গেছেন, কুণ্ঠিত হননি।

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম প্রস্তাব দিয়ে বলেন, দেশের বড় কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর নামে 'চেয়ার' স্থাপন করা যেতে পারে। সেখানে তাঁর জীবন ও কর্ম নিয়ে গবেষণা, সেমিনার হতে পারে।

সম্মিলিত সাংস্কৃৃতিক জোটের সাবেক সভাপতি নাসির উদ্দীন ইউসুফ বাচ্চু বলেন, আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরীকে হারিয়ে আমরা শোকাভিভূত। শোক থাকাটাই স্বাভাবিক। তবে আমি তাঁকে নিয়ে ভীষণ গৌরব অনুভব করি। তাঁর মতো একজন জীবন্ত কিংবদন্তিকে আমরা সশরীরে দেখতে পেয়েছি; তাঁর সঙ্গ পেয়েছি, তাঁর মমতা পেয়েছি। যা কিছু বিশ্বাস করেছেন, তা দৃঢ়তার সঙ্গে নির্ভীকভাবে বলেছেন। এটি খুবই বিস্ময়কর যে, মাত্র ১৯ বছর বয়সে তিনি গান রচনা করেছেন। সেই গান পুরো বাঙালি জাতিসত্তার প্রতিনিধিত্ব করে যুগ যুগ ধরে। বাঙালির প্রতিবাদী চরিত্র, রক্ত দেওয়ার মানসিকতাকে এই গান প্রতিনিধিত্ব করে। এই গান সারাবিশ্বের ৩৫ কোটি বাঙালির হৃদয়ে চিরকাল অনুরণিত হবে। আজ থেকে ১০০/২০০ বছর পরও উত্তর আমেরিকা থেকে চীন পর্যন্ত প্রতি একুশে ফেব্রুয়ারিতে এ গান গীত হবে। পৃথিবীতে যত দিন বাংলা ও বাঙালি থাকবে, একুশের চেতনায় অমর একুশে গানের রচয়িতা গাফ্‌ফার চৌধুরী চিরভাস্বর হয়েই থাকবেন।

নাসির উদ্দীন ইউসুফ বাচ্চু বলেন, একুশে নিয়ে আরেকটি গানও গাফ্‌ফার চৌধুরী লিখেছিলেন- 'রক্তে আমার প্রলয় দোলা'। সেটিও বহুল গীত হয়েছে। ভাবতে বিস্ময় লাগে, একুশে নিয়ে তাঁর লেখা দুটি গানই সবচেয়ে সেরা। এটা একটা মানুষের জীবনে সবচেয়ে সেরা ঘটনা। সবাই চিরস্মরণীয় হতে চায়; কিন্তু গাফ্‌ফার ভাইয়ের মতো কেউ কেউ কেবল তা করে দেখাতে পারেন।