কাবুল হাসান রশিদ। সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক লিমিটেডের (এসআইবিএল) কার্ড ডিভিশনের অপারেশন ইউনিটের কর্মকর্তা। পদ সহকারী রিলেশন অফিসার (এআরও)। কাবুলসহ তিনজন মিলে গড়ে তোলেন প্রতারণার বলয়। চক্রটি কৌশলে এসআইবিএলের গ্রাহকের ক্রেডিট কার্ড থেকে টাকা হাতিয়ে নিয়ে আসছিল। কাবুলের দায়িত্ব ছিল এসআইবিএলের গ্রাহকদের ফোন নম্বরসহ সব তথ্য ব্যাংক থেকে নিয়ে চক্রের আরেক সদস্য হ্যাকার হাসান খানের কাছে তুলে দেওয়া।

ব্যাংক কর্মকর্তা কাবুল হাসান ও হাসান খানকে গত বুধবার রাজধানীর মুগদা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ সময় তাদের কাছ থেকে এসআইবিএলের গ্রাহকদের আটটি তালিকা উদ্ধার করা হয়। চক্রের আরেক সদস্য রাব্বি এখনও পলাতক।

কাবুল প্রতিদিন গ্রাহকদের তথ্য সংবলিত একটি কিংবা দুটি শিট অফিস থেকে প্রিন্ট করে নিয়ে আসতেন। প্রতি শিটে ২৫-৩০ জন গ্রাহকের তথ্য থাকত। একটি তালিকার বিনিময়ে কাবুল পেতেন ৭-৮ হাজার টাকা। পরে ওই তালিকা হাসান খান দিতেন আরেক সদস্য রাব্বিকে। রাব্বি ব্যাংকটির হটলাইন নম্বর ক্লোন করে গ্রাহককে ফোন করে বলতেন, 'এসআইবিএল থেকে বলছি। আপনার কার্ড আপডেট করার জন্য ব্যাংক থেকে এক কর্মকর্তা ফোন করবেন, তাকে সব তথ্য দিয়ে দেবেন।' কাবুল হাসানের কাছ থেকে পাওয়া ওই তালিকায় থাকা গ্রাহকের, ঠিকানা, ক্রেডিট কার্ড নম্বর ও কার্ডের মেয়াদের তারিখ জানিয়ে গ্রাহকের বিশ্বস্ততা অর্জন করতেন। এর পরই দ্বিতীয় ধাপে হাসান খান গ্রাহককে ফোন করে বলতেন, 'আপনার মোবাইল ফোনে একটি নম্বর গেছে। সেটি জানান আমাকে।' কৌশলে ওটিপি নম্বরটি নেওয়ার পরই কার্ড থেকে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে টাকা হাতিয়ে নিয়ে আসছিলেন তাঁরা। হাতিয়ে নেওয়া টাকার ৩০ শতাংশ রাব্বি এবং ৭০ শতাংশ পেতেন হাসান খান।

ব্যাংক কর্মকর্তা কাবুল হাসান ও হাসান খান মুগদায় একই ভবনের পাশাপাশি ফ্ল্যাটে থাকতেন। তাঁরা দূরসম্পর্কের মামা-ভাগনে।

গত ১২ মার্চ ডেমরার বাসিন্দা আবু বক্কর সিদ্দিকের এসআইবিএলের ক্রেডিট কার্ড থেকে প্রতারক চক্র ১০ হাজার টাকা হাতিয়ে নেয়। এ ঘটনায় তিনি ডেমরা থানায় মামলা করেন। মামলাটির তদন্তে নেমে ডিবির ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন টিম চক্রটিকে শনাক্ত করে।

এসআইবিএলের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, কাবুল হাসান ব্যাংকটির চুক্তিভিত্তিক কর্মকর্তা। জালিয়াতি করে গ্রাহকের ক্রেডিট কার্ড থেকে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনায় তার গ্রেপ্তারের বিষয়টি কর্তৃপক্ষ অবগত আছে। তার চাকরির চুক্তি বাতিল করা হবে।

লংকাবাংলা ফাইন্যান্স ঘিরেও একই ফাঁদ :'লংকাবাংলা ফাইন্যান্স থেকে বলছি, আপনার কার্ডটি আপাতত বন্ধ করা হয়েছে। আমাদের দেওয়া পাসওয়ার্ড আপনি পরিবর্তন করেননি। তাই আপনার ক্রেডিট কার্ডের শেষের চার ডিজিট বলুন এবং আপনার পাসওয়ার্ডটি পরিবর্তন করুন।' আর্থিক প্রতিষ্ঠান লংকাবাংলা ফাইন্যান্সের কর্মকর্তা পরিচয়ে এক ব্যক্তি ফোন করে গ্রাহক তামান্না আফরোজের কাছে এভাবেই তাঁর ব্যাংক হিসাব-সংক্রান্ত তথ্য নিয়ে নেন। পরে চাতুরী করে তাঁর ক্রেডিট কার্ড থেকে টাকা উঠিয়ে নেন প্রবঞ্চক ওই ব্যক্তি। ঘটনাটি ঘটে গত জানুয়ারির শেষ সপ্তাহে।

তামান্না আফরোজের মতো অনেকেই ঠকবাজ চক্রের চোরাবালিতে পা ফেলে ক্রেডিট কার্ডের টাকা খুইয়েছেন। চক্রের সদস্যরা এমন নম্র ভাষায় কথা বলেন; গ্রাহক টাকা হারানোর আগে ঘুণাক্ষরেও টের পান না, তিনি প্রতারণার ফাঁদে আটকে গেছেন। টাকা হারিয়ে পরে অনেকেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে সহায়তা চান।

গত ডিসেম্বরে মিরপুর মাজার রোডের বাসিন্দা অবসরপ্রাপ্ত সরকারি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা মোহাম্মদ সোলেমানের ভিসা ক্রেডিট কার্ড থেকে এক লাখ ৮০ হাজার টাকা হাতিয়ে নেয় প্রতারক চক্র।

এ ঘটনায় ৩১ জানুয়ারি তিনি দারুস সালাম থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন। জিডিতে উল্লেখ করা হয়, ২৩ ডিসেম্বর এক ব্যক্তি লংকাবাংলার কর্মকর্তা পরিচয়ে ফোন করে তাঁকে ভিসা ক্রেডিট কার্ডের হালনাগাদ করার জন্য কিছু তথ্য জানতে চান। ২৬ ডিসেম্বর তিনি জানতে পারেন, ৩০ হাজার টাকা করে ছয় ধাপে তাঁর এক লাখ ৮০ হাজার টাকা তুলে নেওয়া হয়েছে।

গ্রাহকের ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতির মাধ্যমে টাকা তুলে নেওয়ার ঘটনায় লংকাবাংলার পক্ষ থেকে গত ২১ মার্চ বনানী থানায় একটি মামলা করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির লিটিগেশন ডিপার্টমেন্টের সহকারী কর্মকর্তা রজত রায় বাদী হয়ে অচেনা আসামির বিরুদ্ধে মামলাটি করেন।

লংকাবাংলার সহকারী কর্মকর্তা রজত রায় সমকালকে বলেন, লংকাবাংলা কখনও গ্রাহককে ফোন করে কার্ড-সংক্রান্ত তথ্য চাইবে না। গ্রাহককে সতর্ক থাকতে হবে, যে কেউ ফোন করে ওটিপি নম্বর চাইলে যেন না দেওয়া হয়।