দেশে বিদ্যমান রাজনৈতিক সংকট সমাধানে নির্বাচনের আগে দুই বছর মেয়াদি জাতীয় সরকার গঠনের প্রস্তাব করেছেন গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী। সম্প্রতি এক প্রস্তাবনায় জাতীয় সরকারের একটি রূপরেখাও তুলে ধরেছেন তিনি। তাঁর এই প্রস্তাব নিয়ে দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে এখনও কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তবে সোশ্যাল মিডিয়ায় বিষয়টি নিয়ে তুমুল আলোচনা চলছে। আগে থেকেই দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও বিএনপির অবস্থান 'জাতীয় সরকারের' বিরুদ্ধে। আওয়ামী লীগ বিদ্যমান সংবিধানের বাইরে কোনো সরকার ব্যবস্থায় বিশ্বাসী নয়। অন্যদিকে বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আগামী সংসদ নির্বাচনে জয়ী হতে পারলে তারা জাতীয় সরকার গঠন করবে, আগে নয়।

ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী দীর্ঘদিন ধরেই বিএনপির শুভাকাঙ্ক্ষী হিসেবে সমাজে পরিচিত। তবে এবার নির্বাচন কমিশন গঠনের আগে তার প্রস্তাবিত নামের তালিকায় ছিলেন বর্তমান প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী হাবিবুল আউয়াল। তখন রাজনৈতিক মহলে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।

জাতীয় সরকার গঠনে ডা. জাফরুল্লাহর প্রস্তাবিত নামের তালিকায় বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছোট বোন শেখ রেহানা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার নাতি জাইমা রহমানের নাম রয়েছে। এ ছাড়াও দেশের বিভিন্ন অঙ্গনের শীর্ষ পর্যায়ের ব্যক্তিদের নাম উল্লেখ করেছেন ড. জাফরুল্লাহ। যাঁদের নাম ওই তালিকায় রয়েছে তাঁরা অবশ্য এ বিষয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন। পাশাপাশি দেশের বিশিষ্টজনও বলছেন- যে কোনো বিষয়ে আগে প্রয়োজন রাজনৈতিক ঐকমত্য। কিন্তু এ মুহূর্তে রাজনৈতিক ঐক্য তো দূরের কথা, উল্টো দলগুলো পরস্পর বিপরীত মেরুতে অবস্থান করছে।

বিশিষ্ট আইনজীবী ড. কামাল হোসন সমকালকে বলেন, 'জাতীয় সরকার নিয়ে ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর প্রস্তাবটি পত্রিকায় দেখেছি। তাঁর সঙ্গে এ নিয়ে কোনো আলাপ হয়নি। এটা নিয়ে বলার কিছু নেই।'

রাষ্ট্রপতি পদে প্রস্তাব পেলে আপনার পদক্ষেপ কী হবে- এমন প্রশ্নের জবাবে প্রবীণ এই আইনজ্ঞ বলেন, 'তখন বিষয়টি নিয়ে চিন্তা শুরু করব। তার আগে এ নিয়ে ভাববার কিছু দেখছি না।'

ডা. জাফরুল্লাহর প্রস্তাবিততের একজন সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার এ বিষয়ে বলেন, দেশের বর্তমান নানামুখী সংকটের সঙ্গে যোগ হচ্ছে অর্থনৈতিক দুরবস্থার আশঙ্কা। এসব পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য অবশ্যই জাতীয় সরকারের প্রয়োজন। তবে সেজন্য সবার আগে প্রয়োজন রাজনৈতিক ঐকমত্য। অতীতের মতো একদিনের (ভোটের দিনের) গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে এই সংকট থেকে রেহাই পাওয়া যাবে না। সব রাজনৈতিক শক্তিকে সংকট উপলব্ধি করতে হবে। আগে সবাইকে স্বীকার করতে হবে এবং একমত হতে হবে যে, এই সংকট কাটাতে ঐক্যবদ্ধ প্রয়াসের কোনো বিকল্প নেই। এজন্যই আমরা বলে আসছি, জাতীয় সনদের কথা। ওই সনদ সবাইকে মেনে চলার প্রতিশ্রুতি দিতে হবে। এ ধরনের সরকার প্রতিষ্ঠায় সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন তিনি।

ডা. জাফরুল্লাহ তাঁর প্রস্তাবে সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তন নীতিতে আস্থা সৃষ্টি, সুশাসন নিশ্চিত করা এবং কয়েকটি ক্ষেত্রে সংবিধানের পরিবর্তনের জন্য প্রেসিডেন্টের অধ্যাদেশবলে ও গণভোটে একটি সর্বদলীয় জাতীয় সরকার গঠনের কথা বলেছেন। এই সরকারের সদস্যরা, ন্যায়পাল ও বিভিন্ন কমিশনের চেয়ারম্যানরা ২০২৮ সাল পর্যন্ত কোনো নির্বাচনে অংশ নেবেন না।

প্রস্তাবিত জাতীয় সরকারের তালিকায় নাম রয়েছে এমন আরেকজন বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান সমকালকে বলেন, নির্বাচনী প্রক্রিয়া ভেঙে পড়ায় প্রতিষ্ঠানগুলোও আস্তে আস্তে নানা রকম নৈতিক অবক্ষয়ের দিকে ধাবিতে হচ্ছে। এ মুহূর্তে কেউই নিরাপদ অবস্থায় নেই। এ অবস্থায় একটা গ্রহণযোগ্য নির্বাচন দরকার, যার মাধ্যমে আমরা নেতা নির্বাচন করব। এ জন্য জাতীয় সরকার, তত্ত্বাবধায়ক সরকার নাকি সব দলের অংশগ্রহণে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার হবে- সেটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে হতে হবে। একজন ব্যক্তি তাঁর ইচ্ছার কথা বলতেই পারেন। কিন্তু আমাদের রাজনীতি তো অনেক জটিল, সহজ-সরল ফর্মুলা এখানে কাজ করে না। রাজনৈতিক দলগুলো আন্দোলন করেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার এনেছিল, তারাই আবার সেটি নষ্ট করেছে। কাজেই রাজনৈতিক সমঝোতার ভিত্তিতে একটা কিছু ব্যবস্থা হতে হবে, যার মাধ্যমে নিশ্চিত হবে গ্রহণযোগ্য ও সুষ্ঠু নির্বাচন।

বিশিষ্ট আইনজীবী ড. শাহ্‌দীন মালিক সমকালকে বলেন, আমাদের অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে যে, কেবল দলনিরপেক্ষ সরকারের অধীনেই সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব। জাতীয় সরকার সব দলের প্রতিনিধি নিয়ে সরকার। অতএব, দলনিরপেক্ষ সরকার নয়। তাই নির্বাচনকালীন জাতীয় সরকারের ধারণায় আমার দ্বিমত রয়েছে। সুষ্ঠু নির্বাচনের পর রাজনৈতিক দলগুলো যদি কোয়ালিশন সরকার গঠন করতে চায়, তাহলে রাজনৈতিক দলের নিজস্ব সিদ্ধান্তেই কেবল সম্ভব।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এম হাফিজউদ্দীন খান বলেন, জাতীয় সরকার বা অন্য কোনো সরকার নিয়ে আমার ঠিক ধারণা নেই। কারণ এ ধরনের সরকারের বিষয়ে অতীত ধারণা নেই। তবে তিনি বলেন, দলীয় সরকারের অধীনে দেশে কোনো সাধারণ নির্বাচন সুষ্ঠু হয়নি। তাই সাধারণ নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকার বা নিরপেক্ষ কোনো তৃতীয় পক্ষের অধীনে হওয়া উচিত বলেই মনে করি।

আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল-আলম হানিফ বলেন, জাতীয় সরকারের ফর্মুলা দেওয়ার জন্য জাফরুল্লাহ চৌধুরীকে কে দায়িত্ব দিয়েছে? এটা অনেকটাই 'গায়ে মানে না আপনি মোড়ল'-এর মতোই। তিনি বলেন, যাদের কোনো জনসমর্থন নেই, জনগণের ভোটে নির্বাচিত হওয়ার কোনো সুযোগ নেই- এই সমস্ত ব্যক্তির হঠাৎ করেই মন্ত্রী হওয়ার খায়েশ হয়েছে। এমন অসাংবিধানিক পথে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কারও যদি মন্ত্রী হওয়ার জন্য শখ হয়, তাহলে সাংবিধানিক পথ ধরে জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়েই কেবল তা হতে হবে। অসাংবিধানিকভাবে আর কেউ কোনোদিন বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসতে পারবেন না।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, বিএনপি শুরু থেকেই বলে আসছে- এই সরকারের অধীনে কখনও সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব হবে না। তাই এ সরকারের অধীনে বিএনপি কোনো নির্বাচনেও যাবে না। আগে এ সরকারকে হটাতে হবে। সরকার হটানোর পরে সরকার পতনের আন্দোলনে যেসব গণতান্ত্রিক দল, দেশপ্রেমিক দল অন্তর্ভুক্ত থাকবে তাদের মতামতের ভিত্তিতে নির্বাচনকালীন সময়ের সরকার ব্যবস্থা নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এর বাইরে আর কারও প্রস্তাব কিংবা রূপরেখা নিয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করতে চান না।