ধান সংগ্রহ প্রক্রিয়ায় শামুকগতি। তলানিতে গমের মজুত। বেড়েই চলেছে চালের দাম। সবমিলিয়ে বোরো ধানের ভরা মৌসুমেও নেই সুখবার্তা। তারপরও সরকারের দায়িত্বশীল মন্ত্রীরা চাউর করছেন, 'পর্যাপ্ত খাদ্যশস্য মজুত আছে, সংকট হবে না।' আবার কৃষি উৎপাদন ও মজুতের তথ্য নিয়েও রয়েছে ধোঁয়াশা। একেক সংস্থা দিচ্ছে একেক রকম হিসাব। একদিকে বলা হচ্ছে রেকর্ড পরিমাণ খাদ্যশস্য উৎপাদন, অন্যদিকে আমদানি বন্ধের খবরে আছে হাপিত্যেশ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চাহিদা, উৎপাদন ও মজুতের সঠিক তথ্য দেওয়া উচিত। সংকট কাটাতে খাদ্যশস্য মজুতের ক্ষেত্রে শুধু স্থানীয় উৎপাদনের ওপর নির্ভর না করতে সরকারকে সতর্ক করছেন তাঁরা।

চালের দাম: কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে প্রতি কেজি সরু চাল পাইকারিতে বিক্রি হচ্ছে ৫৮-৬৮ টাকা এবং খুচরায় ৬২-৭৫ টাকা, যা এক সপ্তাহ আগে পাইকারিতে ছিল ৫৭-৬৭ এবং খুচরায় ছিল ৬৫-৭২ টাকা। মাঝারি মানের চাল বিক্রি হচ্ছে পাইকারিতে ৪৩-৪৬ টাকা এবং খুচরায় ৪৭-৫২ টাকায়, যা এক সপ্তাহ আগে পাইকারিতে ছিল ৪২-৪৫ টাকা এবং খুচরায় ছিল ৪৫-৫০ টাকা। আর মোটা চাল পাইকারিতে বিক্রি হচ্ছে ৪১-৪৩ টাকা এবং খুচরায় ৪৪-৪৬ টাকা, যা গত সপ্তাহে পাইকারিতে ছিল ৪০-৪২ টাকা এবং খুচরায় ৪২-৪৬ টাকা।

খোলা আটা পাইকারিতে বিক্রি হচ্ছে ৪২-৪৪ টাকা এবং খুচরায় ৪৪-৪৬ টাকা, যা গত সপ্তাহে ছিল পাইকারিতে ৩৪-৩৫ টাকা এবং খুচরায় ৩৮-৪০ টাকা।

চালের দাম বেড়ে যাওয়ার বিষয়ে কেউ বলছেন, তেলের দাম বৃদ্ধি, মুদ্রাস্ম্ফীতি, জাহাজ ভাড়া, ডিজেল, খাদ্যশস্য সরবরাহের খরচ ও শ্রমিকের মজুরি বেড়ে যাওয়ায় বাড়ছে চালের দাম। ঢল, ঝড় ও বৃষ্টিতে ধান নষ্ট হওয়াকে অনেকে দায়ী করছেন। আবার কেউ বলছেন, বেসরকারি মিলার ও বড় বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান ধান মজুত করছে, সে কারণে দাম বেড়ে গেছে। সরকারি গুদামে চাল ও ধান সরবরাহ শুরু হওয়া মোটা চালের দাম বেড়ে যাওয়ার কারণ হিসেবে দেখছেন অনেকে। এ ছাড়া রাশিয়া-ইউক্রেন থেকে গম আমদানি করা হতো চাহিদার এক-তৃতীয়াংশ। যুদ্ধের কারণে দেশ দুটির আমদানি বন্ধ। যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে গম আমদানির চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় রপ্তানিতে রাশ টেনেছে ভারত। ফলে দেশের গমের মজুত ঠেকেছে তলানিতে। দেশে গো-খাদ্যেরও দর বেড়েছে। গত বছর এ সময় গমের মজুত ছিল ২ লাখ ৮৭ হাজার টন। এ বছর গতকাল পর্যন্ত গম মজুত আছে ১ লাখ ২ হাজার টন। গত বছর ধান মজুত ছিল ২০ লাখ টন। এ বছর মজুত আছে তিন লাখ টন ধান। চাল মজুদ আছে ১০ লাখ ৩১ হাজার টন।

তথ্যের গরমিল: সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো তথ্যে বৈসাদৃশ্য। ২০২০-২১ অর্থবছরে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের খাদ্যশস্য উৎপাদনের তথ্যে ফারাক রয়েছে ৪০ লাখ টনের বেশি।

বিবিএস বলছে, গত অর্থবছর খাদ্যশস্য (চাল, গম ও ভুট্টা) উৎপাদন হয়েছে ৪ কোটি ২৮ লাখ ৯ হাজার টন। কৃষি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গত অর্থবছর মোট খাদ্যশস্য উৎপাদন হয়েছে ৪ কোটি ৬৮ লাখ ২৯ হাজার টন। সে হিসাবে খাদ্যশস্য উৎপাদন নিয়ে সরকারি এ দুই সংস্থার তথ্যে ব্যবধান দাঁড়িয়েছে ৪০ লাখ ২০ হাজার টন।

কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. আসাদুজ্জামান সমকালকে বলেন, বৃষ্টিতে বোরো ধান নষ্ট হয়েছে, শুকাতেই সমস্যা হচ্ছে। এর মধ্যে সরকার ধান সংগ্রহ শুরু করেছে। ফলে চালের দাম বেড়েছে। দেশে কী পরিমাণ উৎপাদন ও ক্ষতি হয়েছে, এর কোনো সঠিক তথ্য নেই। বৈশ্বিক এ সংকটে সরকার কী করবে, সে বিষয়েও স্পষ্ট কোনো পরিকল্পনা নেই। সরকারের মন্ত্রীরা বলছেন, এ সমস্যা দ্রুত সমাধান হবে। কীভাবে হবে, এ বিষয়ে পরিস্কার কিছু বলছেন না। সরকারের মধ্যে ধোঁয়াশা থাকলে অনেকে সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করবে। দাম আরও বাড়বে। এ জন্য সরকারকে খোলাসা করতে হবে। কীভাবে গমের মজুত পূরণ হবে। ভারত থেকে কখন আমদানি হবে। তিনি বলেন, বাংলাদেশে শ্রীলঙ্কার মতো হবে না। তবে খাদ্যের দাম আরও বাড়বে। কারণ, সবকিছুর মধ্যে একটা অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

জাতিসংঘ সতর্ক করে দিয়ে গতকাল বলেছে, ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের কারণে সামনে বৈশ্বিক খাদ্য সংকট তৈরি হতে পারে। সংস্থাটির মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেছেন, এই যুদ্ধের কারণে দাম বেড়ে যাওয়ায় দরিদ্র দেশগুলোতে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা ভয়াবহ পর্যায়ে চলে গেছে। তার আশঙ্কা, শেষ পর্যন্ত ইউক্রেন থেকে রপ্তানি স্বাভাবিক না হলে বিশ্ব দুর্ভিক্ষের মুখোমুখি হতে পারে।

জানা যায়, স্বাধীনতার সময় সাড়ে ৭ কোটি জনতার এই দেশে ১ কোটি ১০ লাখ টনের কিছু বেশি চাল উৎপন্ন হতো। খাদ্য সাহায্য ও আমদানি দিয়ে সে ঘাটতি পূরণ করা হতো। এখন তার সাড়ে ৩ গুণ চাল উৎপাদন হচ্ছে। কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে দাবি করা হচ্ছে, দেশ খাদ্যশস্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করে ফেলেছে। অথচ প্রতিবছর ক্রমবর্ধমান হারে গম আমদানি করা হচ্ছে। এখন প্রতিবছর দেশে গড়পড়তা গম আমদানির পরিমাণ ৫০ থেকে ৬০ লাখ টন। দু-একবার কিছু চাল রপ্তানি করা হলেও কয়েক বছর পরপর আবার চালও ভালোই আমদানি হয়।

এদিকে, করোনাকালে সবচেয়ে বেশি আতঙ্ক ছিল বোরো ধানের উৎপাদন নিয়ে। সব আশঙ্কা উড়িয়ে দিয়ে তখনও রেকর্ড পরিমাণ ধান উৎপাদন হয়। এর পরও কয়েক দফায় চাল আমদানি করে সরকার।

খাদ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক মো. বদরুল হাসান সমকালকে বলেন, চাল উৎপাদনের পরিসংখ্যান কতটুকু ঠিক, তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় আছে। সরকারের এই পরিসংখ্যান অনুযায়ী জনসংখ্যার নিরীখে খাদ্য উদ্বৃত্ত থাকে। তারপরও চালের দাম বাড়ছে। তিনি বলেন, চালের দাম নিয়ন্ত্রণে গম মজুতের অনেক বড় ভূমিকা রয়েছে। বিশ্বজুড়ে খাদ্য সংকটের এ সময়ে কমপক্ষে ৫ লাখ টন গম মজুত রাখা জরুরি। সরকারের মন্ত্রীরা বলছেন, ভারত গম রপ্তানি অব্যাহত রাখবে। তা হলে গমের ওই আমদানি নিশ্চিত করতে হবে। দেশে খাদ্যশস্য আমদানির জন্য যে এলসি খোলা হয়েছে, সেটা আনতে হবে। ভারত সংকট দেখলে নিজেদের নিরাপত্তার জন্য রপ্তানি বন্ধ করে দেয়। অনেক ক্ষেত্রে রপ্তানির জন্য নির্দিষ্ট দাম নির্ধারণ করে।

বদরুল হাসান আরও বলেন, সরকারের মন্ত্রীরা দৃশ্যমান কিছু না বলে শুধু সংকট হবে না বলে ঘোষণা দিচ্ছেন। সরকারের কাছে খাদ্যশস্যের সঠিক তথ্য থাকলে আমদানি ও মজুতের বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে সহজ হবে। উৎপাদন কম হলে দ্রুত আমদানির সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং বেশি হলে আমদানি বন্ধ কিংবা শুল্কারোপের প্রয়োজন হয়। এর পরও খাদ্যশস্য উৎপাদনের তথ্যে বড় ধরনের বৈসাদৃশ্য দেখা গিয়েছে।

খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার সমকালকে বলেন, সারাবিশ্বে খাদ্য সংকট তৈরি হলে বাংলাদেশেও এর প্রভাব পড়বে। এ সংকট মোকাবিলার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি। ভারত থেকে গম আমদানি করা হচ্ছে। আরও আমদানি করা হবে। উৎপাদনের সঠিক পরিসংখ্যানের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, পরিসংখ্যানের তথ্য আমার কাছে নেই। এ কাজ পরিসংখ্যান ব্যুরো করছে। এ নিয়ে আমি কিছুই বলতে পারব না। সঠিক তথ্য দিচ্ছে কি-না, সেটাও জানি না। তিনি বলেন, গণমাধ্যমে ইতিবাচক রিপোর্ট করেন। তাহলে যারা মজুত ও ক্রাইসিস তৈরির চেষ্টা করছে, সেটা করতে পারবে না। 

বিষয় : খাদ্য পরিস্থিতি খাদ্যশস্যের উৎপাদন

মন্তব্য করুন