জীবনের একটা বেলায় এসে লোকে স্বর্গসুখ খুঁজে বেড়ায় তাঁর অতীত হাতড়ে। যা কিছু ভালো, যা কিছু সুন্দর সবই নাকি ছিল তাঁদেরই প্রজন্মে, তাঁদের সময়ে- এখনকার সবকিছুতেই তাঁদের বিরক্ত আর হতাশা জড়িয়ে। কিন্তু এই প্রকৃতি এই পৃথিবী তো প্রতিমুহূর্তে জায়মান, পরিবর্তনশীল। অনেক সময় এই পরিবর্তনের দর্শন আমাদের আক্রান্ত করে, অস্বস্তিতে ফেলে। কারণ যে ঝুঁকিবিহীন ঘেরাটোপের মধ্যে আমরা নিশ্চয়তা বোধ করি, সুখ বোধ করি, তা ভেঙে গেলে আমাদের অস্তিত্বটাই বিপন্ন হয়ে যাওয়ার মিছে আতঙ্ক তৈরি হয়।

এত ভারী ভারী কথা বলা এই জন্য যে, সেদিন সেঞ্চুরি করে মুশফিক সংবাদ সম্মেলনে তাঁর একটি দুঃখবোধ ক্যামেরার সামনে বলে ফেলেছেন- 'বাংলাদেশে আসলে অভিজ্ঞতার দাম নেই। ১৭ বছর যে কাটিয়েছি, এটাই অনেক বড় ব্যাপার।' কথাগুলোর মধ্যে নিশ্চিত গভীর অভিমান জড়িয়ে। কিছুদিন আগে বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন সিনিয়রদের অবসর প্রশ্নে বলেছিলেন- 'অবসরের সিদ্ধান্ত সিনিয়ররা নিজেরা নিলেই ভালো, তা না হলে বিসিবিকেই নিতে হবে। সেটা চায় না কেউ।'

প্রচ্ছন্ন একটা হুঁশিয়ারি জড়িয়ে ছিল তার কথাগুলোর মধ্যে। তাতে হয়তো ব্যথিত হয়েছেন কেউ কেউ। তাহলে সত্যিই কি 'অভিজ্ঞতার দাম' নেই বাংলাদেশের ক্রিকেটে? যদি তা-ই হতো, তাহলে কেউ তিন বছরে ১৬ ইনিংস পর সেঞ্চুরি করার সুযোগই পেতেন না। মিডল অর্ডারে থেকেও দুই বছরে কেউ সেঞ্চুরিহীন থাকতে পারতেন না। তাদের ওপর আস্থা ছিল বলেই তো মাঝের ওই সময়গুলোতে খেলতে পেরেছিলেন। যদি সত্যিকার অর্থেই অনভিজ্ঞ, অল্প-অভিজ্ঞ আর মহাঅভিজ্ঞদের পারফরম্যান্স এক পাল্লায় মাপতে পারতেন নির্বাচকরা, তাহলে অনেকেই দলে যাওয়া-আসার মধ্যে থাকতেন।

কই, সৌম্য সরকার তো নিউজিল্যান্ডে ১৪৯ করার পরের তিন টেস্টে রান না পাওয়ায় বাদ পড়েছিলেন, তখন তাঁর ওপর তো আস্থা রাখতে পারেননি নির্বাচকরা। সাদমান পাঁচ টেস্টে ব্যর্থ হওয়ায় হারিয়ে গেছেন, সাইফকে ঢাকঢোল পিটিয়ে অভিষেক করানোর কুড়ি মাস পর নির্বাচকরা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। মিঠুন, মোসাদ্দেকরাও হারিয়ে গেছেন তাঁদের গুডবুক থেকে। সিনিয়রদের কারও বেলায় তো এমন হয়নি। তাঁরা যখন ম্যাচের পর ম্যাচ অফ ফর্মে থাকেন, তখন নির্বাচকদের সাধ্যি নেই তাঁদের বাদ দেওয়ার। বিসিবির সর্বোচ্চ পর্যায় থেকেও 'অটোচয়েজ'-এর সিগন্যাল থাকে এই অভিজ্ঞদের জন্য।

বিসিবির এক পরিচালক একবার মজা করেই বলছিলেন- 'নির্বাচকদের আর কী কাজ, দলের ৬ থেকে ৭ জন তো দেশের যে কেউ চোখ বুজে নির্বাচন করতে পারেন, বাকি থাকা চার-পাঁচজনকেই তাঁদের কেবল নির্বাচন করতে হয়। সেখানেও ওই ঝুঁকিবিহীন জনপ্রিয় দল।' সমর্থকরা অভিজ্ঞ এই খেলোয়াড়দের প্রচ ভালোবাসে, মিডিয়াও তাঁদের অবদানকে শ্রদ্ধা করে সম্মানভরে। কিন্তু যখন নিরপেক্ষতার জায়গা থেকে কিছু প্রশ্ন ওঠে, দলের স্বার্থে ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সের ভূমিকা কতটা, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে- তখন অনেকেই ঠিক মেনে নিতে পারেন না। ক্রিকেটে কেন, যে কোনো খেলাতেই অভিজ্ঞতার মূল্য অসীম এবং বাংলাদেশে সেটা দেওয়াও হয়, হয়তো যেটুকু সম্মান তারা আশা করেন, সবসময় সেটা দেওয়া হয় না।

পাশের দেশ যদি ভারতের দিকে তাকাই, সেখানে কিন্তু অভিজ্ঞ খেলোয়াড় চেতেশ্বর পুজারা, আজিঙ্কা রাহানেদের দলের বাইরে রাখা হয়েছে। তারা অবসরে যাননি, বরং পুজারা কাউন্টিতে কয়েকটি শতকও হাঁকিয়েছেন। যে রাহানে দু'বছর আগেও অস্ট্রেলিয়া থেকে অধিনায়ক হয়ে সিরিজ জিতিয়ে এনেছিলেন তাঁকেও বলে দেওয়া হয়েছে, তিনি আর জাতীয় দলের ভাবনায় নেই।

পাকিস্তানের অভিজ্ঞ টেস্ট ব্যাটার আজহার আলীকে দলের বাইরে রাখা হয়েছে, সরফরাজও হারিয়ে গেছেন। একটু ইংল্যান্ডের দিকে তাকালেও বোঝা যাবে, সেখানে স্টুয়ার্ট ব্রড আর জেমস অ্যান্ডারসনের মতো অভিজ্ঞদের তারাও সম্মান দিয়ে বসিয়েছেন আবার ফিরিয়েও এনেছেন।

আসলে বয়স কিংবা অভিজ্ঞতা কোনো খেলোয়াড়ের মাপকাঠি হতে পারে না। 'ফিট অ্যান্ড ফাইন' থাকতে হবে। এই 'ফাইন' মানে মাঠের পারফরম্যান্সের সেরা অবস্থানে থাকতে হবে। তাহলেই চল্লিশ ছুঁই ছুঁই শোয়েব মালিকের মতো যে কেউই দলের জন্য পরবর্তী টি২০ বিশ্বকাপেও অপরিহার্য হতে পারবেন।

মুশফিক যে কতটা 'ফিট', নেটে তাঁর একাগ্রতা আর পরিশ্রমেই প্রমাণ দেয়। মাঠেও তিনি 'ফাইন' হয়ে ফিরেছেন, এটা অবশ্যই দেশের ক্রিকেটের জন্য আনন্দের খবর। আসলে নিষ্ঠা আর সততার শক্তি মুশফিককে যেমন আত্মবিশ্বাসী করে তুলতে সাহায্য করেছে, তেমনি আবেগীও করেছে। সে কারণেই হয়তো মাঝে মধ্যে কিছু 'না বললেও হয়' এমন কিছু বলে বসেন।