ঢাকার গুলশান, বনানী, ধানমন্ডি এলাকার কফিশপ বা ভালো রেস্টুরেন্টগুলোতে কর্মরত বিক্রয় সহযোগী বা সেবাপ্রদানকারী তরুণ-তরুণীদের জিজ্ঞেস করলেই জানতে পারবেন তাঁদের বেশিরভাগই ঢাকা বা অন্য বৃহৎ শহরের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজগুলোতে অনার্স বা মাস্টার্স করছেন; এমনকি বিএ-বিকম পাসও করেছেন। অন্য কিছু বড় শহরে বড় দোকান ও অভিজাত রেস্টুরেন্টগুলোতেও একই অবস্থা। তাঁদের প্রায় সবারই মাসিক আয় বেতন ও বখশিশ মিলিয়ে ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা।
তাহলে কি আমরা বলতে পারি, দেশে তেমন শিক্ষিত বেকার নেই? উত্তরটা হ্যাঁ অথবা না হলেও এটা সত্য, শিক্ষিত তরুণ-তরুণীদের অনেকেই তাঁদের আকাঙ্ক্ষিত কাজটি পাচ্ছেন না। অন্যদিকে, এটিও সত্য, আমাদের দেশে সেবা খাতের বিকাশের সঙ্গে শিক্ষিত বেকার অনেক কমে গেছে কিংবা পুরোপুরি বেকারত্ব নেই বললেই চলে; যা আছে তা হলো প্রচ্ছন্ন বেকারত্ব।
ইদানীং অর্থনীতিবিদদের কাছ থেকে আমরা প্রায়ই শুনছি, বাংলাদেশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়াতে বেশ সফল হলেও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে আশানুরূপ সাফল্য অর্জন করতে পারেনি। জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ক্রমাগত বাড়লেও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির হার বরং কমেছে।
অতিমারি করোনা গেল দুই বছরে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বড় রকমের প্রভাব ফেলেছে, এমনকি সে সময় অনেকেই কর্ম হারিয়েছেন। এ ধাক্কা এখনও কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি।
স্বাভাবিকভাবেই আমাদের অনেকের আকাঙ্ক্ষা আগামী অর্থবছরের বাজেটেও বরাবরের মতো কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে অধিক গুরুত্ব দেওয়া উচিত। আগেই জানা আছে, প্রতি বছর উচ্চশিক্ষা নিয়ে বাজারে আসা শিক্ষার্থী অনেকেই বেকার থাকছেন অথবা যোগ্যতা অনুযায়ী চাকরি পাচ্ছেন না। তাই আমাদের দেশে সন্তোষজনক চাকরি পাওয়া নিয়ে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের মধ্যে ক্রমেই হতাশা বাড়ছে। কেউ চাকরি না পেলে ভেবে নিচ্ছেন তাঁর যোগ্যতার ঘাটতি রয়েছে। আবার যাঁরা চাহিদা অনুযায়ী বেতন পাচ্ছেন না, তাঁদের বলা হচ্ছে যোগ্যতা ও দক্ষতার অভাবে তাঁরা বেতন কম পাচ্ছেন।
প্রচলিত ধারণা হলো, মূলত তিনটি কারণে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বেড়ে চলেছে। প্রথমত, চাকরির বাজারের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে রয়েছে বড় ধরনের ফারাক বা সমন্বয়হীনতা। বাজারে যে ধরনের লোকের চাহিদা রয়েছে, সে ধরনের লোক তৈরি হচ্ছে না বা আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা তৈরি করতে পারছে না। অন্যদিকে, প্রতি বছর যেসব শিক্ষিত লোক চাকরির বাজারে যুক্ত হচ্ছেন, তাঁদের উপযোগী চাকরি নেই। গত ১০ বছরে দেশে স্নাতক পাস শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ। দেশে সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়ছে। ১০ বছর আগেও বছরে দুই-আড়াই লাখ শিক্ষার্থী স্নাতক বা স্নাতকোত্তর পাস করে চাকরির বাজারে যুক্ত হতেন। এখন সেই সংখ্যা বেড়ে ৪-৫ লাখে উন্নীত হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, দেশে বর্তমানে চাকরির সুযোগ বাড়ছে উৎপাদনশীল ও কৃষি খাতে। এ দুটি খাতে আবার স্নাতক বা স্নাতকোত্তর পাস তরুণদের কাজের সুযোগ কম। এ দুটি খাতে দক্ষ লোকের চাহিদা বেশি। শিক্ষিত যুবক, যাঁরা অন্য কোনোভাবে চাকরির বাজারে রয়েছেন, তাঁরা এসব কাজে নিজেদের যুক্ত করতে চান না। অন্যদিকে, করোনার কারণে ব্যবসা-বাণিজ্য দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে যেসব শিক্ষিত যুবক ছোটখাটো ব্যবসার মাধ্যমে স্বকর্মসংস্থানে যুক্ত ছিলেন, তাঁরাও বেকার হয়ে পড়েছেন। তৃতীয়ত সরকারি চাকরিতে যেভাবে সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো হয়েছে, বেসরকারি খাত বেতন-ভাতার দিক থেকে সেভাবে এগোয়নি। সেই সঙ্গে রয়েছে বেসরকারি খাতে উৎপাদনমুখিতা কিংবা পারদর্শিতাকেন্দ্রিকতা, এমনকি প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি।
অর্থনীতিতে কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষমতা কমে গেছে নাকি শ্রমের উৎপাদনশীলতা বেড়েছে? ১৯৯৫-৯৬ থেকে ১৯৯৯-২০০০ সময়ে প্রতি ১ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির বিপরীতে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির হার ছিল শূন্য দশমিক ৫৪ শতাংশ। কিন্তু ২০১০ থেকে ২০১৬-১৭ সময়ে সংখ্যাটি নেমে যায় শূন্য দশমিক ২৯ শতাংশে।
অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, বাংলাদেশে কি কর্মসংস্থানবিহীন প্রবৃদ্ধি হচ্ছে? কেউ কেউ আবার বলছেন, শ্রমের উৎপাদনশীলতা বাড়ছে। বাংলাদেশে শ্রমের উৎপাদনশীলতা কম বলে যাঁদের দুশ্চিন্তা, তাঁদের জন্য এটা (যদি সত্য হয়) অবশ্যই ভালো খবর।
তবে এটাও স্বীকৃত সত্য, যতদিন পর্যন্ত উদ্বৃত্ত শ্রম শেষ না হয় ততদিন উৎপাদনশীলতা ও কর্মসংস্থান দুই-ই বাড়াতে হবে। দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া, গণচীন ও তাইওয়ানের মতো পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার যেসব দেশ উচ্চ প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে উদ্বৃত্ত শ্রমের সদ্ব্যবহার করতে পেরেছে, তাদের অভিজ্ঞতা থেকে এমনটিই ধারণা করা যায়।
স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে, বাংলাদেশে উদ্বৃত্ত শ্রম শেষ হওয়ার আগেই কর্মসংস্থান বৃদ্ধির হার কমে গেল কেন? কয়েকটি কারণে এটি হয়ে থাকতে পারে। প্রথমত, কৃষিতে সবুজ বিপ্লবের সময় শ্রম নিয়োজন বেড়েছিল; কারণ উচ্চফলনশীল ফসলের চাষে শ্রমের প্রয়োজন হয় বেশি। কিন্তু এখন কৃষিতে যন্ত্রের ব্যবহার বেড়েছে। এখানেও কর্মসংস্থান সংকুচিত হচ্ছে। রপ্তানিমুখী শ্রমঘন শিল্প বলতে একমাত্র তৈরি পোশাক শিল্পই গড়ে উঠেছে। এ শিল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু সেখানেও বিভিন্ন কারণে কর্মসংস্থান বাড়ার হার কমে গেছে। এই জন্য অনেকে প্রযুক্তির অধিকতর ব্যবহার এমনকি সম্ভাব্য চতুর্থ শিল্পবিপ্লবেরও কথা বলছেন।
অনেক সময় বলা হয়, বাংলাদেশে তৈরি পোশাক বাদেও অন্যান্য শিল্পের বিকাশ ঘটেছে। সে প্রসঙ্গে ওষুধ, জাহাজনির্মাণ শিল্প ইত্যাদির কথা উল্লেখ করা হয়। কিন্তু এ শিল্পগুলো শিল্প খাতের সার্বিক আয়তনের তুলনায় এখনও অনেক ছোট রয়ে গেছে। তাছাড়া তাদের কোনোটিই শ্রমঘন নয়। এ ক্ষেত্রে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হলে সরকারকে গতানুগতিক ধারার বাইরে গিয়ে চিন্তা করতে হবে।
কর্মে ইচ্ছুক থাকলেও কর্ম পাচ্ছে না- এমন জনগোষ্ঠীর জন্য বেকার ভাতা চালুর প্রস্তাব রেখে 'কর্মসংস্থান নীতি-২০২২' শিরোনামের খসড়া চূড়ান্ত করেছে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। এ নীতির আলোকে দক্ষ জনশক্তি ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে 'কর্মসংস্থান অধিদপ্তর' ও 'জাতীয় ক্যারিয়ার গাইডেন্স কাউন্সিল' গড়ে তোলা হবে।
অনেকেই মনে করেন, সরকারি বিনিয়োগ কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে খুব একটা অবদান রাখতে পারে না। তাই কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য সবার আগে প্রয়োজন ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর লক্ষ্যে উদ্যোগ গ্রহণ। আমাদের নীতিপ্রণেতা কিংবা রাজনীতিবিদদের প্রায় সবাই স্বীকার করেন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হলে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় দারিদ্র্য বিমোচন কোনোভাবেই সম্ভব নয়। তবে শুধু ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর মাধ্যমেই যে ব্যাপকভিত্তিক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়, তা সবসময় সঠিক নাও হতে পারে। অন্য নানা উপায়েও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা যেতে পারে। তবে ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর মাধ্যমে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা যত সহজ, অন্য কোনো উপায়ে তা সম্ভব হয় না।
স্বাধীনতা-পরবর্তী ৫০ বছরের শিল্পায়নের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, হাতেগোনা কয়েকটি শিল্প খাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে। আশি ও নব্বইয়ের দশকে তৈরি পোশাক ও ওষুধশিল্পের যাত্রার মাধ্যমে শিল্প খাতে যে পরিবর্তন সূচিত হয়েছিল, তারপর সার্বিকভাবে তেমন উল্লেখযোগ্য কোনো কাঠামোগত পরিবর্তন হয়নি। যেসব নতুন শিল্পের কথা ইতোমধ্যে বলা হয়েছে, তাদের কোনো কোনোটিতে উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হলেও মোট উৎপাদন বা কর্মসংস্থানে এদের অংশীদারিত্ব বা অবদান এখনও বেশ কম।
শিল্প খাতের মোট উৎপাদন বা মূল্য সংযোজন ও কর্মসংস্থানে বিভিন্ন খাতের অংশের দিকে তাকালে কথাটি আরও পরিস্কার হয়। সার্বিকভাবে শিল্প খাতের পরিসংখ্যান বলছে, সেখানে কর্মসংস্থানের প্রবৃদ্ধির হার বরং কমেছে। শিল্পায়নের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং উদ্বৃত্ত শ্রমের সদ্ব্যবহার হবে- এমনটি আশা করা হলেও তা হয়েছে সীমিত পরিমাণে। একটি মাত্র শ্রমঘন রপ্তানিমুখী শিল্পের ওপর নির্ভরশীলতা তার প্রধান কারণ। নব্বইয়ের দশকের পর শিল্প খাতের কাঠামোয় উল্লেখযোগ্য কোনো রূপান্তর ঘটেনি। কর্মসংস্থান বাড়ার হার কমতে শুরু করেছিল এমন সময়, যখন উৎপাদনের হার বাড়ছিল। অন্যদিকে, শ্রমিকের প্রকৃত মজুরি কোনো কোনো বছর বাড়লেও সেই ধারা টেকসই হয়নি। উচ্চ প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও কর্মসংস্থান বাড়ার হার কমে যাওয়া এবং শ্রমের উৎপাদনশীলতা বাড়া সত্ত্বেও প্রকৃত মজুরি বাড়ার হার টেকসই না হওয়া ছিল প্রাক-করোনা সময়ের উন্নয়ন অভিজ্ঞতায় একটি প্রশ্নবিদ্ধ জায়গা।
অন্যদিকে যেটা আগেই বলেছি, শ্রমবাজারে যে দক্ষ ও প্রশিক্ষিত জনশক্তির চাহিদা আছে, দেশের শিক্ষাব্যবস্থা তার জোগান দিতে পারছে না। এ কারণে অনেক শিল্প ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বিদেশ থেকে দক্ষ শ্রমশক্তি আমদানি করে। এই বাস্তবতা আমাদের উন্নয়ন কর্মপরিকল্পনা ও শিক্ষাব্যবস্থা পুনর্বিন্যাসের দাবি রাখে। আকাঙ্ক্ষিত কর্মসংস্থান জোগাতে হলে দেশে উচ্চ প্রবৃদ্ধির হার ধরে রাখার পাশাপাশি বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়। যাঁদের জন্য কর্মসংস্থান তৈরি করা যাবে না, তাঁদের জন্য অনেকেই যেমন ভাবছেন- বেকার ভাতা চালু করার চিন্তা করা যেতে পারে। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য দক্ষ জনবল সৃষ্টির লক্ষ্যে শুধু আলাপ-আলোচনা নয়, শিক্ষানীতিসহ অন্যান্য নীতিতে দ্রুত প্রয়োজনীয় পরিবর্তনও আনতে হবে। এমনকি চাকরিতে যোগদানের পরও দক্ষতা বাড়ানোর জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণ চলতে হবে।
মামুন রশীদ :অর্থনীতি বিশ্নেষক