ত্বকের ব্যাধি দাদ। চর্মরোগটি হয় 'ডারমাটোফাইট' নামে এক ছত্রাকের সংক্রমণে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরিভাষায় দাদকে বলা হয় 'টিনিয়া'। আগে কয়েক প্রকার ওষুধ খেলে আর মলম ক্ষতস্থানে লাগালেই সেরে যেত রোগটি। এখন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দেখিয়ে দামি ওষুধ খেয়ে নিয়মিত হরেক মলম লাগিয়েও দাদ বিনাশ করা যাচ্ছে না। এখন দাদ কেন সহজে নিরাময় হচ্ছে না- তা নিয়ে বিস্তর গবেষণার প্রয়োজন বলে মনে করছেন চর্মরোগ বিশেষজ্ঞরা।

আগে বড়জোর ১০ শতাংশ রোগীর ক্ষেত্রে ব্যাধিটা জটিল রূপ নিত। এখন বেশিরভাগ রোগীর কাছে দাদ এক ভীতির নাম। রোগটি ভয়ংকর ছোঁয়াচে হওয়ায় তা ছড়িয়ে পড়ছে। ডায়াবেটিস ও থাইরয়েডের সমস্যায় ভোগা রোগীর ৪৫ শতাংশই আক্রান্ত হচ্ছেন এই চর্মরোগে। এ দুই রোগ থাকা আক্রান্তদের দেহে একেবারেই কাজ করছে না দাদের ওষুধ কিংবা মলম। দাদে পুরুষের চেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন নারী। এর একটি বড় অংশ বাসাবাড়িতে কাজ করেন। চিকিৎসকরা বলছেন, দাদ হওয়ার একটি বড় কারণ ঘাম। আগে পায়ের পাতার চামড়ার ভাঁজে, কুঁচকিতে, মাথার তালু, আঙুলে দাদ হলেও এখন দুই ঊরুর ভাঁজে হচ্ছে বেশি। বগল, পেট, পা ও মুখেও হচ্ছে দাদ। এমন প্রেক্ষাপটে রীতিমতো চিন্তায় ফেলেছে চিকিৎসকসহ সংশ্নিষ্টদের। চট্টগ্রামের ১৫ উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে রোগীদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য বেরিয়ে এসেছে।
এদিকে, দাদ রোগ নিয়ে অনেক মানুষ দুর্বিপাকে পড়লেও এ ব্যাপারে উদাসীন স্বাস্থ্য বিভাগ। দুশ্চিন্তা আরও বাড়িয়েছে ফুটপাত কিংবা মুদির দোকানে বিক্রি করা দাদের ভেজাল বেনামি ওষুধ। চট্টগ্রামের গ্রামগঞ্জে নেই চর্মরোগের হাসপাতাল, আলাদা কোনো ইউনিট কিংবা বিভাগ। নেই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকও। এ জন্য গ্রামাঞ্চলের রোগীদের কয়েক কিলোমিটার পথ মাড়িয়ে ছুটতে হয় নগরে। চর্মরোগীদের জন্য পুরো চট্টগ্রাম বিভাগে রয়েছে মাত্র একটি বিশেষায়িত হাসপাতাল। অবকাঠামো, জনবল সংকটসহ নানা সংকটে ধুঁকছে সেই প্রতিষ্ঠানও।
চট্টগ্রামে প্রতি মাসে আক্রান্ত হাজারের বেশি :চট্টগ্রাম বিভাগের একমাত্র বিশেষায়িত কেন্দ্রীয় চর্ম ও সামাজিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে (আমেরিকান হাসপাতাল) প্রতি মাসেই দাদে আক্রান্ত হয়ে গড়ে এক হাজারের বেশি রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন। গত অক্টোবরে সর্বোচ্চ ১ হাজার ৩৭৪ রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন। এ ছাড়া সেপ্টেম্বরে ১ হাজার ৩৩২ জন, নভেম্বরে ১ হাজার ২৯৪ এবং ডিসেম্বরে চিকিৎসা নিয়েছেন ১ হাজার ১২৯ জন। গেল এক বছরে ১২ হাজারের বেশি রোগী দাদ রোগে আক্রান্ত হয়ে এই হাসপাতালে আসেন, যাঁদের এক-তৃতীয়াংশই নারী। প্রতিদিন বহির্বিভাগে চর্মরোগের চিকিৎসা নিতে আসা সাড়ে পাঁচ শতাধিক রোগীর মধ্যে এক থেকে দেড় শতাধিক রোগী ছিল দাদে আক্রান্ত।

সরকারিভাবে দেওয়া ওষুধেও মিলছে না সমাধান, হারাচ্ছে আস্থা :সরকারিভাবে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা দাদ রোগীদের দুই ধরনের ওষুধ দেওয়া হয়। এগুলো হলো ক্যাপসুল ফ্লুকোনোজল ও ক্রিম ওয়াইটফিল্ড ওয়েন্টমেন্ট। শুরুতে রোগীকে ১৫ দিনের জন্য দেওয়া হয় এসব ওষুধ। এতেও কাজ না হলে তা আবার এক মাস প্রয়োগ করে দেখা হয়। তবে কার্যকারিতা কমছে এসব ওষুধেরও। অনেক রোগীর ক্ষেত্রে এই ফর্মুলা প্রয়োগ করে আশাব্যঞ্জক সাড়া পাচ্ছেন না চিকিৎসকরা। এতে আস্থা হারাচ্ছে বিনামূল্যের এসব সরকারি ওষুধ।
বেশি ভুগছেন বাসাবাড়িতে কর্মরত নারীরা :চট্টগ্রাম রেলস্টেশন এলাকার রোজিনা ইসলাম প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সাত বাড়িতে কাজ করেন। পাঁচ বছর ধরে এই রোগে ভোগা রোজিনা বলেন, 'দাদের চুলকানিতে সীমাহীন কষ্টে আছি। এ পর্যন্ত বেশ কয়েকবার ডাক্তার দেখিয়ে অনেক রকম ওষুধ খেয়েছি; লাগিয়েছি মলমও। কিছুতেই কমছে না দাদ।' মোহাম্মদপুর বস্তির বাসিন্দা আকলিমা বলেন, 'নিজে আক্রান্ত হওয়ার পর মেয়েও এখন ভুগছে। কয়েক রকম ওষুধ খেয়েও দু'জনের কারও দাদ নিরাময় হচ্ছে না।' হাটহাজারীর বাসিন্দা লায়লুন নাহার বলেন, 'বাড়ির কাছাকাছি চিকিৎসা নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। অনেক কষ্ট করে ডাক্তার দেখাতে যেতে হয় শহরে। এভাবে কত দিন সম্ভব? দাদ আমার মতো অনেকের জন্য অভিশাপ।'

অনেকের গন্তব্য ফার্মেসি কিংবা পল্লিচিকিৎসকের কাছে :এখনও বেশিরভাগ মানুষ দাদ নিয়ে সচেতন না হওয়ায় চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার প্রয়োজন মনে করেন না। উল্টো স্থানীয় মুদির দোকান, ফার্মেসি থেকে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ইচ্ছামতো খেয়ে নেন ওষুধ। চর্মরোগ ঘিরে গড়ে উঠেছে বেশ কিছু হাতুরে চিকিৎসক, যাঁদের চিকিৎসা পেশায় নেই কোনো ডিগ্রি। অলিগলিতে সাইকেল, ভ্যান, রিকশায় ফেরি করে বিক্রি করা হচ্ছে নানা রকম মানহীন ও ভেজাল ওষুধ।

চর্মচিকিৎসকরা কী বলছেন :ওষুধ ও হরেক মলম ব্যবহার করেও দাদ থেকে রোগীদের মুক্তি দিতে পারছেন না চিকিৎসকরা। বিষয়টি স্বীকার করে চট্টগ্রামের চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ এবং কেন্দ্রীয় চর্ম ও সামাজিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ইনচার্জ ডা. সঞ্জয় প্রসাদ দাশ বলেন, 'আগে রোগীকে প্রথম পর্যায়ে ১৫-৩০ দিনের একটি চিকিৎসা পরিকল্পনা করা হতো, যেখানে ক্যাপসুলের পাশাপাশি দেওয়া হতো কয়েক রকম মলম। দ্বিতীয় ধাপে এটির সঙ্গে যুক্ত করা হতো একটি ২৫০ মিলিগ্রামের ট্যাবলেট, সঙ্গে চার-পাঁচ ধরনের মলম। শেষ ধাপে কয়েক প্রকার মলমের সঙ্গে দেওয়া হতো ক্যাপসুল ও ট্যাবলেট। তিন পর্যায়ে ধারাবাহিকভাবে ব্যবস্থাপত্র মানলে দাদ ভালো হয়ে যেত। তবে এখন আর এই প্রক্রিয়ায় আর দাদ ভালো হচ্ছে না।'

তিনি আরও বলেন, 'তিন ফর্মুলায় দাদ ভালো না হওয়ায় এখন ২০০ মিলিগ্রামের একটি নতুন ওষুধ প্রয়োগ করা হচ্ছে। এটি প্রথম দিনে সকাল ও রাতে দুটি করে, দ্বিতীয় দিনে সকাল ও রাতে একটি করে রোগীদের দেওয়া হচ্ছে। এতেও কাজ না হলে ১৫-৩০ দিনের জন্য ওষুধটি প্রতিদিন দুটি করে দিচ্ছেন চিকিৎসকরা। নতুন এই ফর্মুলায়ও বাগে আসছে না দাদ।'

আরেক চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. সুরজিত দত্ত বলেন, 'দাদ নির্মূলে ওষুধের কার্যকারিতা হারিয়ে যাওয়ার বিষয়টি দুশ্চিন্তার। দীর্ঘদিন ধরে অ্যান্টিফাঙ্গাল ওষুধ খেলে দাদ নির্মূলে ব্যবহূত ওষুধের কার্যকারিতা অনেক সময় কমে যায়।' সংশ্নিষ্টদের মতে, চট্টগ্রামে চর্মরোগী বাড়লেও বাড়ছে না চিকিৎসার সহজলভ্যতা। বেশি আক্রান্ত হচ্ছে গ্রামের মানুষ। এ জন্য শহরের চেয়ে গ্রামের দিকে নজর দিতে হবে বেশি।



বিষয় : চর্মরোগ দাদ

মন্তব্য করুন